মতামতশিরোনাম

সাক্ষাৎকার: বদরুদ্দীন উমর, সেই জীবনই যাপন করেছি, যা করতে চেয়েছি

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: আবু সাঈদ খান ও শেখ রোকন
মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, লেখক ও রাজনীতিক এবং জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর আজ নব্বই বছরে পা দিচ্ছেন। তার জন্ম ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে। তিনি ১৯৪৮ সালে বর্ধমান টাউন স্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৫০ সালে বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে ১৯৫৩ সালে স্নাতক ও ১৯৫৫ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্নের পর ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিপিই ডিগ্রি অর্জন করেন। বদরুদ্দীন উমর কর্মজীবন শুরু করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষকতা ত্যাগ করে সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে যোগ দেন। পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। তার রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় একশ এবং সেগুলো উভয় বাংলাতেই সমাদৃত। সংবাদপত্রে দীর্ঘদিন নিয়মিত কলাম লিখেছেন।

সমকাল: আপনি বেড়ে উঠেছিলেন ব্রিটিশ শাসনামলের একটি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক পরিবারে।
বদরুদ্দীন উমর: আপনাদের মনে রাখতে হবে, সেই পরিবার উগ্র জাতীয়তাবাদী ছিল না, যেটা এখন বাংলাদেশে দাঁড়িয়েছে। আমার পিতা আবুল হাশিম মুসলিম লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন- এটা সত্য। কিন্তু তিনি সব সময়ই বলে এসেছিলেন, ভারতবর্ষ হচ্ছে বহুজাতির দেশ। তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করতেন না। তার জাতীয়তাবাদ ছিল গণতান্ত্রিক। সেখানে আমার জাতির সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য জাতিরও বিকাশ হবে। এটাই ছিল তার আদর্শ।

সমকাল: শৈশব-কৈশোরে তাহলে বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন?
বদরুদ্দীন উমর: পিতার আদর্শ অনুসরণ করেছিলাম- এ রকম কিছু বলা যাবে না। প্রথমদিকে আমার ওপর তার একটা প্রভাবের কথা বলা যেতে পারে; কিন্তু আরও অনেকের প্রভাব ছিল। বাবা মুসলিম লীগ করতেন। তবে আমাদের পরিবারে শুধু মুসলিম লীগই ছিল না; কংগ্রেস ছিল, কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব খুব বেশি ছিল। বিশেষত কলকাতায় আমাদের ২ নম্বর পার্ক সার্কাস রোডের বাড়িতে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির চর্চাটাই বেশি হতো। সেখানে পার্টির যে ক্লাস হতো সেখানেও আমি যেতাম মাঝেমধ্যে। আমাদের পরিবারে একটা উদারনৈতিক আবহাওয়া ছিল।

সমকাল: আপনি মার্কসবাদী হলেন কবে এবং কীভাবে?
বদরুদ্দীন উমর: দেখুন, এটা হঠাৎ করে হয়নি। আমি খুব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়েছি। প্রথম জীবনে পিতার প্রভাবে এক ধরনের ইসলামী চিন্তার আচ্ছন্নতা ছিল। যে কারণে ঢাকায় আসার পরও তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলাম। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে তা কাটতে শুরু করে। তারপর অক্সফোর্ডে যাওয়ার পর মার্কসবাদী চিন্তা-ভাবনা পূর্ণতা পায়। সেখানে থাকার সময় আমি তৎকালীন বিশ্বের সব ধরনের চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে মিথস্ট্ক্রিয়া করেছি।

সমকাল: কিন্তু ষাটের দশকে আপনার রচিত সাম্প্রদায়িকতা, সাংস্কৃতিক সংকট, সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতি গ্রন্থে জাতীয়তাবাদী চেতনা স্পষ্ট।
বদরুদ্দীন উমর: এগুলো ঠিক জাতীয়তাবাদী বলা যাবে না। তবে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষের কথা ছিল। আপনারা তো জানেন, সাধারণত জাতীয়তাবাদের যে অর্থ, মার্কসবাদীরা সেটা ধারণ করে না। কিন্তু জাতীয়তাবাদের বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও মার্কসবাদে জাতির বিকাশের কথা বলা হয়। জাতীয়তাবাদ এবং জাতির বিকাশের ধারণা দুটো আলাদা বিষয়। জাতির বিকাশ, তার ভাষার বিকাশ, সংস্কৃতির বিকাশ, অর্থনীতির বিকাশ- এগুলোই আমি চিন্তা করেছিলাম এবং লিখেছিলাম।

