শিরোনামসাময়িকি

মুক্তিযুদ্ধ ও আশ্রয়……..

ক্যালিম্পং থেকে শিলা চৌধুরী
আমার তখন জন্ম হয়নি । উনিশ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ও বেশ ক বছর পর আমার জন্ম । নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান ভাবি বেশ কয়েকটা কারণে । তারমধ্যে আমার খুব প্রানবন্ত একটা শৈশব।রাতে ঘুম পাড়ানি গল্পে রোজ থাকতো সাত রাজার গল্প নয়তো চিলনি মায়ের কুড়িয়ে পাওয়া রাজকন্যের গল্পের সাথে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কিভাবে আমাদের পরিবার দীর্ঘ ন মাস একের পর এক আশ্রয় বদল করে নিরাপদে ঘরে ফিরেছিল সেই কাহিনী । যুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে আমাদের কাছে সেই সব কাহিনীই ছিল । যুদ্ধ দেখিনি কিন্তু প্রতি রাতে ধানের ক্ষেতের আল বেয়ে কখনো বা গলা জলে মাইলের পর মাইল শুধু মাথা বাঁচিয়ে এক গ্লাম থেকে আরেক গ্রামে, কিংবা বেতের তীক্ষ্ণ কাঁটা গায়ে বিঁধে রক্তাক্ত হয়ে ও টুঁ শব্দটি না করে সাপ বিছার ভয় উপেক্ষা করে রাতের পর রাত মনে মনে কত্তো ছুটেছি ।কখনও বা রাইফেল হাতে সরাসরি পাকবাহিনী দের খতম করেছি তা বলার বাইরে ।
আমাদের গ্রাম একেবারে ঘন জঙ্গল পেরিয়ে তার উপর রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস থেকে মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে । বাড়ির খুব কাছেই ফাউগান বাজার ।
সবই দাদু, ঠাম্মী, বাবা, কাকুদের থেকে শোনা ।গাজীপুরে সবার আগে গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয় আর তা মার্চ মাসের শুরুর দিকে । তাই সেনানিবাস থেকে প্রতি দিন আর রাতে পাকিস্তানি হানাদাররা টহলদারি করে বেড়াতো। আমাদের বড় বাড়িতে অনেক গুলো পরিবারের বাস। সবাই কোথায় যাবে, কিভাবে পৌঁছাবে সে আশ্রয়ে সেই দুশ্চিন্তায় অস্থির ।

