শিরোনামশীর্ষ সংবাদ

প্রতি মিনিটে ১ জন ডেঙ্গু রোগি হাসপাতালে ভর্তি

ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ৬৪ টি জেলায়। আর একই মৃত্যু তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম। এটাই আজকের বাংলাদেশের চিত্র। প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগির সংখ্যা বাড়েই চলছে। বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুতে আক্রন্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে, সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত মহামারী ঘোষণা করা হয়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শঙ্কা বিদ্যমান পরিস্থিতি এভাবে আর কয়েকদিন অব্যাহত থাকলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। যুগান্তর’র এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো এক হাজার ৭১২ জন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি মিনিটে ১ জনের বেশি ভর্তি হয়েছেন। একই দিন নতুন করে আরো পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, জ্বরে আক্রান্ত যে কোনো রোগীর ক্ষেত্রেই ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা না করে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসক বা নিকটস্থ হাসপাতালের শরণাপন্ন হওয়ার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুতর পরিস্থিতিতে শুধু সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) পরীক্ষা করে, কী ধরনের চিকিৎসা দিতে হবে সেটি নির্ধারণ করা সম্ভব। এমনটি করা হলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর জন্য রোগীকে ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। বিলম্ব হবে না চিকিৎসা শুরু করতে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক আয়েশা আক্তার জানান, নতুন করে আক্রান্তদের মধ্যে শুধুমাত্র রাজধানীতেই এক হাজার ১৫০ জন।
তাহলে সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৫১৩ জন। বুধবার এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ১৮৩ জন। সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হলেও বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে। শুধুমাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই এ রোগে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আইইডিসিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এ পর্যন্ত সেখানে ২০ জন মৃত ব্যক্তির নমুনা এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, রাজধানীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাইরেও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে।
দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে ৩ হাজার ৪৬৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২২২ জন রয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। নতুন-পুরনো মিলিয়ে বর্তমানে এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ৭০৬ জন।
এরপর মিটফোর্ড হাসপাতালে ৩৩৭ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ১৩২, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৩২২, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ১৯৭, বারডেম হাসপাতালে ৫৭, বিএসএমএমইউতে ১২৭, পুলিশ হাসপাতালে ১৬৫, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৮৭, বিজিবি হাসপাতালে ৩০, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৩০৫ এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৪৩ জন ডেঙ্গু রোগি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে সর্বমোট চার হাজার ৩৩২ জন ভর্তি রয়েছেন।
এছাড়াও রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগি চিকিৎসাধীন রয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩৯ জন, স্কয়ার হাসপাতালে ১২৫, ধানমিণ্ড সেন্ট্রাল হাসপাতালে ১০৬, ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতলে ১১১, সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজে ১০৭ এবং আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০৪ জন।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ১৪৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৪ জন, খুলনা বিভাগে নতুন ৭৬ জন, বরিশাল বিভাগে নতুন ৬৩, ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন ৬২, রাজশাহী বিভাগে নতুন রোগী ৫৮, রংপুর বিভাগে নতুন রোগি ৩৩ এবং সিলেট বিভাগে নতুন শনাক্ত ৩১ জন।
রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় দেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ডেঙ্গু পরীক্ষার (এনএস১) কিট, (আইজিজি ও আইজিএম) কিট এবং সিবিসির রি-এজেন্টের স্বল্পতা দেখা দিয়েছে।
রোগির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিকগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে রোগ নির্ণয়ে দেরি হচ্ছে এবং রোগির চিকিৎসা প্রক্রিয়া শুরু করতেও বিলম্ব হচ্ছে। অথচ এসব ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে, রোগির প্রাথমিক লক্ষণ দেখেই চিকিৎসা শুরু করা উচিত। যাতে দ্রুত রোগির সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
রোগতত্ত্ব রোগনিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) একটি সূত্র মতে, ২০০৯-১১ পর্যন্ত দেশে সোয়াইন ফ্লু’র প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। এ রোগের পরীক্ষা তখন আইইডিসিআর’এ করা হতো। জ্বরে আক্রান্ত এত বেশি মানুষ তখন পরীক্ষা করতে আসত যে লাইন আধা কিলোমিটারের বেশি লম্বা হয়ে যেত। পরিস্থিতির বিবেচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরামর্শে তখন রোগের লক্ষণ দেখেই চিকিৎসা দেয়ার নির্দেশনা প্রদান করা হয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. শফি উল্লাহ মুনসি বলেন, ‘যখন কোনো দেশে ডেঙ্গুর মতো ভাইরাস সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তখন সেটি সব রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এসব ক্ষেত্রে সিবিসি পরীক্ষা করিয়ে রক্তে প্লাটিলেটের অবস্থা দেখেই চিকিৎসা শুরু করা উচিত।’
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীসহ সারা দেশে আরো পাঁচজনের মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। নওগাঁর আত্রাইয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আবদুল ওয়াহেদ (৭৫) নামে সাবেক এক প্রধান শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। ভৈরবে হামজা (১২) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। টেকনাফে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে আবদুল মালেক (৩৩) নামে এক কাপড় ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া মাদারীপুরের শিবচরের ফারুক খান (২২) এবং ফরিদপুরের শারমিন আক্তার (২৫) নামের এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button