জাপানীরা কেমন : পর্ব–৩৪
পৃথিবীর কিছু দেশে যুগে যুগে প্রথিতযশা বৈজ্ঞানিক, আবিষ্কারক, কবি, সাহিত্যিক, জ্যোতির্বিদ, মানব দরদী সমাজ সেবক ও সাদা মনের অনেক রাজনীতিবিদ জন্ম গ্রহণ করেছেন। তাঁদের নাম পাথরে খুদিত হয়েছে। পৃথিবীর মানুষ তাঁদের নাম চীরদিন স্মরণ করবে এবং তাদের আদর্শ থেকে শিক্ষা লাভ করে সমৃদ্ধ হবে। তাঁদের অবদানে আজকের পৃথিবীর প্রগতি হয়েছে। তাই আজকের পৃথিবী আলোকিত হয়ে উজ্জ্বল রূপ ধারণ করেছে।
পৃথিবীতে এমন কিছু ক্ষণজন্মা লোক আছেন, মানব কল্যাণে তাঁদের অবদানের কথা অনেকে জানেন না। তাঁরা হলেন এমন কিছু ব্যক্তিত্ববান মানুষ – তাঁরা সমাজে যে ভাবে নিঃসার্থ ভাবে কাজ করেছেন, কখনো তারা কিছু পাওয়া বা নামের জন্য তাদের সে অবদান রাখেন নি। তাঁরা প্রথমে নিজেদের দুঃখ-কষ্টকে অনুধাবন করেছেন, জন্মের পর দারীদ্রতার সাথে লড়াই করে কঠিন বাস্তবকে জানতে পেরেছেন। তারপর অন্যের দুঃখ-কষ্টে সাহায্যের হাত নিয়ে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের নাম অনেকে জানতে পারেন না। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম চীরকাল থেকে যায়।
আজ আমার এই লেখাতে জাপানের দুজন ব্যক্তির কথা সংক্ষেপে আলোচনা করব। তাদের এক জনের নাম মিঃ ইয়োশিজি হায়াশিদা এবং অন্যজনের নাম ড. হিদেকি ইয়ুকাওয়া।
প্রথমে ইয়োশিজি হায়াশিদার উপর আলোচনা করব।
একটি শব্দের অর্থ সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তিত হয়। পরে তা আধুনিক ‘অভিধানে’ স্থান পায়। ক্রমানুসারে শব্দটি পূর্বের অভিধান গুলির তুলনামূলক সমার্থক অর্থের পাশাপাশি কিঞ্চিত পরিবর্তিত হয়ে বর্তমান জমানার অবিধানে পূর্ণাঙ্গ রূপে সঙ্গায়িত হয়েছে।
এই ক্ষেত্রে, ‘সদয়’ শব্দের অর্থ হতে পারে এমন একটি অনুভূতি – যেন কেউ লজ্জা পেয়ে সঙ্কুচিত হয়ে কিছুটা বদলে গিয়ে অন্য রূপ ধারণ করেছেন। তারপর, সে শব্দটির অর্থ হতে পারে ‘বিনয়ী’ অথবা ‘শান্ত,”শেষ পর্যায়ে গিয়ে বর্তমানের অভিধানের সঙ্গাতে কথাটির অর্থ হয়েছে ‘দরদী।’
এই ভাবেই একজন লোকের গুণমান পরিবর্তিত হয়। সত্যকারের একজন বিনয়ী সাদা মনের ভদ্রলোক তার জীবনের প্রথমাংশে অতীতের পীড়নের অভিজ্ঞতা থেকে পরিবর্তিত হয়েছেন। তা হল সঙ্কুচিত অনুভূতি। সে অনুভূতি যাদের মাঝে আছে, তাঁরাই মহৎ ব্যক্তি হয়েছেন। তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হল বাঙালি কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনিও তাঁর জীবনে বেনিয়াদের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়েছিলেন, তারপর মহান একজন কবি হয়েছেন।
একই রূপে মিঃ ইয়োশিজি হায়াশিদা তাঁর যৌবন কাল দারিদ্রতার মাঝে থেকে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তিনি কোবে নগরীর ‘আশিনাগা’ এন জি ও টির প্রাক্তন পরিচালক ছিলেন। ১৯৯৫ সালের জানুয়ারীর ১৭ তারিখে জাপানের হিয়োগো বিভাগের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত কোবেতে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। জাপানে তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘হানশিন’। ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.৯; মৃত্যুর সংখ্যা ৬,৪৩৪ জন। এই ভূমিকম্পে নগরীর প্রায় সবগুলি দালান বাড়ি, রেল লাইন, হাইওয়ে ধ্বংশ হয়ে গিয়েছিল। প্রচন্ড শীতের মধ্যে আহত ও নিহতদের অবস্থা ছিল বড় শোচনীয়। আগুনে পুড়ে মরেছে অনেক লোক।

