শিরোনাম

মানিকগঞ্জে ১০০ টাকায় ওদের স্বপ্নপূরণ

নিজস্ব প্রতিনিধি : মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার উথলী গ্রামের ট্রাক ড্রাইভারের মেয়ে তানিয়া আক্তার এবার মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশে কনস্টেবল পদে ১০০ টাকা ট্রেজারির চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে আবেদন করেছিলেন।
বৃহস্পতিবার পুলিশের চূড়ান্ত ফলাফলে তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন। তানিয়ার মতো আরও অনেক নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া দিনমজুরের সন্তানেরা মানিকগঞ্জে ১০০ টাকায় কনস্টেবল পদে চাকরি পেয়েছেন।
চাকরি পাওয়া শিবালয় উপজেলা আরিচার পপি আক্তার জানান, তার বাবা আশেক আলী একজন ভ্যান চালক। দুই বোন ১ ভাই রয়েছে। ভ্যান চালিয়ে তার বাবা অনেক কষ্টে সংসার চালান। মাত্র ১০৩ টাকা খরচ করে তার পুলিশের চাকরি হয়েছে।
স্বপন রায় নরসুন্দরের কাজ করে। গ্রামের ছোট্ট একটি বাজারে ভাড়া দোকানে রয়েছে সেলুন। সেই সেলুনের আয় দিয়েই কোনো রকমে তাদের সংসার চলে। কোনোদিন ভাবেননি তার ছেলে সুব্রত রায় পুলিশের চাকরি পাবেন ঘুষ ছাড়াই।
বৃহস্পতিবার বিকালে মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশের ১৩১ জন কনষ্টেবল পদে চাকরি হয়। এদের মধ্যে নরসুন্দরের ছেলে সুব্রত কুমার রায় একজন। পুলিশের চাকরি পেয়ে এভাবেই তার মনোভাব প্রকাশ করে।
সুব্রত রায়ের মতো কামার, জেলে, কৃষক, দিনমুজুর, ট্রাকচালক, ভ্যানচালক, দর্জি, পিতৃহীন সন্তানদের এবার মানিকগঞ্জে পুলিশে চাকরি হয়েছে।
চাকরি পাওয়া ঘিওর উপজেলার পেচারকান্দা গ্রামের সুমি আক্তার জানান, তার বাবা কৃষি কাজ করতো। এখন পক্ষাঘাত হয়ে ঘরে পড়ে আছে। বাবার স্বপ্ন ছিল পুলিশের চাকরির। বিনে পয়সায় কোনো তদ্বির ছাড়াই আজ সেই স্বপ্নপূরণ হয়েছে।
পুলিশ লাইনে কথা হয় কনস্টেবল পদে চাকরি পাওয়া বকুল আক্তারের সঙ্গে। বকুল জানায়, যে যখন ছোট তখন তার বাবা তাদের ছেড়ে নিরুদ্দেশ। বড় বোনের সংসারের থেকে এখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে। পুলিশ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন করেন।
যে সব প্রার্থী চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছে তাদের মধ্যে বকুল আক্তার প্রথম হয়েছে। তার ধারণা ছিল মেধায় চাকরি হয় না। কিন্তু মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপার রিফাত রহমান শামীম তার ধারণাকে পাল্টে দিয়েছেন।
পিতৃহীন রুনা আক্তার। তার বাবা কৃষিকাজ করতেন। গতবছর তারা বাবা মারা গেলে সংসারে নেমে আসে ঘন অমানিষা। পুলিশে চাকরির বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর মানিকগঞ্জ পুলিশ লাইনে মাকে জড়িয়ে কান্না করছিল রুনা আক্তার।
মা রৌশনারা বিলাপ করে বলছিলেন, তোমার মেয়ের পুলিশে চাকরি হয়েছে তুমি দেখে গেলে না। বাবার স্বপ্ন ছিল আমি পুলিশের চাকরি করবো। বাবার সেই স্বপ্ন সত্য হয়েছে। কিন্তু বাবা আজ বেঁচে নেই।
মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপার রিফাত রহমান শামীম জানান, পুলিশের কনস্টেবল পদে নিয়োগের জন্য ২ হাজার ৯০৯ জন আবেদন করেছিল। এদের মধ্যে বাছাইতে লিখিত পরীক্ষায় মনোনিত হয় ৯৫৯ জন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় ২২৩ জন। চুড়ান্তভাবে নিয়োগ পান ১৩১ জন। এদের মধ্যে ৮৯ জন পুরুষ ও ৪২ জন নারী। যারা নিয়োগ পেয়েছে তাদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সদস্য।
পুলিশের ডিএসবি শাখার পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা গেছে, এবার পুলিশের কনস্টেবল পদে যে ১৩১ জন চাকরি পেয়েছে তাদের মধ্যে নারী ৪২ জন। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার কোটার একজন রয়েছে। এছাড়া পুরুষ ৮৯ জন কনস্টেবল নিয়োগ পেয়েছেন। ৮ জন মুক্তিযোদ্ধার কোটায়, একজন পোষ্য কোটায় রয়েছে।
এদিকে অন্যের জমিতে দিনমজুরের (কৃষিকাজ) করেন এমন পরিবারের ৪১ জন সন্তানের চাকরি হয়েছে। এছাড়া চা বিক্রেতার ছেলে একজন, ভ্যান ও রিকশা চালকের ২ জন, দর্জির ছেলে একজন, ট্রাক ড্রাইভারে একজন মেয়েসহ চারজন, কাঠ মিস্ত্রির ছেলে একজন, নরসুন্দরের একজন ছেলে, রাজমিস্ত্রিরর ছেলেও রয়েছে একজন। এছাড়া শিক্ষকের সন্তান রয়েছে ২ জন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button