সমকাল: আপনি কি কমনওয়েলথ স্কলারশিপে গিয়েছিলেন?
বদরুদ্দীন উমর: না, আমি সরকারি বৃত্তি নিয়ে গিয়েছিলাম। সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট স্কলারশিপ। বিলেত থেকে যখন রাজশাহী এলাম, তখন একজন কমিউনিস্ট হিসেবেই ফিরে এসেছিলাম। বিলেতে আমার সঙ্গে নেপাল নাগের দেখা হয়েছিল। তখন তিনি আমাকে পার্টির সদস্য হতে বলেন। সেটা ১৯৬০ সালে। তখন আন্তর্জাতিক কমিউনিস্টরা বিভক্ত হচ্ছিল। এখানকার পার্টি তখন অবিভক্ত ছিল। নেপাল নাগকে তখন পাঠানো হয়েছিল চীনে; রাশিয়ায়ও। তখন দু’পক্ষেরই কাগজপত্র নিয়ে গিয়েছিলেন। সে সময় আমি অক্সফোর্ডে, তিনি বিলেত হয়ে ফিরেছিলেন। তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন, আমি যাতে দেশে ফিরে এসে পার্টির সদস্য হই। কিন্তু আমি পার্টির সদস্য হইনি। ইউনিভার্সিটিতে পড়াতে গিয়ে পার্টির সদস্য হিসেবে বসে থাকা আমার কাছে সঠিক মনে হয়নি। আমি মনে করেছিলাম, কমিউনিস্ট পার্টিতে আমি তখনই যোগ দেব যখন সার্বক্ষণিক কাজ করতে পারব। সেটা আমি করেছিলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছাড়ার পর আমি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলাম।

সমকাল: সেটা কত সাল? তখন তো কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত ছিল।
বদরুদ্দীন উমর: সেটা ঊনসত্তরে। আমি ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে এখানে চলে আসি। হ্যাঁ, কমিউনিস্ট পার্টি তখন বিভক্ত ছিল। আমি তখন তথাকথিত চীনাপন্থি বলে পরিচিত সুখেন্দু দস্তিদার, তোয়াহা, আব্দুল হক, তাদের দলে ছিলাম।

সমকাল: মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের সঙ্গেই ছিলেন।
বদরুদ্দীন উমর: সে সময় আমি পার্টির পূর্ণকালীন সদস্য। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, পার্টিতে আমি যোগ দিলেও পার্টি আমার প্রতি খুব সুপ্রসন্ন ছিল না। তাদের মধ্যে আসলে লেখাপড়ার অভাব ছিল। তোয়াহা সাহেব যদিও এমএ পাস করেছিলেন, আব্দুল হক যদিও খুব ভালো ছাত্র ছিলেন; রাজনীতি ও মার্কসবাদ বিষয়ে তাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিল না বললেই চলে। মস্কোপন্থি, পিকিংপন্থি- দুই পার্টির মধ্যেই পড়াশোনা ও বোঝাপড়ার চর্চা ছিল না। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে আসল মার্কসবাদের চর্চা ছিল না বললেই চলে। এরা কিছু বইপত্র ভাসা ভাসা পড়তেন। এ জন্য তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় মতপার্থক্য হতো। ফলে তারা বোধহয় মনে করেছিলেন, আমি বিরোধী কোনো চিন্তা আমদানি করেছি। এসব মতদ্বৈধতার ফলে তারা কিছুদিনের মধ্যেই আমার প্রতি বেশ বিরূপ হলেন।