যে ঘরে অস্ত্র মজুত করে রাখা হয়েছিলো

রাতের অন্ধকারে বিল ,পারুলি গাঙ্গ পেরিয়ে নলগাঁও হরেন্দ্র জেঠুর বাড়ি, সেখান থেকে নুরুল ইসলাম কাকুদের বাড়িতে জোটে নতুন আশ্রয় । সেখানেও নিরাপদ ছিল না আশ্রয় বেশিদিন । পাকবাহিনীর কাছে খবর পৌঁছে যায় যে নলগাঁও -এ বেশ কটা পরিবার আশ্রিত আছে। মাইকিং করে ঘোষণা করা হয় চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে হিন্দুদের চলে যেতে হবে এলাকা ছেড়ে যারা আশ্রয় দিয়েছেন আর যারা আশ্রিত সবাইকে । কি করবে কোথায় যাবে ?বেলাই বিলের ভরা বর্ষার ঢেউ ভেঙে পারুলি গাঙ্গ পেরিয়ে অবশেষে সব পরিবার পৌঁছায় গাজীপুরের নাগরীর খৃষ্টান মিশনে । মিশনে তো আর এতোগুলো মানুষকে আশ্রয় দেয়া সম্ভব ছিল না । শুধু যে আমাদের এলাকার মানুষ আশ্রয় প্রার্থী ছিল তা নয়। আরো অনেক জায়গা থেকে ও এসেছিলেন আশ্রয়ের খোঁজে । অবশেষে মিশনারীজ গন নাগরীর যতো খৃষ্টান পরিবার ছিলেন প্রত্যেক পরিবার সদস্যদের কে ডেকে একেক পরিবারে এক পরিবার বা কারো বাড়িতে তার ও অধিক পরিবারের আশ্রয়ের বন্দোবস্ত করে দেন। আমাদের পরিবার আশ্রয় পেয়েছিল বার্থল গোমেজ-এর পরিবারে। একদিন নয় দুদিন নয় দীর্ঘ সাত মাস নিরাপদে ছিল ওইসব আশ্রয়দাতা পরিবারে একেবারে নিজের বাড়ির মতো করে । বার্থল গোমেজ-এর পত্নী রেনু ডি কস্তা নিজের সন্তানের মতো যত্নে রেখেছিলেন আমাদের পরিবারকে। কৃতজ্ঞতায় ওনাদের সেই অমূল্য আশ্রয়ের ঋন শোধরানোর নয়।সারা জীবনের মতো ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে নিয়েছেন বার্থল গোমেজ-এর পরিবার আমাদের পরিবারকে । প্রতি বছর বড়দিনে আজো আমাদের বাড়িতে আসে নিমন্ত্রণ । রেনু ডি-কস্তা আমার দাদু ঠাম্মীর মেয়ে হয়ে গেছেন সেই কবে আর তা রক্ত বন্ধনের উর্ধ্বের বাঁধনে।
আমার বাবা জ্যোতিষ কুমার দেবনাথ বাড়ি আঁকড়ে পড়ে সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র,, খাবার ,ও তথ্য আদান প্রদানে ব্যাস্ত ।শুরুর দিকেই বাবা,করিম তালই ( বাবার আজন্ম বন্ধু ) সহ আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধাগন পরিকল্পনা করেন রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস থেকে অস্ত্র লুট করার । শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা মোতাবেক গাজীপুর যাবার রেলপথের মাঝে বনখড়িয়া রেল সেতু গ্রেনেড হামলায় উড়িয়ে দিয়ে রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস থেকে অস্ত্র বোঝাই মালগাড়ি উল্টে দেয়। আর সেই মালগাড়ি থেকে প্রচুর অস্ত্র, রাইফেল, গ্রেনেড, হাতবোমা সংগ্রহ করে আমাদের বাড়িতে বেশ কিছু, তারপর আতলড়া গ্রামে কিছু মজুত করে খুব সফলভাবে । সেখান থেকে গাজীপুর সহ টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহের মুক্তি যোদ্ধাদের কাছে সরবরাহ করেন।
আমার মা আর আশ্রয় দাতা রেনু ডি কস্তা

