আরো কমবে রুপির দর, আমদানিতে সুবিধা হলেও রপ্তানিতে শঙ্কা

টাকার বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রা রুপির দর আরো কমতে পারে। এমন পূর্বাভাসেই জানালো বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে গবেষণা করা ওয়ালেট ইনভেস্টর। ২০২৪ সালের আগস্টে ভারতীয় রুপি আর বাংলাদেশি টাকার মান প্রায় সমান হবে। আগামী পাঁচ বছরের পূর্বাভাস তুলে ধরে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি এ তথ্য জানায়।
সেই সময় এক রুপির দাম নেমে আসবে ১ টাকা ৬ পয়সায়। আগের বছরের সেপ্টেম্বরেই রুপি ও টাকার দরের ব্যবধান ১০ পয়সার নিচে নেমে আসবে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দর বৃদ্ধি, রপ্তানির তুলনায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, ভারতের পুঁজিবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বহির্প্রবাহ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ভারত সরকার নিজেদের মুদ্রামান কমাচ্ছে বলে দেশটির বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে ভারতীয় মুদ্রার দর কমলে বাংলাদেশ লাভবান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা জানান, চীনের পর ভারত থেকেই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পরিমাণ আমদানি করে। টাকার বিপরীতে কিংবা ডলারের বিপরীতে রুপির দর কমলে আমদানি করা পণ্যে খরচ কমবে। যেমন ভারতে কোনো পণ্যের দর ১০০ রুপি হলে তা এখন আমদানি করতে বাংলাদেশিদের খরচ করতে হয় ১১৮ টাকা। রুপির দাম আরো কমলে ভারতে ওই পণ্যের ১০০ রুপি হলেও আমদানিকারকদের কম টাকা লাগবে। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে যারা ভারতে চিকিৎসা কিংবা ভ্রমণসহ নানা কাজে যান, তারাও আগের চেয়ে কম টাকা খরচে একই সেবা পাবেন।
তবে রপ্তানিকারকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কথা জানান দেশের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হা-মীম গ্রুপের কর্ণধার ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ।
এ কে আজাদ বলেন, ‘ডলার ও টাকার বিপরীতে ভারতের রুপির দর অনেক কমছে। পাকিস্তান ও চীনও তাদের মুদ্রার মান কমিয়েছে। এতে আমদানিতে সুবিধা হলেও বিশ্ববাজারে রপ্তানি প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে বাংলাদেশ।’ রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে রুপির মতো একই হারে টাকার মান কমানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘কাশ্মীর ইস্যুর পাশাপাশি ভারতের দুর্বল অর্থনীতির কারণে দেশটির মুদ্রা দুর্বল হয়ে পড়ছে। শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার হচ্ছে, রাজস্ব ও বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। তাতে ডলারের বিপরীতে তারা রুপির দর কমিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ডলারের বিপরীতে টাকা শক্তিশালী রাখায় টাকা রুপির বিপরীতে শক্তিশালী হচ্ছে। এতে ভারত থেকে আমদানি ব্যয় কমলেও রপ্তানি বাড়ানো কঠিন হবে। এছাড়া ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ তিনি টাকার মান বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছর ভারত থেকে বাংলাদেশিরা আমদানি করেছে ৮৬২ কোটি ডলারের পণ্য। বাংলাদেশ ভারত থেকে মূলত শিল্পের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল এবং খাদ্যপণ্য আমদানি করে। তাই ভারতীয় মুদ্রামান কমলে এসব খাতে বাংলাদেশিদের খরচ কমবে। আর গত অর্থবছর বাংলাদেশ ভারতে রপ্তানি করেছে ১২৫ কোটি ডলারের পণ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের গতকালের তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় রুপির দর ১ দশমিক ১৮ টাকা। অর্থাৎ, বাংলাদেশি ১ টাকা ১৮ পয়সার সমান ভারতের ১ রুপি।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতার দিনে ১ রুপির দর ছিল ১ ডলারের সমান। এ বছর ১৪ আগস্ট ১ ডলার কিনতে খরচ করতে হয়েছে ৭১ দশমিক ৬৩ রুপি। শুধু ভারত নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক দেশ চীন ও পাকিস্তানও তাদের নিজস্ব মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের ১ টাকা এখন পাকিস্তানের মুদ্রায় ১ রুপি ৮৬ পয়সার সমান।