সমকাল: আপনি তো পার্টির পত্রিকা গণশক্তি সম্পাদনা করতেন।
বদরুদ্দীন উমর: হ্যাঁ, আমি গণশক্তি সম্পাদনা করেছিলাম। সেটাও আসলে এ কারণে যে, গণশক্তি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পত্রিকাটি সম্পাদনার কোনো লোক ছিল না। তোয়াহা-আব্দুল হক এরা তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলেন। অন্য কেউ না থাকায় আমি তখন সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। সেখানে একটি সম্পাদনা কমিটি ছিল। আমি ছিলাম সম্পাদক। সাইদুল হাসান আইনগত সম্পাদক ছিলেন, কিন্তু নামমাত্র। আমি ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে গণশক্তি সম্পাদনা করতাম, প্রকাশ করতাম। পত্রিকাটি চলেছিল ২৫ মার্চে ইয়াহিয়া খানের হামলার আগ পর্যন্ত।

সমকাল: মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে সুখেন্দু দস্তিদার, তোয়াহা, আব্দুল হক প্রমুখের ভূমিকা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
বদরুদ্দীন উমর: আমি পার্টি নেতৃত্বকে বারবার বলেছিলাম, আমাকে সাংগঠনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত করুন। আমি ঢাকায় আছি, পত্রিকা সম্পাদনা করছি। কিছু অন্য সাংগঠনিক কাজও করতে পারি। কিন্তু তারা আমাকে কোনো কাজ দেন নাই। যখন একাত্তর সাল এলো, আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, এখন কী করব? গণশক্তি তো নাই। আব্দুল হক বললেন, আপনাকে আমরা কোনো কাজ দিতে পারব না। কোনো শেল্টারও দিতে পারব না। আমি বললাম- আশ্চর্য, আমাকে কোনো শেল্টার দিতে পারবেন না? আমি তো পার্টির লোক। এটা কেমন কথা! তখন সুখেন্দু দস্তিদার বললেন, তোয়াহা সাহেব নোয়াখালী যাবেন, আমি তার সঙ্গে যেতে পারি। সে প্রসঙ্গ অন্যত্র বিস্তারিত লিখেছি।

সমকাল: তারপর কী করলেন?
বদরুদ্দীন উমর: একাত্তর সালের ব্যাপারটা এমন হলো যে, পার্টি আমাকে কোনো সাহায্যই করল না। তখন আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে চেষ্টা করতে লাগলাম। এর ফলে একটা কাজ হয়েছিল। দেশের অভ্যন্তরের কী অবস্থা, মানুষের ওপর কী ধরনের নির্যাতন হচ্ছিল, কীভাবে হামলা হচ্ছিল- সেসব ব্যাপারে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলাম। আমি একেকদিন ২৫-৩০ মাইল পর্যন্ত হেঁটে একেক জায়গায় যেতাম। হেঁটে যাওয়ার পথে সিগারেট, চা কিছুই পাইনি। বাজার পুড়িয়ে দেওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনীও সমস্যায় পড়ে। কারণ তাদেরও সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায়। বাজার পুড়িয়ে দেওয়া ছিল তাদের জন্য পায়ে কুঠার মারার মতো অবস্থা।

সমকাল: মুক্তিযুদ্ধে কমিউনিস্টদের জন্য দুই ফ্রন্টের লড়াই কীভাবে এলো?
বদরুদ্দীন উমর: হঠাৎ আব্দুল হক, তোয়াহা, সুখেন্দু দস্তিদার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তত্ত্ব দিলেন। প্রথমে তারা দুই দলিলের তত্ত্ব দিয়েছিলেন। আমি দেখলাম, কথা একটাই। সেটার ওপর আমি তখন প্রথমে ১৮ পৃষ্ঠার একটা অ্যাসেসমেন্ট লিখেছিলাম। তারপর ২-৩ মাস পরে ঘুরেফিরে জুলাই মাসে ৬৩ পৃষ্ঠার একটা দীর্ঘ সমালোচনা লিখি। সেখানে এমনকি আমি তাদের ভাষাজ্ঞানেরও সমালোচনা করেছিলাম। যেমন তোয়াহা আর সুখেন্দু দস্তিদারের দলিলে একটা বাক্য ছিল- আব্দুল হকের সঙ্গে কোনো মৌলিক পার্থক্য না থাকলেও কতগুলো মূল বিষয়ে তাদের সঙ্গে পার্থক্য রয়েছে। আমি বললাম, কতখানি কেয়ারলেসনেস থাকলে এই ধরনের একটি দলিলে এমন অর্থহীন বাক্য থাকতে পারে!

