আন্তর্জাতিক সংবাদ

পাকিস্তানের রাজনীতি লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছেন এক সুন্দরী!

মো: বজলুর রশীদ
গুলালা এবং ইমরান খানগুলালা এবং ইমরান খান
ডাকনাম গুলালা, পুরো নাম আয়শা গুলালাই উজির, পাকিস্তানের একজন মহিলা সংসদ সদস্য। পাকিস্তান তাহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই থেকে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য। ইমরান খান পিটিআই প্রধান বা সভাপতি। গুলালাই পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেন এবং দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান থেকে মানবাধিকার কর্মী হিসেবে রাজনীতির পাঠ শুরু করেন। তিনি মুসলিম লীগেরও সদস্য ছিলেন এবং সে দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কম বয়সের কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। ২০১২ সালে পিটিআই কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য পদ লাভ করেন এবং ২০১৩ সালে সংসদ সদস্য হন।
১ আগস্ট ২০১৭, তিনি ইমরান খানের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ তুলে দল ছাড়েন। তিনি দাবি করেন, মোবাইলে ইমরান খান ‘অশোভন’ টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছেন, মহিলাদের প্রতি তার কোনো সম্মানবোধ নেই। তবে এটা ২০১৩ সালের ঘটনা। ২০১৬ সালেও এমন হয় বলে তিনি জানান।
পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএলএন) নেতা হানিফ আব্বাসী বলেন, গুলালা ইমরানের মুখোশ উন্মোচিত করেছেন। ইমরানের ব্ল্যাকবেরি চেক করলেই অশালীন উক্তিগুলো প্রকাশ পাবে। তিনি আরো বলেন, ‘সব সময় লোকজনকে উপদেশ দেই- তোমরা তোমাদের মা-বোন-মেয়েদের ইজ্জত বাঁচানোর জন্য ইমরানের মিছিলে ও জনসভায় পাঠাবে না।’
এক টিভি শোতে বলা হয়, রেহাম খান ও গুলালা মিলে অভিযোগের ডিমে তা দিয়েছেন। রেহাম খান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘কুরআন ধরে শপথ করছি, এসবের মধ্যে আমি নেই। রাজনীতিতে আসতে চাই না। গুলালার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, না মুসলিম লীগের সাথে। যাকে দুই বছর আগে ফেলে এসেছি (ইমরান খান) তার সাথে আমার কী? নিজের ডুবন্ত রাজনৈতিক কেরিয়ার বাঁচানোর জন্য ইমরান আবোল-তাবোল বকছেন। পেছন থেকে কিছু করব না। তার রাজনৈতিক জীবনের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’
ইমরান খান সম্পূর্ণ বিষয় অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, গুলালা মুসলিম লিগ নওয়াজ গ্রুপের কাছে ‘পয়সার বিনিময়ে বিক্রি’ হয়েছেন। আরো অনেক কিছু এখন পাকিস্তানের রাজনীতিতে গুলালা ঝড়কে আরো আন্দোলিত করছে। নওয়াজ শরিফের ভাইপো সংসদ সদস্য হামজা শাহবাজের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী আয়শা আহাদ জানান, হামজা তাকে প্রতারিত করেছেন। হামজাও স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রেস কনফারেন্স ডেকেছেন। পাঞ্জাবের আইনমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ শাহবাজের প নিয়ে বক্তব্য রাখায় আয়শা সানাউল্লাহর বিরুদ্ধে ‘চরিত্র হননের’ অভিযোগে মামলা করার শপথ করেছেন। আয়শা আহাদ তার উকিল বাজওয়াকে দিয়ে রানা সানাউল্লাহর কাছে ২০ মিলিয়ন তিপূরণের মামলার নোটিশও দিয়েছেন।
গুলালার বিষয়টি বিচারের জন্য জিরগার কথা বলা হচ্ছে। যেহেতু গুলালা খাইবার পাখতুনের মেয়ে সেজন্য তার বিষয়টি উপজাতীয় নিয়মে জিরগায় বিচার হবে। তারপর আদালতে যা হওয়ার তা হবে। এ বিষয়টি উপস্থাপন করেন জেরিন জিয়া, আরেক সংসদ সদস্য। গুলালা পিটিআই ছাড়ার সময় বলেন, এই দলে মহিলারা নেতাদের হয়রানি ও নিগ্রহের শিকার হন। পিটিআই-এর অন্যান্য মহিলা সংসদ সদস্য ও নেত্রীরা অভিযোগ করেন, আসলে নওয়াজ শরিফ ইমরানকে ঘায়েল করার জন্য তাকে ব্যবহার করছেন। গুলালা চার বছর চুপ থাকার কারণ কী? গুলালা দাবি করেন, ইমরান ব্ল্যাকবেরি ফোন থেকে অশোভন মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। জবাবে জেরিন জিয়া বলেন, ইমরান ব্ল্যাকবেরি ফোন ব্যবহার করেন না।
