এক দেশ, এক ভাষার পর ভারতীয় গণতন্ত্রের বহুদলীয় সংসদীয় কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন তুললেন ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সভাপতি ও দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। স্বাধীনতার ৭০ বছরে বহুদলীয় ব্যবস্থা দেশবাসীর লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, মানুষ আশাহত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
১৮ সেপ্টেম্ব, বুধবার দিল্লির অল ইন্ডিয়া ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা অনন্দবাজার এমন খবর প্রকাশ করেন।
এ সময় অমিত শাহ বলেন, ‘স্বাধীনতার ৭০ বছর পরে মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা আসলে ব্যর্থ কি না? ওই ব্যবস্থা কি দেশবাসীর লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছে?’ তার পরে নিজেই জবাব দিয়েছেন, ‘মানুষ আশাহত।’ আঞ্চলিক দলগুলো আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
মূলত দ্বিতীয় ইউপিএ আমলে নীতিপঙ্গুত্ব, দুর্নীতির অভিযোগ এনে অমিত ওই মন্তব্য করলেও বিরোধীদের অনেকের মত, এই বক্তব্যে যেমন বিজেপির ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ মনোভাব স্পষ্ট, তেমনই ভাষার পর বহুদলীয় ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে বেহাল অর্থনীতি থেকে নজর ঘোরানোর কৌশলও রয়েছে।
অনুষ্ঠানে মোদি সরকারের লক্ষ্য পুরণের কৌশল ব্যাখ্যা করে অমিত বলেন, ‘অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, দৃঢ় নেতৃত্ব, দক্ষ পরিকল্পনার সঙ্গে ১৩০ কোটি মানুষকে একাত্ম করলে তবেই প্রধানমন্ত্রীর নতুন ভারতের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব। নীতির ভিন্নতায় যে লক্ষ্যপূরণ অসম্ভব।’
অমিতের এমন মন্তব্যের দেশটির প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেস তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলে, ‘এমন ভাবনা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপরে সরাসরি আক্রমণ।’
কংগ্রেসের মুখপাত্র আনন্দ শর্মা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে বলেন, ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রকে গুরুত্বহীন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মন্তব্য ভয়াবহ এবং সেটা যে-ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে, গৃহীত হলে তা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে সরাসরি আঘাত করবে।’
সংবিধানের রূপকারদের বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভাবনাকে কটাক্ষ করে দেয়া অমিতের মন্তব্যকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘এমন মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। এনডিএ নিজেই তো একাধিক দলকে নিয়ে তৈরি এবং সেই সব দল বিভিন্ন রাজ্যে সরকারও গড়েছে।’
বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলের নেতাদের নাম করে আনন্দ বলেন, ‘নীতীশ কুমার, প্রকাশ সিংহ বাদল, উদ্ধব ঠাকরেরা নিশ্চয়ই শুনছেন। তারা উত্তর দিন।’
প্রশ্ন উঠেছে, অমিতের ধারাবাহিক মন্তব্য কি বৃহত্তর চিত্রনাট্যের অংশ? বিজেপি নেতৃত্ব প্রকাশ্যে নীরব থাকলেও ঘটনা হল, চলতি মাসের শুরুতে রাজস্থানের পুষ্করে বৈঠকে বসেছিলেন সঙ্ঘ ও বিজেপির শীর্ষ নেতারা। নীতিগত ভাবে সঙ্ঘ ‘এক দেশ, এক ভাষা, এক ঝান্ডা এবং এক হিন্দু রাষ্ট্র’ গড়ার পক্ষে।
তাদের দাবি, আঞ্চলিক দলগুলির কারণেই ‘বিভেদের রাজনীতি’ তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রে একটি মাত্র দল থাকলে বিভেদ দূর করা সম্ভব। রাজধানীতে জল্পনা, সঙ্ঘের সেই ইচ্ছাই কি ফুটে উঠল অমিত-মন্তব্যে?
আঞ্চলিক দলগুলি এমনিতেই অস্বস্তিতে। লালুপ্রসাদ জেলে। অখিলেশ-মায়াবতী নীরব। তদন্তের ফেরে চন্দ্রবাবু নায়ডু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। বিজেপির সঙ্গে বোঝাপড়ার রাস্তায় নবীন পট্টনায়ক। নীতীশ জোটে থেকেও অস্বস্তিতে। দক্ষিণে বিরোধী বলতে একমাত্র ডিএমকে। ফলে অমিতের মন্তব্যে আঞ্চলিক দলগুলিকে কার্যত শেষ করে দেয়ার ছক দেখছেন অনেকে।
সিপিএমের সীতারাম ইয়েচুরির এর প্রতিক্রিয়া বলেন, ‘আমাদের সাংবিধানিক আদর্শকে হত্যা করার চেষ্টা রুখবই।’
এমআইএম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসি বলেন, ‘১৯৩৩ সালের নভেম্বরে জার্মানিতে নির্বাচনে পোস্টার পড়েছিল, এক জনতা, এক ফুয়েরার, একটি হ্যাঁ। নির্বাচন অবাধ হয়নি এবং জনসংখ্যার ৯৩.৫ শতাংশ সরকারি নীতিতে হ্যাঁ বলেছিল।’
তবে অনেকের মতে, একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য করে আপাতত পরিস্থিতি বুঝে নিতে চাইছে বিজেপি। কারণ, তারা জানে, কাশ্মীরের মতো সব বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আইন করেই বাস্তবায়িত করা সম্ভব নয়।