সমকাল: কথিত দুই কুকুরের লড়াইয়ের বিষয়টা কী?
বদরুদ্দীন উমর: এটা হলো এক ধরনের আজগুবি বিষয়। মাঠেঘাটে ঘুরে এই নেতাদের আজগুবি উপলব্ধি হলো, ইয়াহিয়া খান ও আওয়ামী লীগ একই! তারা নাকি চীনপন্থি ছিলেন। অথচ চীনেও জাপানি শক্তিকে তাড়ানোর জন্য চৌ এন লাই ও চিয়াং কাইসেক হাত মিলিয়েছিলেন। চিয়াং কাইসেকের দিক থেকে হামলার পরও তারা ধৈর্য ধরেছিলেন। তারা চুক্তি ভঙ্গ করেননি কিছুতেই। কারণ ঐক্য তখন দরকার ছিল।

সমকাল: মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে হক-তোয়াহাদের বিরোধ কীভাবে সৃষ্টি হলো?
বদরুদ্দীন উমর: এটা বলা দরকার যে, আওয়ামী লীগ নেতাদের সবাই তখন সীমান্তের ওপারে। দেশের বাইরে থেকে এভাবে কেউ স্বাধীনতা যুদ্ধ করেনি। সব এলাকায় স্বতঃস্ম্ফূর্ত প্রতিরোধ হচ্ছিল। আর যুদ্ধের প্রথমে কমিউনিস্টরা মাঠে ছিল। জুন মাস পর্যন্ত মাঠেঘাটে সর্বত্রই কমিউনিস্টরা ছিল। তারপর যখন যশোর অঞ্চলে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আওয়ামী লীগ ফিরে আসা শুরু করল, আব্দুল হক ফরমান দিলেন- এরা হচ্ছে শ্রেণিশত্রু। এদের ওপর আক্রমণ করতে হবে। এই আক্রমণ শুরু হলেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হলো। তখন সাধারণ মানুষ কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে চলে গেল। কারণ গ্রাম পর্যায়েও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা ছিল। শেখ মুজিবের তো বিপুল জনপ্রিয়তা ছিল। ফলে আগস্ট মাসের দিকে জনগণের ভয়ে কমিউনিস্টদের গ্রাম ছেড়ে চলে আসতে হলো। আসলে এদের কোনো বিশ্নেষণের ক্ষমতাই ছিল না। মার্কসীয় তত্ত্বের ভিত্তিতে জাতীয় সংগ্রাম কাকে বলে; বিপ্লব কাকে বলে; শ্রেণিদ্বন্দ্ব কাকে বলে; জাতীয়তাবাদী দ্বন্দ্বের সঙ্গে শ্রেণিদ্বন্দ্বের কী সম্পর্ক; দুটির মধ্যে সমন্বয় কীভাবে করতে হবে- এসব ব্যাপারে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না।

সমকাল: আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
বদরুদ্দীন উমর: আমি এখন ভাবছি আওয়ামী লীগ সম্পর্কে লিখব। আওয়ামী লীগের সেদিন ও এদিন। এটা বলা দরকার, সাতচল্লিশ সাল থেকে ঊনষাট পর্যন্ত যত সরকার ছিল তার মধ্যে আতাউর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার খুবই গণতান্ত্রিক কাজ করেছিল। আতাউর রহমানের একটা গুণ ছিল, তিনি অন্যদের পরামর্শ শুনতেন। শেখ মুজিব একটা প্ল্যানিং কমিশন গঠন করলেও তাদের কথা শুনতেন না। কিন্তু তিনি একটি বড় কাজ করছিলেন- আওয়ামী লীগের গণসংগঠন। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন।

