জাপানীরা কেমন : পর্ব-২৪
প্রসঙ্গ : জাপানী শিশুদের আত্মহত্যা
প্রকৃতি তার নিজস্ব ধারাতে চলে। যেমন, যে নদীর উৎস পর্বত, সে নদীর প্রবাহ থাকে সমুদ্রের দিকে। তার মাঝখানে বাঁধ দিয়ে তার জল প্রবাহ থামাবার চেষ্টা করলে পরিণাম হয় ভয়াবহ। তাহলে সে নদীর পানি ফুলে ফেঁপে প্লাবনে শত শত লোকের প্রাণহানি হতে পারে। ক্ষতি হয় ফসলাদির। আদিকাল থেকেই প্রকৃতি তার নিজস্ব ধারাতে চলছে এবং অনন্তকাল চলতে থাকবে। ঠিক তেমনি প্রাণী-কুলেও প্রকৃতির প্রভাব রয়েছে। সে প্রভাবকে প্রতিহত করার চেষ্টা করলে প্রাণী-কুলে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। জাপানে শিশুদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গেছে। পত্রিকার খবর! সম্প্রতি জাপানের হেলথ, লেবার এবং ওয়েলফেয়ার মন্ত্রণালয়ের এক রিপোর্টে ২০১৫ সালে ৬ জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের, ১০২ জন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এবং ২৪১ জন উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। এক বছরে সর্বমোট ৩৪৫ জন ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। শিশুদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে জাপান সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু তাতে আশাতীত ফল পাওয়া যায়নি। এই আত্মহত্যার কারণ সমূহ জানার জন্য সরকার কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে এবং সে তথ্যের ফল প্রকাশ করেছে। সে গুলি হল যথাক্রমেঃ
১। শিশুর (ছাত্র) অস্বাভাবিক ব্যবহার ও পরিবর্ত্ন,
২। বিদায় নেওয়ার পরিকল্পনা,
(কিছু ব্যবহৃত জিনিষ গুছানো; ব্যবহৃত ছোটোখাটো জিনিষ পত্র একটি পাত্রে রাখা; মূল্যবান জিনিষপত্র
ফেলে দেওয়া, ইত্যাদি।) এমন পরিস্থিতি দেখে বুঝতে হবে যে শিশুটি কিছু অঘটন ঘটাবে।
৩। মাদকদ্রব্যে আসক্তি বা ড্রাগ এডিকটেড,
৪। শিশুটির নিকটতম কোন বন্ধুর আত্মহত্যার প্রভাব,
৫। আত্মহত্যা করার ইঙ্গিত সমূহ,
৬। নিজের দেহে ক্ষতের সৃষ্টি করা,
৭। মাঝে মাঝে ঘর থেকে কিছু না বলে চলে যাওয়া!
শিশুদের আত্মহত্যা প্রদমনের জন্য ২০১৫ সালে জাপান সরকার একটি “হোয়াইট পেপার” প্রকাশ করেছে।
তাতে বলা হয়েছে যে সকল শিশু – যারা ১৮ বৎসরের নিচে, তাদের উপর ১৯৭২ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪২ বৎসরের সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছে যে বসন্তের ছুটি অথবা দীর্ঘ স্কুল ছুটির পর ছাত্রদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি বেড়ে যায়। এই সময়ে প্রায় ১০০টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। “ স্কুলের লেখাপড়ার অতিরিক্ত চাপ ও ভীতি যা ১২ থেকে ১৮ বৎসর বয়স্ক ছাত্র ও ছাত্রীদের মনের ভিতরে ব্যাপক আন্দোলন সৃষ্টি করে এবং সে কারণে ক্লাসে তারা অনুপস্থিত থাকে এবং সমাজ থেকে নিজেদের লুকিয়ে রাখে!” এই বক্তব্য রেখেছেন জনৈক স্কুল কাউন্সেলর। লম্বা স্কুল ছুটিও শিশুদের মনে পরিবর্তন আনে। তৎজন্য তিনি ছাত্রছাত্রীদের পিতামাতাকে সচেতন থাকার জন্য আহবান জানিয়েছেন।
কিন্তু তা কি সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য বা কার্যকর করা সম্ভব হবে? সুদীর্ঘ সাড়ে তিন দশক জাপান প্রবাসে থেকে জাপানীদের জীবন যাত্রার ত্রুটিগুলি ধরতে পেরেছি। সেগুলির মধ্যে হল শিশুদের দাদাদাদি ও নিকটতম আত্মীয় স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা। উদাহরণ হিসাবে নিম্নলিখিত কারণ সমূহ অন্যতম!
১। একটি পরিবারে ২টি সন্তান যদি থাকে এবং তারা যখন বড় হয়ে বিয়ে করে আলাদা হয়ে ভিন্ন শহরে বাসা নিয়ে থাকে। তারপর যদি তাদের কোন সন্তান হয় – তখন তারা নিজস্ব পরিবারেই কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকে। একটি পরিবারের সন্তানেরা লোন নিয়ে বাড়ি কিনে দাদাদাদির নিকট থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাদের সন্তানেরা তখন কাজিনদের সাথে ‘গেট টুগেদার’ পার্টিতে যোগ দেওয়ার কোন সুযোগই পায় না। ফলে তারা তাদের নিকটাত্মীয়দের স্নেহ মমতা থেকে বঞ্চিত থাকে। শিশুদের বিনোদনের জন্য কাজিনদের এবং দাদাদাদি ও নানানানির আদর এবং সান্নিধ্যের খুবই প্রয়োজন।
২। যদি কোন শিশুর পিতামাতা উভয়ে চাকুরী করেন, এমন ক্ষেত্রে যখন শিশুটি স্কুল থেকে ঘরে ফিরে। তখন সে কার নিকট তার মনের কথা বলবে? সেল ফোন, টিভি গেইমের যুগেও এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়! সে ক্ষেত্রে শিশুটি একা ঘরে থাকে নিরানন্দ পরিবেশে। তখন তার মানসিক প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে?
