
পতাকা ডেস্ক : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, আগামী ৭ জানুয়ারি মধ্যে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) দেওয়া হবে।
আজ রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে এ কথা জানান। এ সভায় নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। এছাড়াও সংসদ নির্বাচনের সার্বিক নিরাপত্তা প্রস্তুতি, জুলাইয়ের সম্মুখসারির যোদ্ধা শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা-বিচার কার্যক্রমের অগ্রগতি, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে ওত পেতে থাকা ফ্যাসিস্টের দোসর, সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীদের বিষয়ে দলগুলোকে সচেতন থাকা, অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২-এর অগ্রগতি পর্যালোচনা, রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সার্বিক নিরাপত্তা পর্যালোচনা- ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির যোদ্ধা শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে বদ্ধপরিকর। আপনারা জানেন, এর প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংখ্যা নিবিড় ও সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এবং প্রকৃত অপরাধী ও মদদকারীদের শনাক্তকরণের জন্য এখনই সবকিছু প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তদন্তের স্বার্থে যে অংশটুকু জনসমক্ষে প্রকাশ সম্ভব, তা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
তিনি বলেন, মামলা চলাকালীন এ যাবৎ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো- ১. ঘটনার মূল হোতা ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা হুমায়ুন কবির; ২. মা হাসি বেগম; ৩. স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়া; ৪. শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু; ৫. গার্লফ্রেন্ড মারিয়া আক্তার লিমা; ৬. মো. কবির; ৭. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল; ৮. সিবিয়ন দিও; ৯. সঞ্জয় চিসিম; ১০. মো. আমিনুল ইসলাম রাজু; ১১. মো. আব্দুল হান্নান। এরমধ্যে ৬ জন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এবং চার জন সাক্ষীও ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য প্রদান করেছে।
জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জব্দকৃত উল্লেখযোগ্য আলামতসমূহ হলো- হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুইটি বিদেশি পিস্তল, ৫২ রাউন্ড গুলি, ম্যাগাজিন ও ছোরা; হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও ভুয়া নম্বর প্লেট; ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গুলির খোসা, বুলেট, ভিডিওচিত্র সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত এবং প্রায় ৫৩টি অ্যাকাউন্টের মোট ২১৮ (দুই শত আঠারো) কোটি টাকার স্বাক্ষরিত চেক। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার অগ্রগতি বিষয়ে আজ সকাল ১১টায় ডিএমপি একটি প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে বিস্তারিত জানিয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জড়িত, তা উদঘাটনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, গ্রেপ্তার হওয়াদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, সাক্ষীদের জবানবন্দি, উদ্ধারকৃত আলামত পর্যালোচনা ও সার্বিক বিবেচনায় মামলাটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে (৭ জানুয়ারি ২০২৬) এ মামলার চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছি। আমি সবাইকে এ বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করার অনুরোধ করছি।
তিনি আরও বলেন, আমরা অতিদ্রুত এ হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য এবং যারা এর পেছনে জড়িত রয়েছে তাদের নাম, ঠিকানাসহ পূর্ণাঙ্গ তালিকা জনসম্মুখে উন্মোচন করতে পারবো, ইনশাআল্লাহ। আপনারা জানেন, ইতোমধ্যে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দ্রুততার সঙ্গে ন্যায়বিচার নিশ্চিতে আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে ফ্যাসিস্টের দোসর, দুষ্কৃতকারী ও সন্ত্রাসীরা অনবরত তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সেজন্য সবাইকে অনুরোধ করবো- আমরা যেন এমন কোনো কাজ না করি; যা আমাদের শত্রুপক্ষকে শক্তিশালী করবে এবং হাদি হত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই হাদি হত্যার বিচার সম্পন্ন করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে ওত পেতে থাকা ফ্যাসিস্টের দোসর, সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীদের বিষয়ে দলগুলোকে সচেতন থাকার অনুরোধ করছি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মী ভালোভাবে না জেনে ফ্যাসিস্টের দোসর, সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীদের তাদের দলে স্থান দিচ্ছে বলে আমরা খবর পাচ্ছি। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলের নেতাদেরকে অনুরোধ করবো- এসব ব্যক্তিদের বিষয়ে আপনারা সচেতন হোন, দলের ভেতরে আড়ি পেতে থাকা সুযোগসন্ধানী, সুবিধাবাদী ও খোলস পাল্টানো দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করুন, এদের থেকে দূরে থাকুন। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিন। তাহলে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।
তিনি জানান, ১৩ ডিসেম্বর থেকে চালু হওয়া ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ অভিযানে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯৯৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাছাড়া এ অভিযানে ১০২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৫৩ রাউন্ড গুলি, ১৬৯ রাউন্ড কার্তুজ, ৮৯টি দেশীয় অস্ত্র, গ্রেনেড, মর্টারের গোলা, গান পাউডার, আতশবাজি, বোমা তৈরির উপকরণ, ইত্যাদি উদ্ধার করা হয়েছে। এসময় মামলা ও ওয়ারেন্টমূলে ১২ হাজার ৩৪৮ জনসহ মোট ২২ হাজার ৩৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।