আসলে পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। বিশেষ করে এক অশান্ত সময়ে গুলালার দাবি রাজনৈতিক মঞ্চে ঝড় তুলেছে। টিভি, পত্রিকায় এ বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। ইমরানকে অনেক চ্যানেল এমন করে উপস্থাপন করছে যেন তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন, যদিও নির্বাচন এখনো ঢের বাকি। তেমন একজন ব্যক্তির বিরোধে নারী নিগ্রহের অভিযোগ পাকিস্তানের রাজনীতিতে ঝড় তুলেছে।
গুলালার অভিযোগ হয়তো সময়ে নিষ্পত্তি হবে কিন্তু রাজনীতির ময়দান এখন খুবই উত্তপ্ত। পিটিআই-এর মহিলারা গুলালাকে মা চাইতে বলেছেন। নতুবা তার এলাকার নিয়মানুযায়ী জিরগা বসানো হবে। খাইবার পাখতুন খাওয়ার চিফ মিনিস্টারের উপদেষ্টা, জিরগা বসানোর মত প্রকাশ করেন এবং অভিযোগ প্রমাণ না হলে উপজাতি নিয়মানুযায়ী গুলালার ঘরবাড়ি ভেঙে উচ্ছেদ করার কথাও বলেন। তারা সবাই পিটিআই-এর লোক।
শত বছরের পুরনো উপজাতি জিরগা বিচারব্যবস্থার স্বরূপ কী, তাও দেখতে হবে। এটা নিষ্ঠুর, যন্ত্রণাদায়ক ও অমানবিক। মুলতানে গত মাসে জিরগা সালিসে এমন রায় দেয়া হয়, ১৪ বছরের এক বালিকাকে ধর্ষণের কারণে ওই বালিকার ভাই ধর্ষকের এক বোনকে বদলা-ধর্ষণ করবে। মামলা-মোকদ্দমা বেড়ে যাওয়া, এর খরচ ও ঝামেলা বৃদ্ধি- এসব সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে পাকিস্তানে উপজাতীয় এলাকাগুলোতে জিরগার মাধ্যমে সালিস-বিচারকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু জিরগা মাঝে মধ্যে যেসব ‘বিচার’ করে, তাতে মানুষ আরো প্তি হয়ে যায়।
পার্লামেন্ট এ বিষয়ে তদন্ত করার জন্য এক বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এক মাসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করার কথা। তখন পিটিআই, এমকিউএম (মোত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট), জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা ১০ মিনিটের জন্য ওয়াকআউট করেন। পিটিআই গুলালাকে এই মর্মে নোটিশ দিয়েছেÑ ‘হয় মা চাও নতুবা ৩১ মিলিয়ন দণ্ড দাও।’ এভাবে ইমরানের দল থেকে নানা রকম ভীতিমূলক আচরণের কারণে গুলালাকে ২৪ ঘণ্টা পাহারার ব্যবস্থা করার জন্য ইসলামাবাদের পুলিশপ্রধানকে সরকার নির্দেশ দিয়েছে। পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি আদালতে বিষয়টির বিচার চেয়েছেন। কোনো কোনো দলের বক্তব্য- আদালতে বিচার হওয়া উচিত। গুলালার অভিযোগ মারাত্মক ও পাশতুন মহিলাদের জন্য বিব্রতকর। এর সুরাহা না হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক গোলযোগ শুরু হতে পারে। এই অভিযোগের বিষয়ে আদালতের সুয়োমটো (আদালতের নিজ থেকেই কার্যক্রম শুরু করা) নোটিশ প্রদান করা উচিত। কেউ কেউ মনে করেন, জাতীয় সংসদ যে কমিটি গঠন করেছে তা আইন অনুযায়ী হয়নি। ফলে বিষয়টি জগাখিচুড়ি হয়ে যাবে। অভিজ্ঞ লোকজন মনে করে, হয়রানি প্রতিরোধ কমিটিতে একজন মহিলাসহ কমপে তিনজন সদস্য থাকতে হবে। বিলওয়াল ভুট্টো বলেন, হয়রানি আইন ২০১ অনুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তি করা উচিত। মহিলাদের জাতীয় কমিশন মনে করে, মহিলাদের সংসদীয় ককাস বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারে।
গুলালাকে নিয়ে নানা গুজব বের হচ্ছে। এখন এসব ঘটনা বা রটনা উত্তপ্ত কড়াইয়ে ঘি ঢেলে দেয়ার মতোই। সংসদ সদস্য জামসেদ দাস্তি দাবি করেন, গুলালাকে খুন করে খুনের দায় পিটিআই ও ইমরান খানের ওপর চাপিয়ে দেয়ার যড়যন্ত্র চলছে। তিনি দুঃখ করে বলেন, ইমরান তার জন্য এত কিছু করেছেন, নারী আসনে সংসদ সদস্য বানিয়েছেন অথচ তিনি ৫০ মিলিয়নের বিনিময়ে ইমরানকে হেস্তনেস্ত করার জন্য ‘বিক্রি হয়ে গেছেন’।