হায়াশিদা তখন বিলম্ব না করে সেখানে গিয়ে এতীম শিশুদের অন্তর ঢেলে আবেগ প্রবণ সেবা দিয়েছেন। তিনি চলতি শতাব্দীর প্রারম্ভে জাপানের নির্মম ধ্বংসাত্মক দুটি ভূমিকম্পের সময়ে দুর্গতদের জন্য উদার ভাবে কাজ করেছেন। এই মহৎ ব্যক্তিটি অসুস্থ হয়ে মাত্র ৬৫ বৎসর বয়সে জানুয়ারি’২০১৮ মৃত্যু বরণ করেছেন।
হায়াশিদা কোবের ‘সেবা প্রতিষ্ঠানটি’র প্রথম পরিচালক ছিলেন। যে সকল শিশুর পিতামাতা ভূমিকম্পে নিহত হয়েছেন, সেসব এতীম শিশুদেরকে তিনি তাঁর মাথায় একটি তোয়ালে বেঁধে শিশুগুলির কান্নাকাটি ও চিৎকারের মাঝে নিজের চোখের জল আড়ালে মুছে-অবিরাম তাদের সেবা করেছেন।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ শুক্রবার জাপানের উত্তরে তহোকু এলাকাতে অবস্থিত ফুকুশিমা, মিয়াগি এবং ইওয়াতে বিভাগে শতাব্দীর যে নারকীয় ভূমিকম্প ও সুনামি হয়েছে, তখন লাখো মানুষের সেবা করতে যে তরুণ-তরুণীরা অবিলম্বে কোবে থেকে দ্রুত দুঃস্থদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরা তাদের সেবক গুরু মিঃ হায়াশিদার দীক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। “পৃথিবীতে যাঁরা দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে কঠোর বাস্তব দেখেছেন, তাঁরাই পৃথিবীতে প্রকৃত দরদী হয়েছেন।”
হায়াশিদা ২০১১ সালের ভূমিকম্পের পর দ্রুত তাঁর লোকজন নিয়ে তহোকু এলাকাতে গিয়ে ক্যাম্প করেন। মার্চ মাসে প্রচন্ড শীতের মাঝে তিনি দুর্বাস্তুদের সেবায় লেগে যান। তিনি ১,৭০০ জন এতীমের লালন পালনের দায়ীত্ব নেন। এদিকে ফুকুশিমার তিনটি আণবিক রিয়েক্টরে সুনামির পানি প্রবেশ করাতে বিস্ফুরিত হয়ে চতুর্দিকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। মারাত্মক রেডিয়েশনকে তুচ্ছ করে তিনি এতীমদের রক্ষা করেন। ২০১১ সালের তহোকু ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৯ এবং তাতে নিহত হয়েছেন ১৫,৮৯৪ জন।
হায়াশিদার জন্ম ১৯৫২ সালে। টোকিওর রিক্কিও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি খৃষ্টান ধর্মের উপর পড়াশুনা করেন। আশিনাগা এন জি ও তে তিনি ২০১৫ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। জাপানেএকজন জাপানীর ৬৫ বৎসরে মৃত্যুকে অকাল মৃত্যু বলা যেতে পারে। পত্রিকায় বিষদ ভাবে কিছু না লিখলেও আমার ধারণা যে তেজস্ক্রিয় পদার্থের রেডিয়েশনের কারণে তিনি অসুস্থ হয়েছিলেন।
এখন হিদেকি ইয়ুকাওয়ার কথা বলব। ড. হিদেকি ইয়ুকাওয়া ছিলেন জাপানের একজন পদার্থ বিজ্ঞানী। তাঁর জন্ম ২৩ জানুয়ারী, ১৯০৭ সালে এবং মৃত্যু ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৮ তারিখ।