সমকাল: আপনি বলছিলেন, কমিউনিস্টদের লেখাপড়া কম, সংগঠনও বোঝে না।
বদরুদ্দীন উমর: যারা জাতীয়তাবাদী ছিলেন তারা মার্কসবাদ পড়বেন না- জানা কথা। কিন্তু তখনকার কমিউনিস্টদের মধ্যেও লেখাপড়া ছিল না। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছিল, সেটাই তারা ধরতে পারেনি।

সমকাল: এখনকার কমিউনিস্টদের কী অবস্থা দেখছেন?
বদরুদ্দীন উমর: এখন তো কোনো কমিউনিস্টই দেখি না। এত বামপন্থি নামধারী দলের মধ্যে কাদের আপনি কমিউনিস্ট বলবেন? আমি তাদের কাউকে কমিউনিস্ট মনে করি না।

সমকাল: আপনার নিজের দলেও তো ব্যাপক মাত্রায় শ্রমিক-কৃষকের সম্পৃক্ততা ঘটেনি।
বদরুদ্দীন উমর: এখানকার মিডল ক্লাস আমাকে ভালো মনে করত পাকিস্তান আমলে। কারণ জাতীয়তাবাদ প্রশ্নে তাদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপার ছিল। বাহাত্তর সালের পর সেই ঐক্য ছিল না। তখন তারা শাসক হয়ে গেল। যে কারণে প্রগতিশীল বা আওয়ামী লীগ- যত বুদ্ধিজীবী দেখবেন, সবাই আমার বিরুদ্ধে। শুধু রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়; বুদ্ধিজীবী হিসেবে আমাকে নিয়ে আলোচনা আপনি কোথাও দেখবেন না। মার্কসও এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। যখন ডাস ক্যাপিটাল বের হলো তখন বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা ‘কন্সপিরেসি অব সাইলেন্স’-এর মাধ্যমে তাকে উপেক্ষা করতে চেয়েছিল। মার্কসের নগণ্য শিষ্য হিসেবে এখানে আমারও একই অবস্থা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের ওপর আমার যে বই বেরিয়েছে, তার কোনো রিভিউ পূর্ববঙ্গে হয়নি। প্রথম আলোচনা পশ্চিমবঙ্গে হয়েছে। আর কমিউনিস্টদের মূর্খতা, ধান্দাবাজি ইত্যাদি আমি যেভাবে ধরিয়ে দিয়েছি, আমার প্রতি তাদের তো পেয়ারের কোনো কারণ নেই। তারা বরং আমার বুদ্ধিবৃত্তিক শত্রু।

সমকাল: কমিউনিস্টদের তাহলে ভবিষ্যৎ কী?
বদরুদ্দীন উমর: বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের কোনো ভূমিকা নেই, ভবিষ্যৎও নেই। এখন তাদের ভূমিকা হলো বুর্জোয়াদের পা চাটা। এদের শিরদাঁড়া বলে কখনও কিছু ছিল না। আমি বাহাত্তর সালেই বলেছিলাম, মস্কোপন্থি কমিউনিস্টরা হলো আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট। আপনারা দেখবেন, আওয়ামী লীগের সব সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সিপিবির উপহার।

সমকাল: পিকিংপন্থিরাও তো হারিয়ে গেছে।
বদরুদ্দীন উমর: তাদের অবস্থা আরও করুণ। মস্কোপন্থিদের যাও সামান্য লেখাপড়া ছিল; পিকিংপন্থিদের তাও কোনোকালে ছিল না।

সমকাল: আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কমিউনিজমের অবস্থা কেমন দেখছেন?
বদরুদ্দীন উমর: যারা বলে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কমিউনিজমের ভবিষ্যৎ নেই- তারা সামনে এক হাতের বেশি দেখতে পায় না। তাদের ধারণা, সমাজতন্ত্র শেষ। কিন্তু ইতিহাস তো একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। আমাকে অনেকে জিজ্ঞেস করে, সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী? আমি বলি, এই প্রশ্নের আগে আরেকটা প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। পুঁজিবাদের ভবিষ্যৎ কী? পুঁজিবাদের যদি কোনো ভবিষ্যৎ না থাকে, তবে সমাজতন্ত্র ছাড়া মানব জাতির আর কী বিকল্প আছে? আমি একটি বই লিখেছি, সাম্রাজ্যবাদের অনিবার্য ভবিষ্যৎ।

