slider

নাটোরে লবনের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় বিপাকে চামড়া ব্যবসায়ীরা- লোকসানের আশাংকা

নাটোর প্রতিনিধি : ঈদেরদিন থেকে নাটোরের আড়ৎ গুলোতে আসছে লবন যুক্ত কাঁচা চামড়া। আশে পাশের দুএকটি জেলা থেকে থেকে চামড়া আসা শুরু করেছে। তবে নাটোরের চামড়া মোকামে এখন যা আসছে তা লবন দিয়ে সংরক্ষিত চামড়া। এই চামড়ার দাম লবন মুক্ত চামড়ার চেয়ে বেশী। তবে এক সপ্তাহ পর থেকে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লবণযুক্ত চামড়া আসার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সরকার বেধে দেয়া দামে কাঁচা চামড়া কিনে লোকসান গুনছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।

এবার চামড়ার দাম কমলেও লবনের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় চামড়া সংরক্ষণে খরচ বেশী হওয়ায় বিপাকে চামড়া ব্যবসায়ীরা। কোরবানির পশুর চামড়া কিনে লোকসানের শঙ্কায় তারা।ঢাকার ট্যানারী মালিকদের কাছে বকেয়া টাকা না পাওয়ায় নগদ টাকায় চামড়া কিনতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সোমবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, ঈদের দিন থেকেই নাটোর স্টেশন বাজার সংলগ্ন কাঁচা চামড়ার মোকাম হিসেবে খ্যাত চকবৈদ্যনাথ বাজারে কাঁচাচামড়া আসা শুরু করেছে। চামড়ার সংরক্ষণের জন্য লবণজাত করতে ব্যস্ত সময় পার করেন শ্রমিকরা। ইতোমধ্যে রাজশাহী অঞ্চল এবং আশেপাশের জেলা থেকে নাটোর মোকামে আসতে শুরু করেছে লবণযুক্ত কিছু চামড়া। এখানে প্রায় দেড়শতাধিক আড়ত রয়েছে । এসব আড়ৎ মালিকরা সারে ৫শ থেকে ১১শ টাকা পর্যন্ত কম-বেশি কোরবানি পশুর চামড়া ক্রয় করছেন। এছাড়া ছাগল-বকরির চামড়া বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ৩০ টাকায়। আর লবণ যুক্ত চামড়া বিক্রয় হচ্ছে ১শ টাকায়। তবে চামড়া ক্রেতাদের দাম নিয়ে অভিযোগ না থাকরেও বিক্রেতারা বলেছেন, অল্প দামে কেনা-বেচা হয়েছে কোরবারির পশুর চামড়া।

রাজশাহী বাঘা এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী মহিদুল হোসেন বলেন, সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই বেশি দামে কিনেও চামড়া বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব না। সরকারের বেধে দেওয়া দামের উপরে টার্গেট করে পশুর চামড়া কিনতে হচ্ছে। তিনি সর্বচ্চো গরুর চামড়া কিনেছেন ১ হাজার টাকায়। আর সর্বনিু ৫০০ টাকায়। এছাড়া ছাগলের চামড়া কিনেছেন ৩০ টাকায়। আর বকরি চামড়া কিনেছেন ১০ থেকে ১৫ টাকায়।
নাটোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপ ও আড়ৎদাররা জানান, গত দুই মৌসুমে নগদে বেচাকেনা হলেও ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে এখনও বকেয়া প্রায় ৫০-৬০ কোটি টাকা। তারপরও ধারদেনা করে চামড়া কিনতে প্রস্তুত পুঁজিহারানো অনেকেই। তবে শেষ সময়ে চামড়া সংরক্ষণের প্রধান অনুষঙ্গ লবণের অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় বিপাকে ব্যবসায়ীরা। নগদ টাকায় চামড়া বেচাকেনা হওয়ায় পুঁজি সংকটে রয়েছেন নাটোর মোকামের অনেক ব্যবসায়ী। তারপরেও কোরবানী ঈদের সময়েই দেশের মোট ৫০ ভাগ চামড়া ঢাকার ট্যানারী গুলোতে পাঠানো হয়।

নাটোর শহরের চালপট্রি এলাকার মৌসুমি চামড়া শাহ আলম বলেন, ৫ থেকে ৭ বছর আগেও ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা দিয়ে চামড়া কিনে তাঁরা ২ হাজার থেকে আড়াই ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতেন। চামড়ার সেই সুদিন এখন আর নেই। এখন চামড়া কিনতে হয় ভয়েভয়ে, যদি বিক্রি নাকরতে পারি। তারপরে তিনি এবছ ১৩টি গরুর চামড়া কিনে ২শ টাকা কমে বিক্রয় করছেন।