৩। অল্প বয়সের শিশু রেখে অনেক পিতামাতা তালাক দিয়ে অন্যত্র বিবাহ করে থাকে। যদি শিশুটির বাবা অন্যত্র থাকে এবং শিশুটি মায়ের কাছে থাকে এবং মা সে সন্তানকে সরকারী অনুদানে লালন পালন করে – তাতে শিশুটি বাবার আদর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়। আর যদি মায়ের নিকট না থেকে বাবার নিকট থাকে এবং সৎমা থাকে – তখন কি শিশুটি প্রকৃত মায়ের আদর পাবে? এমনতর আরো অনেক কারণ আছে। যার জন্যে শিশুরা অসহায় হয়ে পড়ে এবং মনের কথা ব্যক্ত করার মতো তাদের নিকটতম কেউ কাছে থাকে না।

আজ থেকে পনের বৎসর আগের কথা। প্রাথমিক স্কুলে যখন আমার পুত্র সন্তানটি চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে তখন তার সাথে একটি ছেলে, নাম তার শুস্কে, খেলতে আসত। ছেলেটি আমার বাসা থেকে ২০০ মিটার দূরে তার বৃদ্ধ দাদাদাদির সাথে থাকে। একদিন জানতে পারলাম যে ছেলেটি আমার সন্তানের সহপাঠি নয়। শুস্কে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র। এদেশে একই ক্লাসের ছেলেরা মিলেমিশে খেলাধুলা করে। কিন্তু শুস্কের কোন বন্ধু না থাকায় সে আমার ছেলের সাথে খেলত। অনেক পরে তার করুণ কাহিনী যখন জানলাম। তখন শুস্কে আত্মহত্যা করেছে। তার বয়স তখন ১৮ বৎসর। শুস্কের পিতামাতার তালাক হওয়ার পরে সে তার দাদাদাদির কাছেই থাকত। তার মা অন্য শহরে বিয়ে করে থাকে এবং তার বাবা দূরের আরেকটি শহরে গিয়ে বিয়ে করে বাসা নিয়ে থাকে। ছেলেটিকে তার মা নিদাবি করে দিয়ে তার বাবাকে দিয়েছে। তার বাবা আরেকটি বিয়ে করে শুস্কে কে তারা দাদাদাদির নিকট ফেলে গেছে। শিশুকালে কোমলমতি শিশুদের কতই না স্বপ্ন থাকে। কিন্তু যে শিশুটি তার বাবা মায়ের স্নেহ-মমতা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত সে কার নিকট তার আবদারটুকু বলবে? বৃদ্ধ দাদাদাদির পরিবার স্বচ্ছল ছিল না। ঘর পেইন্টিং এর কাজ করে সংসার চালায়। …… এভাবে শুসকে জুনিয়ার হাই স্কুল পাশ করে একটি ভোকেশন্যাল স্কুলে এক বৎসর পড়াশুনা করে ফ্যাকটরিতে একটি কাজ করত।
যখন তার বয়স আঠার বৎসর। সে একটি ইউজ্ড গাড়ি লোনে কিনার জন্য চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু লোন নিতে হলে তারা বাবাকে গ্যারান্টর হতে হবে। মাসে মাসে লোনের টাকা অবশ্য শুসকে পরিশোধ করবে। সে তার মটর বাইকে ৩০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে তার বাবাকে বলল, “বাবা, তুমি শুধু সাইন দিবে। লোনের টাকা আমি বেতন পেয়ে মাসে মাসে পরিশোধ করব। দিন তারিখ ঠিক হল। তার বাবা রাজী হয়ে সাইন দিতে যাবে বলল। কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে শুসকের বাবা আসল না। এই ভাবে তিনবার কথা দিয়েও তাঁর বাবা আসেনি। শুসকে তার বন্ধুদের বলেছে যে গাড়ি কিনে সে তার বন্ধুদের নিয়ে একটি টূরিষ্ট স্পটে নিয়ে যাবে। বন্ধুরা সে দিনটির জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু শেষবার কথা দিয়েও যখন তার বাবা এল না। সে রাতেই সে লজ্জা ও অপমান সয্য করতে না পেরে তার ঘরের কামরায় গভীর রাতে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করল। খবর পেয়ে তাকে আমি দেখতে গিয়েছিলাম। সেদিন অবশ্য তার বাবা তার পুত্রের মৃত লাশের পাশে বসা ছিল।
হ্যাঁ, জাপান শিক্ষা মন্ত্রণালয় “Leading toll-free help lines for child suicide prevention” এর জন্য “24 hour child SOS dial” ( Tel. 0120-0-78310 ) চালু করেছে। জাপান প্রবাসী শিশুরা হয়তো তাতে কিছুটা উপকৃত হতে পারে।কারণ, অনেক বাঙালি মা বাবাও সন্তান ঘরে রেখে চাকুরী করেন।
পরিশেষে আবার বলতে চাই যে প্রকৃতির বিপরীতে অবস্থান নিয়ে সকল সমস্যার সমাধান করা যায় না! প্রকৃতির সাথে যথাসম্ভব মিল রেখে জীবন যাপন করা উচিত! পৃথিবীতে প্রকৃতির প্রভাব সর্বত্র থাকে।
(চলবে)