বিংশ শতাব্দীতে পদার্থ বিদ্যার বদৌলতে বিশ্বের দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। পদার্থবিদ ইয়ুকাওয়া সম্পর্কে জাপানীরাও প্রথমদিকে কিছু জানতো না। সম্প্রতি তাঁর একটি পুরানো ডায়েরী গত মাসে পাওয়া গিয়েছে। তাতে তিনি লিখেছেন যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ‘জাপান ইম্পেরিয়াল সেনাবাহিনীর জন্য “এটম বোমা” তৈরী করতে তাঁকে অনুরোধ করা হয় এবং সে কাজে তিনি মনোনিবেশ করেছিলেন। কিন্তু যে সময়ে তাঁকে অনুরোধ করা হয় তখন মহাযুদ্ধ প্রায় শেষ পর্যায়ের দিকে ছিল। এটম বোমা তৈরীর কাজে তিনি তৎকালীন Kyoto Imperial University তে গবেষণারত ছিলেন। সে কাজের অনেক অগ্রগতিও হয়েছিল। কিন্তু জাপান আত্মসমর্পণ করাতে তার প্রজেক্ট বন্ধ হয়ে যায়।
তারপর অ্যামেরিকার প্রিন্সটনে অবস্থিত Institute for Advance Studies এ তাঁকে যোগদানের জন্য ডাকা হয়। তখন ১৯৪৮ সাল। যুদ্ধ বিধ্বস্ত জাপান থেকে তিনি যখন উল্লিখিত গবেষণা ইন্সটিটিউটে ভিজিটিং প্রফেসর হিসাবে যোগদান করতে যান – তখন সারা মাথায় সাদা ঝাঁকড়াচুল ওয়ালা একজন লোক এসে ইউকাওয়াকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। সে ব্যক্তিটি হলেন বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ড. আলবার্ট আইনস্টাইন।আইনস্টাইন তৎকালীন অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট মিঃ ফ্রাঙ্কলিন ডি রোজভেল্টকে জার্মানীর হিটলার এটম বোমা তৈরী করার পূর্বেই যেন এটম বোমা তৈরী করেন – সে অনুরোধ জোরালো ভাবে করেছিলেন।আমেরিকা সর্বাগ্রে এটম বোমা তৈরী করার পর হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে লক্ষ মানুষের মাথার উপর বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। সে কলঙ্কিত ইতিহাস বিশ্ববাসী জানে।
যে বৎসরে ইয়ুকাওয়া অ্যামেরিকার প্রিন্সটনের Institute for Advance Studies এ প্রফেসর হিসাবে যোগদান করেছিলেন, তার মাত্র এক বৎসর পর তিনি পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেন। এই সন্মানজনকপুরষ্কারটি জাপানীদের মধ্যে সর্বপ্রথম তিনি পেয়েছেন। একথা শুনে যুদ্ধে পরাজীত জাপানী নাগরীকেদের মন থেকে পরাজয়ের গ্লানি অনেকটা সরে যায়। তারা নতুন আশার আলো দেখতে পায়। বড় বিস্ময়ের ব্যাপার যে ড. হিদেকি ইয়ুকাওয়া তাঁর দায়িত্বে এটম বোমা তৈরীর সে কাজের কথাটি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কাউকে বলেন নি। তাঁর পুরানো ডায়েরী থেকে একথা স্পষ্ট করে জাপানী জনগণ সর্বপ্রথম জানতে পেরেছেন।ডায়েরীটিতে স্বহস্তে তিনি যদি না লিখতেন, কেউ এব্যাপারে জানতো না।
যুগে যুগে দেবতাতূল্য মহৎ পুরুষ ও দেবীতূল্য নারীর আবর্তন হয়েছে। কারো নাম পাথরে খুদাই করা আছে, কারো নেই। কিন্তু মহৎ পুরুষ এবং মহীয়সী নারীর আবর্তনের কথা স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসে লেখা থাকে।

ইয়ুকাওয়া তাঁর ডায়েরীতে একটি ‘তান্কা’ কবিতা লিখেছেন। তার অনুবাদ নিম্নরূপঃ
“পৃথিবী যদি
মনুষ্যহীন হতো
বিশুদ্ধ বায়ু
শরত রজনীতে
অর্থহীন কল্পনা”
(চলবে)