সমকাল: এই পরিবর্তন কি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হতে পারে?
বদরুদ্দীন উমর: দেখুন, এই পরিবর্তন কীভাবে হবে; সেটা ছক বেঁধে বলা যাবে না। তবে অতীতে চীনে যেভাবে সমাজতন্ত্রের লড়াই হয়েছে, রাশিয়ায় যেভাবে হয়েছে, ভবিষ্যতে অন্যত্র সেভাবে হবে না। আমরা বলি, সেটা একটা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হবে। ভবিষ্যতে মানুষের উত্থান হবে। ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষত বঙ্গে অভ্যুত্থানের ইতিহাস ও চর্চা বেশ দীর্ঘ। ছেচল্লিশে মুসলিম লীগের নির্বাচনে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে, চুয়ান্নর নির্বাচনে, ঊনসত্তরে- সব সময়ই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ হয়েছে। একাত্তরেও তো প্রথমেই অভ্যুত্থান ঘটেছিল। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে নিহিত।

সমকাল: বিশ্বের অন্যান্য দেশেও কি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরিবর্তন আসবে?
বদরুদ্দীন উমর: সব দেশেই রাজনৈতিক দিক ছাড়া প্রাকৃতিক পরিবেশের যে পরিস্থিতি, সেটাই সব ধ্বংস করে দিতে পারে। পুঁজিবাদীরা যেভাবে পরিবেশ ধ্বংস করছে; সেটা পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, মুনাফাখোরি সবাইকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। এদিক থেকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমস্ত বিশ্বের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। রাজনৈতিকভাবে যদি এ অবস্থা কাটিয়ে নেওয়া যায়, তবে শেষ পর্যন্ত মানুষকে জয়ী হতেই হবে। মানুষ এভাবে থাকতে পারে না। এটা একেবারে অসম্ভব। এ অবস্থায় লড়াই করবে মানুষ। লড়াই করতে করতে মানুষ নিজের পথ খুঁজে নেবে।

সমকাল: গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির কতটা বিকাশ ঘটেছে?
বদরুদ্দীন উমর: সাতচল্লিশ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে যা হয়েছিল, সেটাই ৭০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক। অন্ধকারের যুগ আরম্ভ হলো একাত্তর সালের পর। এখন আপনি চারদিকে তাকিয়ে দেখেন, কিছুই পাবেন না। সাহিত্যক্ষেত্রে আপনি দেখবেন, যারা আগে লিখত, লিখতে লিখতে মরেও গেছে, বয়স হয়ে গেছে অনেকের। এখন সাহিত্য-সংস্কৃতিতে কেউ নেই। শিক্ষাঙ্গনে কেউ নেই। আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকের নাম বলতে পারবেন না, যে উচ্চমানের শিক্ষক। রাজনীতিতে আপনি এমন কাউকে পাবেন না। বিজ্ঞানচর্চার দিক থেকে বলতে পারবেন না। ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রেও বলতে পারবেন না। এর কারণ হচ্ছে, সবকিছুর সিলিং নির্ধারণ করছে শাসক দল।

