slider

বাদাম চাষে স্বপ্ন বুনছে চরাঞ্চলের কৃষকরা

আব্দুর রহমান রাসেল,রংপুর ব্যুরোঃ বাদাম বাদাম- কাঁচা বাদাম’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া গানের মূল উপজীব্য ‘বাদাম’ চাষ করে আগামির স্বপ্ন বুনছে রংপুরের পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলার চরাঞ্চলের কৃষকরা।
জেলার ছাওলা ইউনিয়নের গাবুড়া,রহমতের চর, আরাজি হরিশ্বর, গুপিডাঙ্গা, প্রাননাথ চর, নাজিরদহ চর, পল্লীমারী চর, গদাইর চর, চর গনাই, হরিচরন শর্মা , ঢুসমারা চর, টাপুরচর, হয়রৎখাঁ, বিশ্বনাথসহ তিস্তা নদী বেষ্টিত গ্রামসহ চরগুলো ঘুরে দেখা গেছে দিগন্ত জুড়ে বাদাম আর বাদাম ক্ষেত। যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজের সমারহ।
উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল জুড়ে এবার প্রচুর বাদাম চাষ হয়েছে। তিস্তার বুকে জেগে ওঠা ধু ধু বালুচরেও এখন সবুজের সমারোহ । দিগন্তব্যাপী বাদামের সবুজপাতা হলুদ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে কৃষকরা। কেউ কেউ আগাম বাদাম তুলে রোদে শুকাচ্ছেন। চাষাবাদ সহজ, বিপণনে ঝামেলাহীন ও তুলনামূলকভাবে অধিক লাভ হওয়ায় কৃষকরা কাঁচা বাদামের নাম দিয়েছেন ‘গুপ্তধন’। বাদাম গাছ প্রায় পরিপক্ক হওয়ায় তিস্তা চরে বালির নিচে হাত বাড়ালেই উঠে আসছে মুঠো মুঠো গুপ্তধন। প্রতিটি বাদাম গাছের মুঠি(উপরের অংশ) ধরে টান দিলেও উঠে আসছে থোকা থোকা সোনালী রঙের চিনা বাদাম তথা বালির নিচে লুকিয়ে থাকা গুপ্তধন।

