
পতকা ডেস্ক : নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন নিয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের মতবিনিময় অংশ নিতে জাতীয় পার্টির ৮ সদস্যের প্রতিনিধি দল বঙ্গভবনে প্রবেশ করেছে।
সোমবার (২০ ডিসেম্বর) বিকাল ৪টায় বঙ্গভবনে প্রথম দিনে মতবিনিময়ে অংশ নিতে আসে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। পরশু বুধবার বিকাল ৪টায় মতবিনিময়ে অংশ নেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)।
জাপার আট সদস্যের প্রতিনিধিদল:
দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলে থাকবেন দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কো-চেয়ারম্যান ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু; অপর চারজন কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, সালমা ইসলাম ও সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এবং সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা। বেলা ৩টায় রাজধানীর কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে জাপার প্রতিনিধিদল বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা করেন।
কেউ কেউ এটিকে ‘সংলাপ’ বললেও রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে জাপা ও জাসদকে আনুষ্ঠানিক যে আমন্ত্রণপত্র দেওয়া হয়েছে, তাতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার বিষয়টিকে ‘মতবিনিময়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি। আগের দুইবারের মতো এবারও নতুন ইসি গঠনে আলোচনা করে পরামর্শ নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। দেশে ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থাকলেও গতকাল রবিবার পর্যন্ত বঙ্গভবন থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পেয়েছে কেবল জাপা ও জাসদ।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলকেই রাষ্ট্রপতি মতবিনিময়ে আমন্ত্রণ জানাবেন। অন্য দলগুলোর কাছে দুই-এক দিনের মধ্যে কিংবা পর্যায়ক্রমে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে যাবে।’
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব ইত্তেফাককে জানান, রাজনৈতিক দলগুলো নতুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্য কমিশনারদের নামের প্রস্তাব জমা দেবে সার্চ কমিটির কাছে। তবে কোনো কোনো দল যদি রাষ্ট্রপতির কাছে নামের তালিকা দেয়, তাহলে পরে সেগুলো সার্চ কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হবে।
আওয়ামী লীগ ছাড়া নিবন্ধিত একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতারা ইত্তেফাকের সঙ্গে পৃথক আলাপকালে বলেছেন, ইসি গঠন নিয়ে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সংলাপ বা মতবিনিময় কার্যত আনুষ্ঠানিকতা। এর মাধ্যমে ভিন্ন বা নতুন কিছু বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এর আগে দুই বার সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের আগেও রাষ্ট্রপতির মতবিনিময়ে তেমন কোনো ফল বের হয়নি। এজন্য এবার মতবিনিময়ে ইসি গঠনে সংবিধানের আলোকে আইন প্রণয়নের ওপরই প্রধান গুরুত্ব দেবে বেশির ভাগ দল।
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের নিয়োগকর্তা রাষ্ট্রপতি। ‘সার্চ কমিটি’র সুপারিশের মাধ্যমে বিগত দুটি নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। ঐ দুটি কমিশন নিয়োগের আগে রাষ্ট্রপতি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বর্তমান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে দুটি সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন। ঐ দুটি সার্চ কমিটির সুপারিশে গঠিত হয়েছিল রকিবউদ্দিন কমিশন ও নুরুল হুদা কমিশন।
সংবিধানের আলোকে ‘আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে’ নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়ে গত ২৫ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ৫৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও নির্বাচন কমিশন গঠনে সংবিধানের আলোকে আইন প্রণয়নের দাবি তুলেছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চার জন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’
কিন্তু গত ৫০ বছরে কোনো সরকারই এই আইন তৈরির উদ্যোগ নেয়নি। ২০১১ সালে হুদা (এ টি এম শামসুল হুদা) কমিশন সর্বসম্মতিক্রমে একটি আইনের খসড়া প্রস্তুত করে সরকারের কাছে উপস্থাপন করেছিল। তবে সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
ইসি গঠনে একটি আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে সংসদে বিল আনার আশা দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। গত ২৮ নভেম্বর সংসদে এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেছেন, ‘আইনের খসড়া হচ্ছে। আমার পরিকল্পনা, চলতি সংসদের পরের কিংবা তার পরের অধিবেশনে আমরা এটা নিয়ে আলাপ করব।’
১৪ দলের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘ইসি গঠনে আইন থাকলে রাষ্ট্রপতির সংলাপের দরকার হতো না। রাষ্ট্রপতি এই সংলাপের সদিচ্ছা না দেখালেও পারতেন। কারণ, সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে ইসি গঠনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।’ আইনের বিষয়ে সংসদে আইনমন্ত্রীর আশ্বাসের বিষয়ে মেনন বলেন, ‘সব সরকারের আমলেই এমনটা আমরা শুনেছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আইনটি হয়নি।’
মেনন বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি আমাদের ডাকছেন, তিনি আমাদের কথা শুনবেন, আমরা আমাদের কথা বলব—এতে আমরা খুশি। কিন্তু সংবিধানের আলোকে আইনটি না হওয়ার কারণে রাষ্ট্রপতিও একক ইচ্ছায় কিছু করতে পারবেন না। সংবিধান অনুযায়ী তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিতে হয়। এবারও সংলাপ শেষে রাষ্ট্রপতি যখন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়ে নতুন ইসি গঠন করবেন, তখন সেটি নিয়েই বিতর্ক সৃষ্টি করতে বিরোধীদের জন্য যথেষ্ট।’
জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ইত্তেফাককে বলেন, ‘একটি শক্তিশালী ইসি গঠনে আমরা রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেব, সহযোগিতা করব। কিন্তু ইসি গঠনে একটি স্থায়ী সমাধানে সংবিধান অনুযায়ী আইন প্রণয়নে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা আমরা প্রত্যাশা করব। যেহেতু রাষ্ট্রপতির মূল দায়িত্ব সংবিধান সমুন্নত রাখা, সে কারণে আমরা রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানাব সংবিধানের আলোকে ইসি গঠনে আইন প্রণয়নে তিনি যেন ভূমিকা রাখেন।’
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের শেষ দিকে ইসি গঠনের লক্ষ্যে একইভাবে সংলাপ শুরু করেছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ৩১টি দলের সঙ্গে তিনি মতবিনিময় করেন, এক মাসের বেশি সময় ধরে চলে সেই সংলাপ। কিন্তু ইসি গঠনে সরকারবিরোধী কিংবা নাগরিক সমাজের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি। এর আগে ২০১২ সালেও ইসি গঠনের আগে রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন। দলগুলো সার্চ কমিটির কাছে নাম প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু তাতে বিরোধী দলগুলোর মতামতের প্রতিফলন দেখা যায়নি।




