খেলা

প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ কেন উরুগুয়েতে হয়েছিল?

ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম আসর অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩০ সালে, উরুগুয়েতে। জাকজমকের সাথে ১৩ জুলাই উদ্বোধন হয়েছিল আসরের। শেষ হয়েছিল একই মাসের ৩০ তারিখে। মোট তিনটি ভেন্যুতে ১৩টি দলের অংশগ্রহণে ১৮টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। সে বার চ্যাম্পিয়ন হয় আয়োজক দেশ উরুগুয়েই। আর রানারআপ আর্জেন্টিনা। তবে এতো দেশ থাকতেও প্রথম আসরের আয়োজন কেন উরুগুয়েতে করা হয়েছিল?

উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ

প্রথম আসরের আয়োজক দেশ কে হবে- এ নিয়ে ফিফা ১৯২৯ সালে বার্সেলোনায় সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সেখানে উরুগুয়েকে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হয়। কারণ সেবছর উরুগুয়ে স্বাধীনতার শতবর্ষে পা দিয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, আগের বছর অর্থাৎ ১৯২৮ গ্রীষ্ম অলিম্পিকে শিরোপা জিতেছিল উরুগুয়ে ফুটবল দল।

প্রথম আসরে অংশ নেয়া ১৩টি দলের মধ্যে আমেরিকার নয়টি ও ইউরোপের চারটি দল ছিল। ভ্রমণের খরচ ও সময় বিবেচনা করে অনেক ইউরোপীয় দল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে।

টান টান উত্তেজনার সেই ফাইনাল ম্যাচ

বিশ্বকাপের প্রথম দুটি ম্যাচ যুগপৎভাবে অনুষ্ঠিত হয় ফ্রান্স ও মেক্সিকোর মধ্যে যাতে ৪-১ গোলে ফ্রান্স জয়ী হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়ামের মধ্যে যাতে ৩-০ গোলে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হয়।

বিশ্বকাপের প্রথম গোল করেন ফ্রান্সের লুসিয়েন লরেন্ত। ফাইনালে উঠে যায় প্রতিযোগিতার ফেবারিট উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা। ৯৩ হাজার দর্শকের সামনে উরুগুয়ে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে পরাজিত করে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা লাভের গৌরব অর্জন করে। তবে সেরা গোলদাতা কিন্তু ছিলেন আর্জেন্টিনার গিয়ের্মো স্তাবিলে।

কেমন হয়েছিল সেই ফাইনাল ম্যাচ?

১৯২৮ সালের অলিম্পিকের ফাইনালের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালেও লড়াই করে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে। বিশ্বকাপের জন্য মল্টিভিডিওতে নতুন স্টেডিয়াম তৈরি করে উরুগুয়ে। সেই স্টেডিয়ামে দুই দেশের ৯০ হাজার সমর্থক হাজির হয়েছিলেন। আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনেস আয়ার্স থেকে নদী পেরিয়ে হাজার হাজার মানুষ এসে হাজির মল্টিভিডিওতে। স্টেডিয়াম কানায় কানায় ভরে যায়, তবু কাতারে কাতারে মানুষ আসতে থাকে।

উত্তেজনায়, রোমাঞ্চে, আবেগে মল্টিভিডিও শহর তখন কাঁপছে। তারই সাথে পাল্লা দিয়েই যেন উত্তপ্ত হয়ে উঠে শহরের পরিবেশ। হু হু করে বেড়ে যায় বাজির দর। টিকিট পাওয়া দুস্কর। আশঙ্কা দেখা দিলো হামলার। তার মোকাবিলা করার জন্য স্টেডিয়ামের চারদিকে ঘিরে ফেলা হলো পুলিশ আর মিলিটারি দিয়ে। প্রত্যেকটি দর্শককে তল্লাশির পর ঢুকতে দেয়া হলো মাঠে। অস্ত্রটস্ত্র তো দূরের কথা, বিয়ারের বোতল পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হলো তাদের কাছ থেকে।