নিজ দেশের রপ্তানিকারকরা যাতে আগের চেয়ে কম দরে রপ্তানি করেও লাভবান হতে পারেন, সেজন্যই দেশগুলো নিজেদের মুদ্রার মান কমাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চীন কয়েক দফায় তাদের মুদ্রামান কমিয়েছে। বর্তমানে চীনা ইউয়ানের দর কমে নেমেছে ১১ টাকা ৮০ পয়সায়। ডলারের বিপরীতে মুদ্রার মান কমলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ে ওই দেশের রপ্তানিকারকদের।
যখন ১ ডলারের দর ৭০ রুপি ছিল, তখন ভারতের একজন রপ্তানিকারক ১ ডলার মূল্যে কোনো পণ্য রপ্তানির পর ৭০ রুপি পেতেন। এখন রুপির দর কমে ৭১ রুপি হওয়ায় একই দরে কোনো পণ্য রপ্তানির পর তিনি ৭১ রুপি পাবেন। রপ্তানিকারক যেহেতু ১ রুপি বেশি পাবেন, তাই তিনি অন্য দেশের রপ্তানিকারকদের হটিয়ে ৯৯ সেন্টে রপ্তানি করেও লাভবান হতে পারবেন। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরাও টাকার মান কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে।
গত ১০ বছরে টাকার বিপরীতে রুপির দর পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে ১ রুপির দর ছিল ১ টাকা ৭২ পয়সা। তারপর থেকেই বছরজুড়ে কমতে থাকে রুপির দর। ওই বছরের নভেম্বরে ১ টাকা ৩৫ পয়সায় নামে। তারপর থেকে আবার বাড়তে থাকে রুপির দর। ২০০৯-এর অক্টোবরে ১ রুপির দর দেড় টাকায় পৌঁছে। ২০১১ সালের ২২ জুন রুপির দর পৌঁছে ১ টাকা ৬০ পয়সায়। ওই বছরের ডিসেম্বরে আবার নামে দেড় টাকায়। ২০১২ সালের মার্চে দর বেড়ে আবারও ১ টাকা ৬০ পয়সায় ওঠার পর থেকেই কমতে শুরু করে দেশটির মুদ্রার মান। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমছে রুপির দর। ২০১৬ সালের মার্চে প্রথমবারের মতো ১ টাকা ২০ পয়সার নিচে নেমে আসে। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে আবার কিছুটা শক্তিশালী হতে থাকে। ২০১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি তা সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩০ পয়সা অতিক্রম করে। এরপর থেকে আবারও পতনের মুখে রুপি।
ওয়ালেট ইনভেস্টরের পূর্বাভাস অনুসারে, টাকার বিপরীতে ভারতীয় রুপির মান আরো কমবে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রতি রুপির দর ১ টাকা ১৮ পয়সা থেকে শুরু হয়ে আগস্টে নামবে ১ টাকা ১৫ পয়সায়, যা সামান্য ওঠানামা সত্ত্বেও ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে রুপির দর হবে ১ টাকা ১৬ পয়সা। ওই বছরের আগস্টে দর নামবে ১ টাকা ১২ পয়সায়। ডিসেম্বরে রুপির দর হতে পারে ১ টাকা ১২ পয়সা থেকে ১ টাকা ১৩ পয়সা।
২০২২ সালের জানুয়ারিতে রুপির দর ১ টাকা ১৪ পয়সায় থাকতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এপ্রিলে দর সামান্য বাড়ায় আগস্টে নামতে পারে ১ টাকা ১০ পয়সায়। ডিসেম্বর পর্যন্ত মোটামুটি ১ টাকা ১০ পয়সার কাছাকাছিই থাকবে ভারতীয় মুদ্রার দর। ২০২৩ সালের আগস্টে রুপির সঙ্গে টাকার দরের পার্থক্য প্রথমবারের মতো ১০ পয়সার নিচে নামবে। ওই বছরের আগস্টে রুপির দর হতে পারে ১ টাকা ৮ পয়সা। পরের মাসে আরো ১ পয়সা দর হারাবে। ২০২৪ সালের শুরুতে ১ টাকা ১০ পয়সা ওঠার পর ওই বছরের আগস্টে ১ টাকা ৬ পয়সায় নামবে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির মুদ্রামান।