সমকাল: পাকিস্তান আমলে যেমন শাসক ধারার বিপরীত ধারা গড়ে উঠেছে, এখন তেমন হচ্ছে না কেন?
বদরুদ্দীন উমর: শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে শাসকরা সব সময় ডমিন্যান্ট থাকে। কিন্তু এখন ডমিন্যান্স এমন পর্যায়ে গেছে যে, সেটি ফোর্সের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। এ ছাড়া মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে একটা নতুন মিডল ক্লাস গড়ে উঠেছে। একটা মিডল ক্লাস হয়েছিল সাতচল্লিশের আগে, মুসলমান মিডল ক্লাস। সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর পর্যন্ত আরেকটা মিডল ক্লাস। থার্ড মিডল ক্লাসের সামনে এমন সুযোগ চলে আসছে, যা তারা চিন্তাভাবনাও করতে পারত না। যে সামান্য ব্যবসায়ের চিন্তা করতে পারত, সে এখন শত শত কোটি টাকার মালিক। দারোয়ান পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার মালিক। একটা বিপ্লব হলে যেমন, পলিটিক্যালি অর্গানাইজড হলে মধ্যবিত্ত শ্রেণি উঠে আসে, এখানে সে রকম ব্যাপার হয়নি, যেটা চীনে হয়েছিল। প্রগতিশীল কোনো চর্চা ছাড়াই মানুষের হাতে এত সম্পদ চলে এলো, এটা বিপজ্জনক। বিশেষত বাঙালি মুসলমান ১৯৭১ সালের পর সুবিধাবাদের দ্বারা শেষ হয়ে গেছে। আমাকে অনেকে বলে, আপনি তো এত চেষ্টা করে গেলেন, কিছুই করতে পারলেন না। আপনি তো চেষ্টা করলেন কিন্তু লোকদের ম্যাগনেটের মতো আকর্ষণ করতে পারলেন না। আমি বলি, ম্যাগনেট লোহাকে আকর্ষণ করতে পারে, কিন্তু কাষ্ঠকে আকর্ষণ করতে পারে না। এখন আমাদের দেশের মানুষের অবস্থা হয়ে গেছে কাষ্ঠসম। সেখানে মার্কসবাদ বা কমিউনিজমের কথাবার্তা কাউকে আকর্ষণ করবে না।

সমকাল: নতুন প্রজন্মও মেধাবী, কিন্তু রাজনীতিবিমুখ।
বদরুদ্দীন উমর: শোনেন, মেধাবী হলেই যে ভালো হয়ে যাচ্ছে সবকিছু, তা কিন্তু নয়। জার্মান দার্শনিক কান্ট বলেছিলেন, নাথিং ক্যান বি কল্‌ড গুড উইদাউট কোয়ালিফিকেশন, উইদাউট আ গুড উইল। আপনি বলেন, ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য, মেধা- এর সবকিছুই খারাপ কাজে ব্যবহূত হতে পারে, যদি না গুড উইল বা সদিচ্ছা থাকে। মেধা থাকলেই হবে না। মেধাকে কোন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা হলো বিষয়। মেধা দিয়ে অ্যাটম বোমা তৈরি করে মানুষ খুন করেছে। আবার এই মেধা দিয়ে বিপ্লবও হতে পারে। এটা নির্ভর করে মেধা কোন কাজে লাগানো হচ্ছে। মেধা আগেও ছিল। মেধা বিকাশের শর্ত আগে তেমন ছিল না। আগে অনেক গরিব ঘরের সন্তানও মেধাবী ছিল। বাংলাদেশ হওয়ার পরই মেধা আসছে, মানুষের মাথায় বুদ্ধি গজিয়ে গেল, তা কিন্তু নয়। সুযোগের কারণে সেটা হয়েছে। আবার এই সুযোগ অনেকের চরিত্র ধ্বংস করেছে। এখন নতুন প্রজন্ম রাজনীতির ধারেকাছে যায় না। তাদের দেশপ্রেম বলতে কিছুই নেই। এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১০ টাকা-১৫ টাকা বেতন দিয়ে লেখাপড়া করছে। পরে দেশ ছাড়ছে। এখানে দেশপ্রেম নেই; খালি আত্মপ্রেম।

