
কমরেড অমল সেন ট্রাস্ট গঠন :
কমরেড অমল সেনের মৃত্যুর পর কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিকের সাথে আমার আলোচনা হলো কিভাবে কমরেড অমল সেন স্মৃতি ট্রাস্ট গঠন করা যায়। স্মৃতি ট্রাস্ট গঠন করতে গেলে সহায় সম্পত্তি জরুরী। এই সময় তৎকালীন ওয়ার্কার্স পার্টির মহানগর কমিটির নেতা কমরেড আবু তাহের বকুলের মাধ্যমে কমরেড মানিক খবর পেলেন সাভারে কিছু জমি কেনা যায়। সেই অনুযায়ী কমরেড মানিক ও আমি সাভারে জমি কেনার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেননের সাথে আলোচনা করলাম। তিনি বললেন, এই মূহুর্তে এত টাকা কোত্থেকে পাওয়া যাবে? তখন তাঁকে বলেছিলাম, মানিক ভাই ও আমি টাকা ধার করবো আপনি আপনার সাধ্যানুসারে টাকা দিবেন। কমরেড মানিক ও আমার আলোচনা ছিল জমি কিনতে পারলে ওখানে বিল্ডিং নির্মাণ করে পার্টি কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্র্ণ কাজে ব্যবহার করা যাবে।
ট্রাস্টের ধারণাটি উকিলের মাধ্যমে জেনেছিলাম ট্রাস্ট প্রোপার্টি বিক্রি করাও যাবে না হস্তান্তর করাও যাবে না (ঘড়ঃ ংবষষধনষব হড়ঃ ঃৎধহংভবৎধনষব)। সাভারে জমি কিনতে যাওয়ার ব্যাপারে কমরেড মানিক আবু তাহের বকুলের সাথে দিন-সময় ঠিক করে আমাকে জানালো।
ঐসময়কার ওয়ার্কার্স পার্টির মহানগর কমিটির নেতা কমরেড আবু তাহের বকুল (এখন সিপিবি নেতা) ও ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা আব্দুল খালেকের সাভারে জমি কেনা ছিল। তাদের মাধ্যমেই মালিককে যোগাযোগ করে ওখানে জমি কেনার সুযোগ ছিল। কমরেড মানিকের নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে জমি কিনতে যাওয়ার উদ্যোগ নেই। একথা জানার পর আমার স্ত্রী কমরেড গৌরী বালা রায় (২০১৪ সাল পর্যন্ত ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য ছিলেন) সাভারে আমাদের সাথে জমি কিনতে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। পার্টি অফিসে তৎকালীন পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসাবে আমি যে রুমে বসতাম সেই রুমে গিয়ে বসলাম। আমি কমরেড মানিক ও কমরেড গৌরী বালা রায় বসে আছি সেই সময়ে মেনন ভাই গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কোথায় যাবেন? তাঁকে বললাম, জমি কিনতে সাভার যাবো। তিনি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করলেন আমরা জমি কিনতে যাচ্ছি। তখন তিনি আমাদের বললেন, আমাকে কিছু সময় দিন আপনাদের কিছু টাকা দিতে পারি কিনা সেই চেষ্টা করি।
ওয়ার্কার্স পার্টি অফিস থেকে বেরিয়েই তোপখানা রোডে উঠতেই ডানে ছিল মেনন ভাইয়ের ছোটভাই ব্যবসায়ী ও মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল্লাহ খান বাদলের অফিস। মেনন ভাই ওই অফিসে গিয়ে শহীদুল্লাহ খান বাদলের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়ে আমাদেরকে দিলেন। জমির বায়না যখন করি তখন ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা (আমার ধার করা) এবং মেনন ভাইয়ের ২০ হাজার টাকা জমির বায়না করতে দিয়েছিলাম। পরবর্তীতে কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক তৎকালীন দিনাজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন লাবু, মীর্জা ও মানিক ভাই মিলে ৭৬ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে রেজিস্ট্রি থেকে শুরু করে খাজনা ও অন্যান্য টাকা দিয়েছিলেন কমরেড রাশেদ খান মেনন। যশোর নড়াইলের এগারোখানে অমল সেন স্মৃতি ট্রাস্টের নামে জমি কেনার টাকা দিয়েছিলেন প্রয়াত কমরেড মাহমুদুর রহমান