সুস্থ থাকুন

আক্রান্ত ৭০ ভাগ রোগীই মারা যায় বিনা চিকিত্সায়

স্তন ক্যান্সার সচেতনতা দিবস
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী (২৩) জেরিন। তিনি হঠাত্ খেয়াল করেন, তার স্তন থেকে সাদা একধরনের পদার্থ বের হচ্ছে। যা দেখতে দুধের মতোই। অবিবাহিত মেয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত অস্বস্তিকর। জেরিন বিষয়টি কারো সঙ্গে শেয়ার না করে চেপে থাকেন মাস তিনেক। এরপর তার স্তনের আকৃতি বদলাতে থাকলে, ভয় পেয়ে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হন। চিকিত্সক পরীক্ষা করিয়ে স্তনে একটি সিস্টের অস্তিত্ব পান। এরপর সঠিক চিকিত্সায় জেরিন ৩ মাসেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। চিকিত্সক জানান, এটি তার খাওয়া অন্য একটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
রেখা রহমান (৫৫)। তার স্তনে ব্যথা ও তরল পদার্থ বের হতে দেখেও তিনি চিকিত্সকের কাছে না গিয়ে অপেক্ষা করেন যুক্তরাষ্ট্রে তার মেয়ের কাছে গিয়ে চিকিত্সা নেওয়ার। এরই মধ্যে ৩ মাস পেরিয়ে যায়। এরপর চিকিত্সকের কাছে যখন যান তখন তিনি জানান, সেটা ছিল রেখা রহমানের স্তন ক্যান্সারের তৃতীয় স্তর। এরপর কেমোথেরাপি দিয়ে, একটা সময় অপারেশন করে স্তন ফেলে দিলেও আর শেষ রক্ষা হয় না। এক বছর পরেই রেখা রহমান মারা যান।
এ ভাবে শুধু অসচেতনতা আর লোকলজ্জায় দেশে প্রতি বছর নতুন করে ২২ হাজার নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। এই আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৭০ ভাগ রোগী বিনা চিকিত্সায় মারা যাচ্ছেন। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তদের ৮৯ শতাংশই বিবাহিত। যাদের গড় বয়স ৪১ বছর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্তন ক্যান্সারের বিভিন্ন ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হলে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং রোগী শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়াসহ এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে পারলে ৯৯ ভাগ রোগীকেই সুস্থ করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন একটি জাতীয় নীতিমালা ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে সম্পৃক্ত করা। আজ ক্যান্সার সচেতনতা দিবস উপলক্ষে পালিত হবে নানা কর্মসূচি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, কেবল সচেতনতার অভাবেই দেশে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা বাড়ছে। যখন চিকিত্সায় সুস্থ হওয়ার আর তেমন কোনো সম্ভাবনা থাকে না, তখন তারা চিকিত্সকের কাছে আসেন। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগটি নির্ণয় করতে পারলে ৯০ শতাংশ নিরাময় করা সম্ভব।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনি অনকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাবেরা খাতুন বলেন, গ্রামের নারীরা সচেতন হয়েছে কি-না, এটা দেখার বিষয়। আমাদের দেশে স্তন ক্যান্সার রোগীদের গবেষণা নেই, গবেষণা করে জানতে হবে আমাদের চিকিত্সায় রোগী শতকরা কতজন সুস্থ হচ্ছে, সেটা পর্যাপ্ত কি না। ২০১৩ সাল থেকে সচেতনতা বিষয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কিন্তু এটা কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে। তিনি সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকে ছোট ছোট গল্পের মাধ্যমে স্তন ক্যান্সার বিষয়ে সচেতন করার পরামর্শ দেন।
আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের অনকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এহেতাসামুল হক বলেন, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, লজ্জা ও সচেতনতার অভাবে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এছাড়া খাদ্যাভাস, বয়স, ওজনাধিক্য, দীর্ঘদিন ধরে হরমোনের ওষুধ সেবনও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। তিনি বলেন, স্তন ক্যান্সার শনাক্তকরণে নারীরা নিজেই বড় পরীক্ষক। প্রতিবার ঋতস্রাবের ৩ থেকে ৪ দিন পরই নারীরা নিজ স্তন পরীক্ষা করে এ সম্পর্কে অবগত হতে পারেন। কোনো সমস্যা মনে হলে চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে, স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বাংলাদেশ স্তন ক্যান্সার সচেতনতা ফোরাম প্রধান সমন্বয়কারী ও জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল ক্যান্সার ইপিডেমিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোঃ হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, আমাদের দেশে সচেতনতার অভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেক দেরিতে ক্যান্সার ধরা পড়ে। এ কারণে চিকিত্সায় রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। এ রোগের বিভিন্ন ঝুঁকির বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে পারলে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।
স্তন ক্যান্সার সচেতনতা দিবস ও মাস হিসেবে নানা আয়োজন করা হয়েছে— আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের বহির্বিভাগে বিনামূল্যে স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম ১২ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এছাড়া সাভারের একটি কারখানার নারী শ্রমিকদের মাঝে এবং সূচনা কমিউনিটি সেন্টারে সিটি কর্পোরেশনের পাঁচ হাজার নারী পরিচ্ছন্ন কর্মীকে স্ক্রিনিং করানো হবে বিনা মূল্যে।
১০ অক্টোবর মঙ্গলবার সকাল আটটায় জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে উদ্বোধনী আলোচনা। সকাল ৯ টায় খোলা পিকআপে শুরু হবে গোলাপি সড়ক শোভাযাত্রা। সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে। আগামীকাল বুধবার বিকাল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে নারী সমাবেশ, স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ঢাকার বাইরে ১০ এবং ১৫ অক্টোবর দুইদিনে ভাগ হয়ে সকল জেলায় অনুরূপ কর্মসূচি পালিত হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button