sliderকৃষকশিরোনাম

কমরেড আবদুস সাত্তার খানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা

বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ, গণবুদ্ধিজীবী, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, প্রখ্যাত কৃষক নেতা কমরেড আব্দুস সাত্তার খানের ৭ নভেম্বর ২৬তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে ৮ নভেম্বর ২০২২ইং তারিখ রোজ শুক্রবার বিকাল ৩ টায়, ২২/১, তোপখানা রোডস্থ বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন, বাংলাদেশ কিষাণী সভা, বাংলাদেশ ভূমিহীন সমিতি ও বাংলাদেশ আদিবাসী সমিতির আয়োজনে কৃষি, কৃষক, ভূমি,খাদ্য সার্বভৌমত্ব ও জলবায়ু পরিবর্তন শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সভায় বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি কমরেড বদরুল আলমের সভাপতিত্বে ও বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন এর সাধারণ সম্পাদক এএএম ফয়েজ হোসেন এর পরিচালনা এবং বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জায়েদ ইকবাল খান এর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় সম্মানীয় অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন ভারতের পশ্চিম বঙ্গের কলকাতার প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী লেখক কমরেড অমিতাভ চক্রবর্তী,ঐক্য ন্যাপে কেন্দ্রীয় নেতা ও বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা হারুন অর রশিদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য ও ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি কমরেড আবুল হোসেন, জাতীয় কৃষক জোটের যুগ্ম সম্পাদক কামরুজ্জামান ফসি, জনরাস্ট্র আন্দোলনের সদস্য সচিব সাবেক ছাত্রনেতা কামাল হোসেন বাদল, জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন এর সভাপতি বাহারানে সুলতান বাহার, রেডিমেড গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভানেত্রী লাভলী ইয়াসমিন, ‘৯০ এর সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতা রাজু আহমেদ ও সাবেক ছাত্রনেতা মহিউদ্দিন লাভলু, দশমিনা উপজেলা কল্যাণ সমিতির সভাপতি নওশাদ মাহমুদ অনু, বিশিষ্ট সমাজকর্মী খলিলুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল রানা, নারীনেত্রী রেহেনা বেগম, আশামণি, হোসনে আরা বেগম, নাহার পারভীন রুনু, কৃষক নেতা শাহাবুদ্দীন মাতুব্বর, হানিফ আকন প্রমুখ।
আলোচনা সভায় নেতৃবৃন্দ বলেন, কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে কৃষির গুরুত্ব আমাদের কাছে অপরিসীম। কৃষিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। করোনাকালীন সময় হতে কৃষি উৎপাদন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কৃষিকে অবহেলা করার সু্যোগ নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য; বিগত দশকের পর দশক আমাদের কৃষি ও কৃষককে নানাভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। জাতীয় বাজেটে কৃষি ও কৃষকের জন্য বরাদ্দ থাকে সব সময় ক্ষীণ। কৃষক কঠিন শ্রম দিয়ে অধিক উৎপাদন করে মানুষের চাহিদা মিটালেও সে কিন্তু নিজে লাভবান হচ্ছে না। তার পণ্য মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কম দামে কিনে বেশী দামে বিক্রি করে কৃষককে বঞ্চিত করে। ফলে কৃষক তার পুনঃউৎপাদনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে কৃষি ক্ষেত্র হতে উচ্ছেদের শিকার হয়। ক্ষেত্র বিশেষে ভুমিহীনে পরিণত হয়।