এর মধ্যেই আমার মেজকাকু সোমেশ কুমার দেবনাথ আর আমার বরেন্দ্র জেঠু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে নাগরী থেকে এক নৌকায় করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। আর সে পথে পাকবাহিনীর সাথে রাজাকার আলবদর বাহিনীর কড়া পাহারা । তখন মেজোকাকু সবে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র । কিছুদূর যেতেই বান্দাখোলার পরে হাড়িনাল সেতুর কাছে পাহারারত পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যায় কাকু ওরা । কাকুর হাফ প্যান্টের রাবার আটকানোর জায়গায় গোপন নথি যুদ্ধ পরিকল্পনার । ঠাম্মী নিজ হাতে সেখানে নথি প্লাস্টিকের কগজে মুড়ে হাফ প্যান্টের রাবারের সাথে কিছু টাকা সাথে দিয়ে সেলাই করে দেয় । সেটা পৌঁছে দেবার দায়িত্ব ছিল কাকুদের উপর । ধরা পড়ে যাবার সাথে সাথেই পিঠমোড়া করে পেছনে হাত বেঁধে পা রশি দিয়ে উল্টো করে মোটরচালিত নৌকা ছইয়ের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখে ।বেশ কিছু সময় নির্যাতনের পর ও কোন তথ্য বের করতে না পেরে মেজোকাকুকে জিম্মি হিসেবে রেখে বেশ কিছু দূর থেকে জেঠু আর নৌকোর মাঝিকে পাঠায় বাঁশ সংগ্রহ করে আনতে । পাকবাহিনীর ওরা ছিল বেলুচ রেজিমেন্টের। খুব বৃষ্টি ছিল নাকি সেদিন । ওই এলাকার বেশির ভাগ বাড়ি মাটির দেয়ালের । বৃষ্টি থেকে বাঁচতে কাকুদের নিয়ে পাকবাহিনী আর সাথে দুই রাইফেল হাতে রাজাকার সহ সবাই সেই মাটির ঘরে আশ্রয় নেয় । যুদ্ধের জন্যে সেখানকার সব পরিবার অনেক দিন ঘর ছাড়া । ছনের চালা তাই অযত্নে পঁচে গিয়েছিল ।আর সেটাই ছিল আর্শিবাদ কাকুদের জন্যে ।লাগাতার ভারী বর্ষনে মাটির দেয়াল ভিজে নরম হয়ে গিয়েছিল ।সেই দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিল এক রাজাকার ।দেয়াল ভেঙ্গে চাঁপা পরে সেই রাজাকারের হাত পা ভেঙে যায় । পাকবাহিনীর সবাই সেই রাজাকার কে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে । বেলুচ রেজিমেন্টের জুনিয়র এক পাক সৈনিক কাকুদের হাত পায়ের বাধঁন খুলে দিয়ে সবার অগোচরে সেখান থেকে পালাতে সাহায্য করে । সেখান থেকে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে বাড়ি পৌঁছায় কাকু ওরা । তারপর শুরু করে রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস থেকে কাপাসিয়া যাবার পথের রাজবাড়ির পারুলি গাঙ্গের উপর সেতু গুড়িয়ে ভেঙে দিয়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করা আর তা বাস্তবায়ন করে সফল ও হন। আর সেটা সেপ্টেম্বর মাসে । তারপর শুরু হয় রাজাকারদের ধরা। যাতে পাকবাহিনী আশেপাশের গ্রামে ঢুকতে না পারে রাজাকারদের সাহায্যে ।
তার মাঝেই আমাদের বাড়ির খোঁজ দিতে আতলড়া গ্রাম থেকে ধরে নিয়ে আসে আমার জেঠতুতো বোনের শ্বশুর যোগেশ দেবনাথকে। ফাউগান বাজার অবধি এনে ওনাকে পিছমোড়া করে বেঁধে কোরান শরিফ থেকে কলমা পড়তে বলেন মুসলমান কিনা যাচাই করতে । উনি ছিলেন সহজ সরল গ্রামীন মানুষ । কিছু না ভেবেই বলেছিলেন নাকি “আমি তো হিন্দু কলমা পড়তে জানি না” আর যাবে কোথায় ? পাশেই ছিল কেরোসিন তেলের দোকান । ওখানে নিয়ে গিয়ে হাত পা চোখ বাঁধা অবস্থায় জ্যান্ত তেল ভর্তি ড্রামে ফেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয় । সেই সারি সারি তেল ভর্তি ড্রাম ফেটে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে আশেপাশের দোকান আর বাড়ি সব পুড়ে ছাই হয়ে যায় । শহীদ হন যোগেশ দেবনাথ ।
আমার পিসিমা আশ্রিত ছিল মামা বাড়ি কাপাসিয়ার নারায়ণপুর গ্রামে ।সেখানেও রেহাই ছিল না । ঠাম্মীর কাকা রসিকলাল দেবনাথ সহ অনেক জনকে ধরে নিয়ে শীতলক্ষা নদীতে হাটুজলে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে নির্মমভাবে ।

বাবা জ্যোতিষ কুমার দেবনাথ ও মুন্সি দাদু

অবশেষে দীর্ঘ নয় মাস পর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করার পর আমাদের পরিবার সহ বাকি পরিবার গ্রামে ফিরে আসে । বাড়িতে আসার মতো পরিস্থিতি ছিল না বিজয় লাভের পর ও। রাজাকারেরা চোরাগোপ্তা হামলা করে যাচ্ছিল বাড়িঘর লুটপাট করতে । ওদের হাতে ও যথেষ্ট অস্ত্র গোলা বারুদ ছিল । বাবা আর মেজোকাকু সহ আমাদের এলাকার বাকি মুক্তিযুদ্ধাগন তখন নতুন লড়াইয়ে ব্যাস্ত আর তা সমূলে রাজাকার নিধনের লড়াই । সেই সময়ে আমাদের পরিবার আশ্রয় পেয়েছিল পাশেই আমাদের ধানের জমি চাষ করতেন মুন্সি দাদু ওনাদের বাড়িতে। মুন্সি দাদু যুদ্ধ কালীন পুরো সময়ে বাবার সাথে আমাদের পুরো ফাউগান বড়বাড়ী পাহারা দিয়ে আগলে রেখেছিলেন । তারপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সমস্ত অস্ত্র জমা দেন বাবা । আর লড়াই….! আজও চলছেই ….সমাজ বদলের নিজের স্বাধীন দেশে. ..। ধন্য আমি ওমন পরিবারে জন্মে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button