স্পটলাইট

নেদারল্যান্ডের জারবেরা এখন মানিকগঞ্জে

আব্দুর রাজ্জাক
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে ফুলের চাহিদা থাকায় দিন দিন ফুল চাষের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। সেই সাথে এ কাজে কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। বাংলাদেশে যেসব অঞ্চল এরই মধ্যে ফুল চাষে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে তার মধ্যে মানিকগঞ্জ জেলা অন্যতম। রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী হওয়ায় এবং যোগাযোগব্যবস্থা ভালো থাকায় মানিকগঞ্জের ফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
এ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ হয়ে থাকে সবচেয়ে বেশি। লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছরই ফুল চাষের দিকে ঝুঁকছেন এ অঞ্চলের কৃষক। সিঙ্গাইর উপজেলার ধল্লা, জয়মন্টপ, মানিকনগর, তালেবপুর, নিলটেক, জাইল্যাÑ এসব এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে বিভিন্ন জাতের ফুলের চাষ হয়ে আসছে। এসব ফুলের মধ্যে রয়েছে দেশী আবার কোনোটি বিদেশী প্রজাতির ফুল। গোলাপ, জিপসি, দোলনচাঁপা, গ্যালারি, রজনীগন্ধা, গাঁদা, জারবারা ও ক্যারন ভেলি অন্যতম। এ ছাড়া অন্যান্য প্রজাতির ফুলও চাষ করা হয়ে থাকে। উৎসবভেদে একেক সময় একেক রকম ফুলের চাহিদা রয়েছে। সিংগাইরের জয়মন্টপ গ্রামের কৃষক আব্দুল আলী জানান, আগে কৃষিকাজ করতাম; কিন্তু লাভ কম।
এক শতাংশ জমিতে ধান হতো ১৫ থেকে ২০ মণ। খরচ পড়ত ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। ধানের দর ভালো না হলে লোকসানও হতো। কিন্তু ফুল চাষে মাত্র একবার বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু এক থেকে দেড় বছরের ভেতর বিনিয়োগের টাকা উঠে আসে। এরপরের কয়েক বছর শুধু লাভ। বাস্তা গ্রামের চান মিয়া জানান, প্রথমে অল্প পরিমাণ জমিতে গোলাপ, গাঁদা, জিপসি, ক্যান্ডেলিনা, গ্যালোডিওলাসসহ বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ করেছিলেন। অন্যের ২২ বিঘা জমি লিজ নিয়ে বৃহৎ পরিসরে ফুলের বাগান করেছি। বাবার কাছ থেকে লাখ খানেক টাকা নিয়ে কাজটি শুরু করেছিলাম। জমি খরচ, শ্রমিক, সার, কীটনাশক সব খরচ মিটিয়েও মওসুমে কয়েক লাখ টাকা লাভ হচ্ছে।
এ দিকে ভারত ও নেদারল্যান্ডের প্রিয় ফুল জারবেরা এখন ফুটছে মানিকগঞ্জের মাটিতে। বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা এই ফুল রাজধানীর বিভিন্ন ফুলের দোকানে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। গন্ধহীন হলেও এই ফুলের নান্দনিক সৌন্দর্যে অভিভূত সৌন্দর্যপ্রেমীরা।
জানা যায়, ২০১২ সাল থেকে স্পেক্ট্রা ফ্লাওয়ার গার্ডেনে বাণিজ্যিকভাবে জারবেরা চাষ শুরু করেন প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন। তার ফোটানো নজরকাড়া জারবেরা রাজধানীর ফুলের দোকানগুলোতে শোভা পায়। গন্ধহীন হলেও জারবেরার নান্দনিক সৌন্দর্যে অভিভূত ফুলপ্রেমীরা।
মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটসংলগ্ন ধুতরাবাড়ি এলাকায় পাঁচ একর জমির ওপর আফতাব উদ্দিনের এ গার্ডেন। শুরুতে বাগানে নানা বৃক্ষরাজি-ফুল ও ফলের গাছ চাষ করেন। কিন্তু বছর শেষের আগেই জারবেরার প্রতি ঝুঁকেন তিনি। প্রথমে এক বিঘা জমিতে গ্রিন হাউজ তৈরি করেন। এরপর মাটি প্রস্তুত করে ফুলের চারা রোপণ করে প্রয়োজনীয় তদারকি শুরু করেন আফতাব। শুরুতে খরচ হয় ১৫ লাখ টাকা। বর্তমানে বাগানে আড়াই বিঘা জমিতে জারবেরা ফুলের চাষ হচ্ছে। প্রতিদিন এ বাগান থেকে দুই হাজার ফুল রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে যাচ্ছে। প্রতিটি ফুল পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১৫-২০ টাকায়।
বিয়ে, জন্মদিন, বসন্ত উৎসব, পহেলা বৈশাখ, থার্টি ফাস্ট নাইটসহ নানা উৎসবে এ ফুলের চাহিদা বেড়ে যায়। তখন প্রতি পিস ফুল বিক্রি হয় ২০-৩০ টাকায়। শীত মওসুম জারবেরা চাষের উপযুক্ত সময়। এ ফুলের প্রধান শত্রু বৃষ্টি। সোম থেকে বৃহস্পতি সপ্তাহে চার দিন ফুল তোলা হয়। এ ফুলের পাইকার বাজার রয়েছে শাহবাগ, গুলশান ও বনানীতে।
বাগানের ইনচার্জ আমিরুজ্জামান চৌধুরী জানান, বাগানে হলুদ, সাদা, কমলা, গোলাপী রঙ মিলিয়ে ১১ প্রজাতির জারবেরা ফুল রয়েছে। এর মধ্যে ব্যালাঞ্চ, ইনট্রান্স, ডেনা, ইলেন, গোল্ড স্মিথ, রোজালিন, ফিরোজা, কুল্ড, রিয়েল, ডুনি, আর্টিস্ট, অ্যাডেন চূড়া প্রধান আকর্ষণ। তিনি বলেন, জারবেরা ফুল চাষ করতে প্রথমে গ্রিন হাউজ বানাতে হয়। এরপর জৈব ও রাসায়নিক সার দিয়ে মাটি প্রস্তুত, ফুলের চারা রোপণ করে তা পরিচর্যা করতে হয়। এজন্য বেড বানাতে হয়। প্রতি বেডের দৈর্ঘ্য ২৪ ইঞ্চি। বেডের মাঝখানে ১৫ ইঞ্চি দূরত্ব রাখতে হয়। আর চারার লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ১৮ ইঞ্চি হয়। প্রতি চারার মাঝখানে ১৩ ইঞ্চি দূরত্ব রেখে চারা রোপণ করতে হয়। জারবেরা ফুলের চারা রোপণের দুই-তিন মাসের মধ্যে ফলন শুরু হয়। একাধারে তিন বছর পর্যন্ত গাছে ফুল ধরে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আলিমুজ্জামান মিয়া জানান, জারবেরা ফুল চাষে মূলধন বেশি লাগে। এ ফুল চাষে আগ্রহীদের স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button