আর্জেন্টিনার জালে উরুগুয়ের গোল

খেলার শুরুতেই ঝামেলা। আর্জেনটিনা সাথে করে বল এনেছে। তারা দাবি জানালো তাদের বলেই খেলা হবে। উরুগুয়েও ছাড়বে না। তারাও সাথে করে বল এনেছে। কেউ কারো গোঁ ছাড়বে না। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো, টসে ঠিক হবে কোন দলের বলে খেলা হবে। টসে জিতলো আর্জেনটিনা।

শুরু হলো খেলা। দু’দলই জেতার জন্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মল্টিভিডিওর নতুন স্টেডিয়ামে নব্বই হাজার দর্শক তখন উত্তেজনায় টানটান। মাঠের বাইরের হাজার হাজার মানুষ। কাজকর্ম সব বন্ধ। খেলার ১২ মিনিটের মাথায় পাবলো ডোরাডো গোল করে উরুগুয়েকে এগিয়ে দিলেন। আনন্দে নাচতে লাগলেন উরুগুয়ের সমর্থকরা। আর্জেনটিনা থেকে আসা হাজার হাজার দর্শক চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছেন তাদের খেলোয়াড়দের।

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আর্জেনটিনার কারলোস পিডসেলে গোলটা শোধ করে দিতেই আর্জেনটিনার খেলায়াড়রা বাঘের মতো ঝাপিয়ে পড়লেন জয়ের মূলধন জোগাড়ে আনার জন্য। এলোও তাই। বেলজিয়ামের জন ল্যাংগ্রেনাস অতর্কিতে গোল করে বসলেন। গোলটি নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলেও রেফারি কিন্তু গোলের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। ২-১ গোলে এগিয়ে গেলো আর্জেনটিনা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে বদলে গেলো খেলার চেহারা। খেলা শুরু হওয়ার সাথে সাথে ঝাঁপিয়ে পড়লেন উরুগুয়ের খেলোয়াড়রা। একজনের পর একজনকে কাটিয়ে গিয়ে গোল করে সিয়া উরুগুয়েকে সমতায় এনে দিলেন (২-২)।

প্রথম বিশ্বকাপের ট্রফি

তারপরই ইরিয়ার্টে এগিয়ে দিলেন উরুগুয়েকে। উরুগুয়ের সমর্থকদের আনন্দ উচ্ছ্বাস আরো বেড়ে গেলো ক্যাসট্রো দুরপাল্লার এক দূরন্ত শটে যখন হার মানালেন আর্জেনটিনাকে। ৪-২ গোলে জিতে উরুগুয়ে প্রথম বিশ্বকাপ বিজয়ী দেশ হিসেবে নিজের নাম লেখালো ইতিহাসের পাতায়।

দক্ষিণ আমেরিকার ছোট দেশ উরুগুয়ের (জনসংখ্য মাত্র ২৫ লাখ) সরকার পরদিন জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করলেন। আনন্দের বন্যা বইতে লাগলো সারা দেশ জুড়ে।

আর রাগে, দুঃখে জ্বলতে জ্বলতে আর্জেনটিনা রেফারির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ঝাল মেটাতে চাইলো। সেই অভিযোগের ঝাটপা ঝড় তুললো বুয়েনেস আয়ার্সের পথে পথে। শুধু তাই নয় বুয়েনেস আয়ার্সে উরুগুয়ের রাষ্ট্রদূতের দফতর আর বাড়ির সামনে প্রচণ্ড বিক্ষোভ দেখালো তারা। ভাঙচুরও করল। ফলে উরুগুয়ে আর আর্জেনটিনার ফুটবল সংস্থার কর্তাদের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে গেল। সব মিলিয়ে কিন্তু প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা দারুণভাবে সফল হলো। হাসিমুখে প্যারিসে ফিরে গেলেন জুলে রিমে।

টান টান উত্তেজনার এই ফাইনালের কেবল একজন খেলোয়াড় আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকার ফ্রান্সিসকো ভ্যারালো ২০০৭ সাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।

প্রতিযোগিতার পরে ফ্রান্স, যুগোশ্লাভিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আমেরিকায় প্রীতি ম্যাচে খেলে। ব্রাজিল ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ১৯৩০ সালের ১ আগস্ট, যুগোশ্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ১০ আগস্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ১৭ আগস্ট ম্যাচ খেলে। আর ৩ আগস্ট যুগোশ্লাভিয়ার বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচে অংশ নেয় আর্জেন্টিনা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button