বর্ষার প্রমত্ত্বা তিস্তা আগ্রাসী হয়ে যেমন গিলে খায় বসতি তেমনই শুকনো মৌসুমে ফিরিয়ে দিচ্ছে কিষাণ-কিষাণীর স্বপ্ন- এ যেন সাক্ষাত দ্বি-চারিনী। তিস্তার ভাঙাগড়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা মানুষগুলো চরাঞ্চলে বাদাম চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। চলতি মৌসুমে বাদামের ফলন অনেকটা ভালো ও বাজারে দাম বেশি পাওয়ায় আশা কৃষকের।
কাউনিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৫৫০হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ চলমান । এরমধ্যে তিস্তার চরাঞ্চলে টরংপুরের কাউনিয়া উপজেলাতেই ৫৫০ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ করা হয়েছে।যার ধারাবাহিকতা এখনো চলমান বলে জানায় কৃষ বিভাগ। বেলে, দো-আঁশ ও এঁটেল দো-আঁশ মাটিতে তেল জাতীয় ফসল বাদামের ভালো ফলন পাওয়া যায়। তাই তিস্তার তীর ঘেষা ইউনিয়নগুলোতে সবচেয়ে বেশি চিনা বাদাম চাষ হয়েছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগের মতে, চরাঞ্চলে বেশির ভাগ বারি চিনাবাদাম-৭ ও ৮ এর চাষ হয়। এছাড়া বিনা-৪ ও বিজি-২ এর ফলনও ভালো হয়ে থাকে। সূত্রমতে, বীজ বপনের ১২০ থেকে ১৫০ দিনের মধ্যে চিনাবাদাম পরিপক্ক হয়। রবি মৌসুমের শুরুতে বপন করা চিনাবাদাম এখন ঘরে তোলার মৌসুম। এখন বাদামের সবুজপাতা হলদেটে রঙ ধারণ করছে। আগাম চাষ করা চিনাবাদাম এখনই তোলার উপযুক্ত সময়।
ছাওলা ইউনিয়নের গাবুরা চরের হইবর মিয়া বলেন, বাদামের ফলন ভালো হওয়ায় আমরা খুশি।
বিশ্বনাথ চরের বাদাম চাষি নুর মোহাম্মদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আলু তুলে চলতি মৌসুমে সে ২ দোন (২৫ শতকের দোন) জমিতে উপজেলা কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় ও পরামর্শে বাদাম চাষ করেছে। চিলমারী হাট থেকে দেশি বীজ এবং উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বিনা-৪ জাতের বীজ নিয়ে রোপন করেছে সে। ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত ২ দোন জমিতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৫ হাজার টাকা। সে আশা করছে প্রায় ৮ থেকে ১০ মণ বাদাম হবে। বর্তমানে বাদাম ২ হাজার থেকে ২২শ’ টাকা মণ দরে বিক্রয় হচ্ছে। সকল খরচ বাদ দিয়ে নুর মোহাম্মদ এ মৌসুমে বাদামে প্রায় ১৫ হাজার টাকা মতো লাভের আশা করছে।
আজ শুক্রবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কোথাও বাদাম তোলা হচ্ছে। আবার কোথাও বাদামের চারা পরিপক্ক হয়েছে- তোলার অপেক্ষায় রয়েছে। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চরাঞ্চলের কৃষকরা বাদাম তুলছেন। পরিবারের নারী ও শিশুরাও এ কাজে সহযোগিতা করছে। বাদাম চাষিরা জানায়, বাদাম রোপণের পর অন্য ফসলের ন্যায় পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়না। বীজ বপন ও বাদাম উঠানোর শ্রমিক খরচ ছাড়া তেমন কোনো খরচ নেই বললেই চলে।
কাউনিয়া ৫নং বালাপাড়া ইউনিয়নের চেয়াম্যান মোঃ আনছার আলী ও মধুপুর ইপি চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম জানান, ইউনিয়ন দুটি পুরোপুরি তিস্তা নদীতীরে। ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা নদীগর্ভে। কিছু কিছু জায়গায় চর জেগে উঠায় নদী পাড়ের মানুষগুলো বাদাম চাষ করছে। চাষিদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হলে তারা বাদাম চাষে আরও বেশি আগ্রহী হবে।
পীরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল আলম বলেন, চলতি বছর ১৩০ হেক্টর জমিতে অল্প সময়ে সল্প খরচে বাদামের চাষ-আবাদ হচ্ছে। এবারের অর্জন ৯৫। তবে চরাঞ্চলের জমি গুলোতে বাদামের চাষ-আবাদ করার জন্য আমরা প্রণোদনা দিয়েছি। গত বছরের তুলনায় এ বছর উচ্চমানের বিনা ৪- ঢাকা ৮ বাদাম চাষ আবাদ করায় ফলন ভালো হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। এবার কৃষকরা সঠিক সময়ে বাজার জাত করতে পারবে।
এদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছাঃ শাহনাজ পারভীন জানান, চলতি বছর ৫৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে। কাউনিয়ায় বাদাম চাষের বড় অংশ তিস্তার চরাঞ্চল। কৃষকরা বাদাম চাষে লাভবান হওয়ায় প্রতিবছর বাদাম চাষের পরিমাণ বাড়ছে। কৃষি বিভাগ বাদাম চাষিদের প্রতিবছর বিনামূল্যে বীজ দিয়ে সহায়তা করে থাকে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক
ওবায়দুর রহমান মন্ডল বলেন, এ বছর ৩৪৫ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ-আবাদ হয়েছে। কৃষকরা সব ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য বারের তুলনায় এবার ফলনও ভালো।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button