লাভলু, কমরেড এমরান ও একজন শুভানুধ্যায়ী যার নাম মনে নাই-পূর্বে আমার সাথে পরিচয় ছিল না। মাহমুদুর রহমান লাবু, কমরেড এনামুল হক এমরান ও আমি জমি কিনতে এগারোখানে গিয়েছিলাম। অমল সেনের স্মৃতি ট্রাস্ট ও হাসপাতাল নির্মাণের কথা শুনে ডা. সুকান্ত মজুমদার, ব্যাংকার ঘনজ মজুমদার তাঁদের জেঠার তেভাগা আন্দোলনের সংগঠক বনচারী মজুমদারের জমি স্মৃতি ট্রাস্টে দিতে চেয়েছিলেন। শিক্ষক খগেন বিশ্বাসকে বলেছিলাম আমরা এখানে হাসপাতাল করবো। হাসপাতালের জন্য অমল সেন স্মৃতি ট্রাস্টের নামে আমরা তোমার জমিটা কিনতে চাই। খগেন বিশ্বাস আমাদের কথায় সাড়া দিয়ে স্মৃতি ট্রাস্টের কাছে তাঁর জমি বিক্রি করে দেন। স্মৃতি ট্রাস্টের জমি রেজিস্ট্রির দিনে আমি ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। রেজিস্ট্রির দিনে সাথে ছিলেন কমরেড ইকবাল কবির জাহিদ ও কমরেড বিপুল বিশ্বাসসহ কয়েকজন। স্মৃতি ট্রাস্টের গঠনতন্ত্র প্রণয়নে সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী অ্যাডভোকেট প্রবীর নিয়োগী ড্রাফট তৈরি করে দিয়েছিলেন। এসব পলিটব্যুরোতে আলোচনার পর প্রথমপর্যায়ে ৫জনকে নিয়ে স্মৃতি ট্রাস্ট কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। গঠনতন্ত্রে ৩১জন পর্যন্ত স্মৃতি ট্রাস্টের সদস্য করার বিধান ছিল। প্রথমদিকে যারা স্মৃতি ট্রাস্টের সদস্য ছিলেন- পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন যিনি স্মৃতি ট্রাস্টেরও সভাপতি হলেন। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এনামুল হক এমরান তিনি ঐ ট্রাস্টের সদস্য সচিব নির্বাচিত হলেন মাহমুদুল হাসান মানিক, ড. আবুল বারাকাত ও আমাকে নিয়ে স্মৃতি ট্রাস্ট কমিটি গঠিত হয়। পার্টির সভাপতি ও অন্যান্যরা যখন এমপি নির্বাচিত হলেন এমনকি পার্টির সভাপতি যখন মন্ত্রী হলেন তখনও এগারোখানে স্মৃতি ট্রাস্টের জমিতে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য পলিটব্যুরোর সভায় যতবার বলেছি ততবারই একধরনের নির্লিপ্ততা লক্ষ্য করেছি। এটা কোন মহৎ উদ্দেশ্যে স্মৃতি ট্রাস্টের জমিতে ঐসময়কালে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হলো না তা আমার কাছে একেবারেই বোধগম্য নয়। কিন্তু আমি বুঝি ঐসময় উদ্যোগ নিলে হাসপাতাল তৈরি করা সম্ভব ছিল। বাঘারপাড়া উপজেলা সদর থেকে ও নড়াইল জেলা সদর থেকে বিবেচনা করলে এগারোখানকে একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল হিসেবে দেখাটাই যুক্তিযুক্ত। এগারোখান অঞ্চলের গ্রামগুলি হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল হলেও পাশে আফরা, শেখহাটি, ভিটেবল্লা, ভাঙ্গুড়া, অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠীও হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হলে উপকৃত হতেন এব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। জমি ক্রয় করার সময় যাদেরকে হাসপাতাল তৈরি করার প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলাম তাদের কাছে ও ঐ অঞ্চলের জনগণের কাছে আমার ক্ষমা চাওয়া ছাড়া অন্যকোনো পথ খোলা ছিল না। ওয়ার্কার্স পার্টি এককভাবে কিছু করার জন্য আমাকে কখনোই কোনো সুযোগ দেয়নি।