তারা বলেন, বর্তমান বিশ্বে কৃষকের কৃষির গুরত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কৃষকের কৃষি তথা ক্ষুদ্র কৃষক জলবায়ু পরিবর্তনে কোন ভূমিকা রাখে না। বরং পরিবেশ ও প্রতিবেশ বা সামগ্রিকভাবে পৃথিবীকে শীতল করে। কৃষিকে আরও বেশি টেকসই করে তোলার জন্য এগ্রোইকোলজিক্যাল চাষাবাদের ধরন প্রবর্তন করতে হবে। যার কেন্দ্রে থাকবে কৃষক। কমরেড আবদুস সাত্তার খান রাসায়নিক সার ও কীটনাশক নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার বিরোধীতা করে পরিবেশ ও প্রতিবেশ বান্ধব তথা এগ্রোইকোলজিক্যাল চাষাবাদের সপক্ষে কথা বলতেন।
নেতৃবৃন্দ বলেন, কৃষির সাথে ভুমির ওতপ্রোত সম্পর্ক। ভুমি কৃষির নিশ্চয়তা দেয়। বস্তুতঃ ভুমিই হচ্ছে মানুষের জীবন- জীবীকার প্রাথমিক উৎস। তাই বিশ্বব্যাপী নানা উপায়ে ভুমি দখল করার পাঁয়তারা চলছে। জলাভুমি দখলও ভুমি দখলের নামান্তর। এ দখলদারিত্বে বহুজাতিক কৃষি ব্যবসায়ী কর্পোরেশন এগিয়ে আছে। কৃষক হিসাবে পরিচয় লাভে ভুমির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ভুমিবিহীন কৃষক কোন অর্থ বহন করে না। তাই কৃষকের ভুমি অকৃষি কাজে ব্যবহার অনুচিত কাজ। বাংলাদেশে কৃষিজমির পরিমাণ প্রতিবছর ১% করে কমে যাচ্ছে। এটা আশংকাজনক। ভুমির গুরত্ব অনুধাবন করতে কমরেড সাত্তার খানের ভুল হয় নি। তিনি গত শতাব্দীর আশির দশকেই খাসজমির উপর ভুমিহীন কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেন। সে আন্দোলনের সুফল এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভূমিহীনরা পাচ্ছে।
তারা আরো বলেন, সাম্রাজ্যবাদী নয়া উদারনৈতিক অর্থনৈতিক নীতির কারনে পৃথিবীর দেশে দেশে কৃষি ও কৃষককে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর থেকে বাঁচার জন্য দুনিয়ার কৃষক সমাজ খাদ্যসার্বভৌমত্বের দাবী তুলেছে। খাদ্য সার্বভৌমত্ব হচ্ছে কৃষককে ভুমির অধিকার সুরক্ষা। ভুমিতে তার পছন্দ মত ফসল ফলানোর অধিকার। কৃষকের এ অধিকার সুরক্ষিত হলে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবে নিশ্চিত হবে। খাদ্যসার্বভৌমত্ব খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলেও খাদ্য নিরাপত্তা খাদ্যসার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা দেয় না। কাজেই খাদ্যসার্বভৌমত্বই দিতে পারে কৃষক সমাজকে অস্তিত্বের সংকট থেকে মুক্তি। খাদ্যসার্বভৌমত্ব নীতি ও কৌশলের সমন্বয়ে একটি বৈশ্বিক আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। যেহেতু খাদ্যসার্বভৌমত্বের মূল কথাই হচ্ছে ভুমির উপর কৃষকের অধিকার বা স্বত্ব সেহেতু ভুমি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভুমির অধিকার প্রতিষ্ঠা যুক্তিযুক্ত। কমরেড সাত্তার খান ভুমি আন্দোলনে পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে মূলতঃ খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার কাজটিই করেছিলেন।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেশের প্রভূত ক্ষতি সাধন করেছে। জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বিপুল। কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে উল্লেখযোগ্যরূপে। ঋতু চক্রে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। সবচে’ ভয়ংকর ঘটনা হচ্ছে; আমাদের দক্ষিণের উপকূল অঞ্চলে প্রতিবছর অন্ততঃ একবার সুপার সাইক্লোন আঘাত হানছে। এর ফলে উপকূলের চরাঞ্চলে আমদের ভুমিহীন বসতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুতারং কৃষি ও কৃষকের জীবন-জীবীকার প্রেক্ষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব খাদ্যসার্বভৌমত্বকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। কমরেড আবদুস সাত্তার খান বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়কে মনুষ্য সৃষ্ট বলে মনে করতেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button