
পতাকা রিপোর্ট : বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও ঝিনাইদহ-২ আসনের সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মসিউর রহমান (৭৮) আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মঙ্গলবার (১ নভেম্বর) বেলা ১২টায় ঝিনাইদহের নিজ বাসায় পরিবারের সদস্যরা রুমের দরজা খুলে দেখতে পান তিনি বিছানায় অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন। হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, স্ট্রোকজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।
মসিউর রহমান বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন।
১৯৭৯ সালে বিএনপির মনোনয়নে ঝিনাইদহ-২ থেকে সংসদ নির্বাচন করে পরাজিত হন। তবে ১৯৯১, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, জুন ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে একই আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সাবেক এই এমপি’র মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় ঝিনাইদহ শহর। লাশ দেখতে দল-মত নির্বিশেষে মানুষ ছুটতে থাকেন ক্যাসেল ব্রিজ সংলগ্ন নবগঙ্গা নদীর পাড়ের তার বাড়িতে।
এ সময় পুলিশ ও দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়।
গাড়িচালক নাজমুল হাসান বাঁধন জানান, মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে মসিউর রহমান তার অসুস্থতার কথা জানিয়ে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন। তিনি সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঝিনাইদহ শহরের গীতাঞ্জলী সড়কের বাসায় এসে ডাকাডাকি করতে থাকেন। সাড়ে ১১টার দিকে মশিউর রহমানের ছোট ভাই আসাদুজ্জামান, প্রতিবেশী ও পৌর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শেখর, পাপপু শাহ ও ম্যানেজার বকুল হোসেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ঘরের দরজা ভেঙে দেখেন সোফার ওপর পড়ে আছে মশিউর রহমানের নিথর দেহ। তাৎক্ষণিকভাবে তারা ঝিনাইদহ সদর হাসপাতলে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক জানান, অনেক আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
মশিউর রহমান ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের কন্যাদহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ৭ম শ্রেণিতে পড়াকালীন তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। যোগ দেন আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ভারতের বিহার রাজ্যের চাকুলিয়া থেকে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠা করা বিএনপিতে যোগদান করেন। ১৯৭৭ সালে অল্প বয়সে তিনি হরিণাকুণ্ডুর চাঁদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত পরপর তিনবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন। ১৯৮৭ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে জড়িত থাকায় ৭ মাস কারাভোগ করেন। ১৯৭৯ সালে বিএনপি’র মনোনয়নে জাতীয় সংসদ সদস্য পদে লড়াই করে পরাজিত হন। সারা দেশে বিএনপি’র তিনশ’ আসনের প্রার্থীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। পরবর্তীতে মশিউর রহমান ১৯৯১, ১৯৯৬, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে ঝিনাইদহ-২ আসন থেকে বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে টানা চারবার এমপি নির্বাচিত হন। এমপি থাকাকালীন তিনি বিরোধীদলীয় হুইপ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কমিটি ও কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির দায়িত্ব পালন করেন। মশিউর রহমান ১৯৭০ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে গ্রেপ্তান হন এবং কয়েক মাস কারাবরণ করেন।
ঝিনাইদহের গণমানুষের এই নেতা ১৯৭১ সালে ৮নং সেক্টরে হরিণাকুণ্ডু থানা কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ঝিনাইদহ, হরিণাকুন্ডু, শৈলকুপা, কুষ্টিয়া ও আলমডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অস্ত্র জমা দেয়ার জন্য ঝিনাইদহ আনসার ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন ও সরকারিভাবে মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করেন। তিনি ওই ক্যাম্পের কমান্ডার নিযুক্ত হন। স্বাধীনতা পরবর্তী ঝিনাইদহে মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ করে তিনি জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গঠন করেন।
মসিউর রহমান বিএনপি’র ঝিনাইদহ জেলা সভাপতি, খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকসহ সর্বশেষ বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সংসদে তিনি বিরোধীদলীয় হুইপ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
জানা যায়, ২০০৮ সালের ১৪ই ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন মামলায় ২০১৭ সালের অক্টোবরে যশোরের বিশেষ জজ আদালত তাকে ১০ বছরের কারাদ-, জরিমানা ও তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রায় দেন। পরবর্তীতে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। মসিউর রহমানের স্ত্রী মাহবুবা রহমান শিখা পেশায় একজন আয়কর আইনজীবী। এই দম্পতির শামীম রহমান শিমু, ডা. ইব্রাহীম রহমান, শোয়াইব রহমান বাপ্পী নামে তিন সন্তান রয়েছে। এদিকে, মশিউর রহমানের মৃত্যুর খবর পেয়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও তার রণাঙ্গনের বন্ধু মো. আবদুল হাই ও সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মকবুল হোসেন তার বাড়িতে ছুটে যান। হাজারো দলীয় নেতাকর্মী ও শুভান্যুধায়ী এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা মশিউর রহমানের মৃতদেহ এক নজর দেখতে তার ভিড় জমান।
বুধবার সকাল ১১টায় ঝিনাইদহ গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুল মাঠে মরহুমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে হরিণাকুণ্ডু উপজেলার নিজ গ্রাম কন্যাদহের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
সংসদ সদস্য থাকাকালে তিনি বিরোধী দলীয় হুইপসহ সংসদীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় কমিটি, কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।