এ ইস্যুতে মিডিয়া ও ফেসবুক গুজব ছড়াচ্ছে। তথ্যমন্ত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেব, সংবিধান ও দেশের বিরুদ্ধে হানিকর কোনো কিছু হলে প্রয়োজনে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করাসহ অপরাধী ও সংগঠনের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধে মামলা করা হবে বলে হুমকি দিয়েছেন।
কারো কারো মতে, আয়শা গুলালা পাকিস্তানে মহিলাদের ‘অধিকারের মশাল জ্বালিয়েছেন’। যা হোক, শরিফের বিষয়ে কৃতিত্ব নেয়ার জন্য যখন পিটিআই প্রস্তুতি নিচ্ছে তখনই গুলালা ঝড় সব কিছু তছনছ করে দিলো। একজন মহিলা অধিকার নেত্রী বলেন, ‘পুরুষদের বিশ্বাস করা যায়, মহিলাদের বিশ্বাস করা যাবে না কেন।’ সিমাল কামরান, পাঞ্জাবের প্রাক্তন আইনমন্ত্রী রাজা বশরতের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী। তিনি রাজার বিরুদ্ধে হয়রানি ও ‘জীবনকে নরকে পরিণত করা’র জন্য বিষোদগার করছেন। কামরান অভিযোগ করেন, তাকে তালাক দিয়ে তার নিজের গাড়ি, অলঙ্কার ও টাকা-পয়সা সব রেখে দিয়েছেন বশরত। তিনি এর বিচার চান। মানবাধিকার নেত্রী সেগুফতা জামানি বলেছেন, গুলালার বিষয়ে সঠিক তদন্ত ও বিচার না হলে পাকিস্তানের মহিলারা ঘর ছেড়ে রাজনীতিতে অধিক হারে অংশগ্রহণ করবে। মহিলা নেত্রী মারভি মেমন বলেন, ‘শপথ করে বলতে পারি, গুলালা সত্য কথা বলছেন।’
এলিজাবেথ ব্রডেরিক জাতিসঙ্ঘের মহিলাবিষয়ক বিশেষ অ্যাডভাইজার ও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক সেক্স ডিসক্রিমিনেশন কমিশনার। তিনি ইকোনমিস্ট পত্রিকার ২০১৫ সালের সেরা ৫০ জন ব্যক্তিত্বের একজন, তিনি মালালার ঘটনায় পাকিস্তান গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানে মহিলাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ অনেক েেত্র যৌনতা ও স্ত্রীবিদ্বেষের সাথে জড়িত। অনেক েেত্র তাদের অবিশ্বাস ও বক্তব্য হেয়প্রতিপন্ন করা হয় এবং তাদের সাথে যথাযথ আচরণ করা হয় না।’ গুলালার এই প্রতিবাদী ঘটনায় উঠে আসছে বিশেষ করে ‘সম্মানবোধের’ বিষয়টি।’ ‘পার্লামেন্টে মহিলারা যেন দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। কেননা তারা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নন।’
গুলালার অভিযোগ করার সাথে সাথে পিটিআই এটাকে ডাহা মিথ্যাচার ও নওয়াজ শরিফের চক্রান্তÑ এসব বলতে থাকে। যেভাবেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, পাকিস্তানে উচ্চপর্যায়ের নারীদের ওপর নির্যাতন, তাদের সাথে খারাপ আচরণের বিষয়টি আর লুকিয়ে রাখার নয়। নারী সংগঠন ও নেত্রীরা এখন অনেক বেশি অগ্রসর। পাকিস্তানে নারীদের প্রতি এহেন আচরণ এটাই প্রথম নয়। এভাবে নাজ বালুচকে নিগ্রহ করা হয়। তিনি বলেন, ইমরান খান বলেছেন, ‘সে একজন অপদার্থ, চলে গেছে ভালো হয়েছে।’ নিজের সহকর্মীদের এরূপ নিন্দাবাদ খুবই অশোভনীয়। রাজনীতির নামে পাকিস্তানে মহিলারা সম্মান হারাবেন কেন? নাজ আরো জানান, বেনজির ভুট্টো ও ফাতেমা জিন্নাহও বিদ্বেষের শিকার হয়েছিলেন।
মিসেস ভুট্টো সবুজ জামা ও সাদা সালোয়ার পরিধান করায় শেখ রাশেদ তাকে ‘সবুজ টিয়াপাখি’ ডেকেছিলেন। মহিলাদের এমনভাবে নিন্দা ও উপহাস করার খতিয়ান লম্বা। নারীবিদ্বেষ ও ‘টেরা চোখে দেখা’ পরিহার করতে হবে; নতুবা ভবিষ্যতের দিনগুলো আরো খারাপ হবে। গুলালা ঝড় নির্বাচনের আগে থামবে কি না সন্দেহ।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ সরকার ও গ্রন্থকার
সুত্র: নয়া দিগন্ত

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button