স্থানীয় আড়ৎদার খাইরুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকের মজুরি ও লবণের দাম বেশী হওয়ায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে তাদের চামড়ার দাম অনেক বেশি পড়েছে। চামড়া থেকে লবণের দাম বেশি। ছোট চামড়ায় ৫ কেজি ও বড় চামড়ায় ১০ কেজি লবণ লাগে। লবণের এতো দাম হয়েছে যে চামড়া বাঁচানো দায় হয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ী মুঞ্জুর-উল আলম হিরু বলেন, লবণের দাম বেশি হওয়ার কারণে এবছর ক্ষতির আশঙ্কা করছি। গতবছর দরছিল ৭০০-৭৫০, এবার চলছে ১২০০-১২৫০ টাকা।

ব্যবসায়িরা জানান,লবণের বাড়তি দামে চামড়া সংরক্ষণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। খরচ বেড়ে যাওয়ায় চামড়া নষ্টের আশঙ্কা তাদের। তবে ভারতে চামড়ার দাম বেশি হওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে পাচারের শঙ্কা।
সরজমিনে নাটোর শহরের চকবৈদ্যনাথ এলাকায় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার বাজারের শতাধিক আড়তে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কিনছেন ব্যবসায়ীরা। নাটোর থেকে বছরের মোট চাহিদার ৫০ শতাংশ চামড়া সংগ্রহ হয় কোরবানির ঈদে। এরমধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ জোগান দেয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নাটোরের চকবৈদ্যনাথের চামড়া মোকাম। এবছর লবণমুক্ত গরুর চামড়া প্রকার ভেদে ৮শ’ টাকা থেকে ৯শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর খাসির চামড়া বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ২০ টাকায়। লবণদিয়ে সংরক্ষণের পরে ছাগলের চামড়ার পিছনে যে খরচ হচ্ছে তাবিক্রি করে উঠানো সম্ভব না ।

মৌসুমি ব্যবসায়ী শফিক আহমেদ বলেন,তিনি ঈদে ৫’শ থেকে ৬’শ টাকায় গরুর চামড়া কিনেছেন। আড়তে বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ৮০০টাকা দরে। আর ছাগলেচামড়া কিনেছেন গড়ে ৩০/৪০ টাকা। বিক্রি দাম দিচ্ছে ২০টাকা। গাড়ি ভাড়াদিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

চামড়া ব্যবসায়ী আল আমিন খাসীর চামড়ার দাম হওয়ার পিছনে কারণ হিসেবে বলেন, এক পিস খাসীর চামড়া লবন দিয়ে সংরক্ষন করতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা লবন খরচ হয়। সাথে রয়েছে লেবার খরচ। সুতরাং খাসীর চামড়া বেশী দামে কেনার সুযোগ নেই। কারণ,ব্যবসায়িদের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।

নাটোরের আড়তদাররা বলেন, ট্যানারি মালিকরা লবণযুক্ত বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে ৪০ টাকা। বকরির চামড়ায় লবণ দিতে খরচ পড়ছে ৪৫ টাকা। ফলে তারা বকরির চামড়া কিনছেন না। আর গরুর চামড়া সরকার নির্ধারিত দামেই কিনছেন বলে দাবি তাদের। চামড়া ব্যবসায়ি আব্দুল হালিম সিদ্দকী জানান, নাটোর জেলায়প্রতি মৌসুমে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজন হয় অন্তত ৫০০ টন লবণ, কিন্তু ট্যানারী মালিকদের কাছে বকেয়া টাকার পাশাপাশি লবণের দাম বৃদ্ধি বিপাকে পড়েছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।

তিনি বলেন, গত কোরবানির ঈদে আমরা প্রতি বস্তা লবণ কিনেছি ৭০০-৭৫০ টাকায়। কিন্তু এবার ঈদের আগে সিন্ডিকেট করে লবণের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রতি বস্তা লবণ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকায়। এতে চামড়া লবণ জাতকরতে বাড়তিখরচ গুনতে হচ্ছে। খরচ বেড়ে যাওয়ায় চামড়া নষ্টের আশঙ্কা তাদের। তবে ভারতে চামড়ার দাম বেশি হওয়ার কারণে তৈরি হয়েছে পাচারের শঙ্কা।
নাটোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ীগ্রুপের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখা হবে ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি জন্য। আর গত ২ বছর ট্যানারি মালিকরা নাটোর থেকে নগদ টাকায় চামড়া কেনায় চলতি বছর ৮ লাখ পিসগরু ও ১০ লাখ পিস ছাগলের চামড়া নাটোরে সরবরাহ হবে জানান তিনি।

নাটোর জেলা চামড়াব্যবসায়ীগ্রুপ এর চেয়ারম্যান মকসেদ আলী, এবার আশা করছি, ৫ থেকে ৬ লাখ গরুর চামড়া এবং ৮-১০ লাখ ছাগলের চামড়া আমদানি হবে। চামড়া পাচাররোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত সহকঠোর নজরদারি করবেপ্রশাসন।

নাটোর জেলাপ্রশাসক আবু নাছের ভুইয়া বলেন, “চামড়া পাচারের বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখা হবে। মোবাইল কোর্ট থেকে শুরু করে সকল ধরনের পুলিশী টহল থাকবে”।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button