আমি ও আমার স্ত্রী দীর্ঘদিন গুরুতর অসুস্থ ছিলাম ও এখনো আছি। তাই ২০১৯ সাল থেকেই আমি সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের পথে এগিয়ে যাই। ২০২০ সালের ২২শে জানুয়ারি একমাত্র পুত্র সৃজন বিশ্বাস সৌভিকের মৃত্যু আমাকে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেয়। তাছাড়া আমি তো মনেই করি ৭০ বছর বয়সের উর্ধ্বে কারোরই কমিউনিস্ট পার্টিতে কোনো নেতৃস্থানীয় পদে থাকা উচিত নয়। আমি ওয়ার্কার্স পার্টিকে যখন প্রত্যাহার পত্র দিয়েছিলাম তখন বলেছিলাম শারীরিক, আর্থিক ভাবে বিপর্যস্ত বয়স্ক মানুষ হিসাবে আমার পক্ষে সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা সম্ভব নয়।
সারাজীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষা ও আমার সীমাবদ্ধ জ্ঞান নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের জন্য বই লিখে যেতে চাই। সম্ভব হলে গোবরা অঞ্চলে মার্কসবাদী আদর্শের হাতেগোনা কয়েকজনকেও যদি রেখে যেতে পারি সেটাই হবে আমার জীবনের শেষ প্রচেষ্টা ও লক্ষ্য।
২০১৬ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি আমার ‘উজান স্রোতের যাত্রী’ বইটি যখন প্রথম প্রকাশ হয়েছিল তখনই বইয়ের ভূমিকায় লিখেছিলাম সেই অর্থে আমার বই পর্যালোচনামূলক লেখা নয়। যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, কমিউনিস্ট আন্দোলন, ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের কোনো কাজে লাগে সেজন্যেই আমার লেখার প্রচেষ্টা। যতদূর সম্ভব নির্মোহ ও পক্ষপাতহীন ভাবে লেখার চেষ্টা করেছি তারপরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমার নিজস্ব মতামতের প্রতিফলন থাকাকে স্বাভাবিক মনে করেছি। কাউকে হেয় করা, ছোট করা কিংবা বড় করার জন্য এসব লেখা লিখছি না। ৯০এর দশকের শেষ ভাগে লেখা আমার ‘বিবিধ ভাবনা’ ২০০৩ সালের পর লেখা ‘কমরেড অমল সেনের আত্মজীবনী’ ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লেখা ‘উজান স্রোতের যাত্রী’ ২০১৮ সালে ‘কমরেড সত্যমৈত্রের আত্মজীবনী’ ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ‘গোবরা অঞ্চল, পার্বতী বিদ্যাপীঠ ও কলেজ জীবন’ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ‘যা দেখেছি যা করেছি’ প্রথম খÐ, প্রকাশিত হয়েছে। ‘যা দেখেছি যা করেছি’ দ্বিতীয় খÐ ও ‘কমরেড অমল সেন, তেভাগার লড়াই ও কমিউনিস্ট আন্দোলন বই দুটি দ্রæত প্রকাশিত হবে। প্রসঙ্গক্রমে নিজের কথা কিছু বলতে গেলে একথাই বলবো বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগ, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিতে সবমিলিয়ে ১৭ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি। কোনো পার্টির সাধারণ সম্পাদক হতে নিজেকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করতে যাইনি। ১৭ বছরের সীমাবদ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে পার্টির প্রস্তাবে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে খুব বুদ্ধিমানের কাজ করেছি তাও মনে হয় না। আমার সক্রিয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের জীবন ৬১ বছরের উর্ধ্বে। কী হলাম কী পেলাম জীবনেও ভাবিনি এখনো ভাবি না। ভেবেছিলাম যত প্রতিকূলতা যত কঠিন যত বন্ধুর পথই হউক নিজেকে সমাজ বিপ্লবের কাজেই সমর্পিত করে যাবো। আজ যারা মনে করেন আমি সক্রিয় কোনো দলের সাথে যুক্ত নেই বলে কমিউনিস্ট আন্দোলনে ও রাজনীতিতে আমার করার আর কিছু নেই তাদের উদ্দেশ্যে বিনয়ের সাথে একটি কথাই বলবো সমাজ বিপ্লবের বিশাল আয়োজনে সদিচ্ছা থাকলে প্রতিটি মানুষেরই কিছু করার থাকে। কিছু অবদান রাখতে পারেন । তাই বলতে চাই আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কমিউনিস্ট আন্দোলন ও সমাজ বিপ্লবের কাজে সামান্যতম অবদান রাখার শেষ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো।
চলবে/