সমকাল: দেশে সাম্প্রদায়িকতা বাড়ল কেন?
বদরুদ্দীন উমর: সাম্প্রদায়িকতা এ অঞ্চলে শেষ হয়ে গেছে ১৯৪৭ সালে। সাম্প্রদায়িকতা একটা রাজনৈতিক ব্যাপার। এটা নাইন্টিনটিন্থ সেঞ্চুরিতে সৃষ্টি হয়েছিল হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে অসম বিকাশের কারণে। মুসলমানদের সুযোগ কম ছিল, হিন্দুদের বেশি। সে জন্য আমি একটা লেখায় বলেছি, টু নেশন থিওরি হিন্দুদের আবিস্কার। গান্ধী, নেহরু, প্যাটেল- সবাই টু নেশন থিওরিধারী। সুনীতি কুমার তার বইতে বিস্তারিতভাবে লিখেছেন, আসলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নয় বরং গান্ধী, নেহরু, প্যাটেল, বিল্লা এরাই দেশ ভাগ করেছে। জিন্নাহর নামে দোষ চাপিয়ে প্রবল প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে তারা এটা করেছে। নাইনটিন সেঞ্চুরিতে যে টু নেশন থিওরি, বঙ্কিমচন্দ্র এবং নবগোপাল মিত্র, তারা ছিল এগ্রেসিভ। মুসলমানদের উঠতে বাধা দেওয়ার জন্য এই জাতীয়তাবাদ বেঁধেছিল। জিন্নাহর যে জাতীয়তাবাদ, সেটা ছিল ডিফেন্সিভ। যারা পিছিয়ে ছিল, তাদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য টু নেশন থিওরি। আর ওদেরটা ছিল, পিছিয়ে পড়াদের মেরে ফেলার টু নেশন থিওরি।

সমকাল: সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টি যদি বলতেন।
বদরুদ্দীন উমর: বাংলাদেশে এখন সাম্প্রদায়িকতা নেই। এখানে কিছু ফ্যাসিস্ট গ্রুপ রয়েছে, তারা এটা করছে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে কি আপনি সাম্প্রদায়িকতা পাবেন? সাতচল্লিশে হিন্দু-মুসলিম ভাগ হওয়ার পর সাম্প্রদায়িকতা শেষ হয়ে গেছে। যার ফলে ভাষাভিত্তিক জাতীয়াবাদ হলো এবং নতুন দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হলো। অবাঙালি-বাঙালি। এই দ্বন্দ্বের বিকাশের ফলেই বাংলাদেশ পেলেন। বাংলাদেশ পাওয়ার পর এখানে সাম্প্রদায়িকতার যে ভিত্তি ছিল তা নিশ্চিহ্ন হয়। এখানে যা দেখছেন, তা সাম্প্রদায়িকতা নয়।

সমকাল: বিষয়টি আরও ব্যাখ্যা করবেন?
বদরুদ্দীন উমর: এখানে যে মৌলবাদ, সেটা ধর্মের সুবিধাবাদী, ধান্দাবাজি ব্যবহার। আদিকাল থেকেই যেটা হয়ে আসছে। এখনও যে মারামারি দেখছেন, সব দেখবেন ক্ষমতাসীন দলের লোকজন নেপথ্যে রয়েছে। এরা ধর্মকে ব্যবহার করে সংখ্যালঘু মানুষের ওপর হামলা করছে। হিন্দুর ওপর হামলা করছে। দেখবেন, যখন হামলা করছে তখন সাধারণ মুসলমানরা বাধা দিচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাম্প্রদায়িকতা থাকতে হলে সাম্প্রদায়িক দল থাকতে হবে। এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক দল নেই। জামায়াতে ইসলামী কোনো সাম্প্রদায়িক দল নয়। ইসলামী শাসনতন্ত্র সাম্প্রদায়িক দল নয়। তারা কোনো হিন্দুর বিরুদ্ধে বলছে না। তারা ধর্মীয় মৌলবাদী। তারা বলছে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে, ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে। সমাজে কতগুলো ফ্যাসিস্ট অংশ রয়েছে, যারা লুটতরাজ করে। সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে লুটতরাজের সম্পর্ক রয়েছে। দেখবেন, জমি দখল করছে। এরা আসলে বদমায়েশ। এরা নিজেদের সুবিধার জন্য হিন্দুদের ওপর হামলা করছে। এরা আওয়ামী লীগের মধ্যে আছে, বিএনপির মধ্যে আছে। সব দলের মধ্যেই আছে। শাসক-শোষক শ্রেণির একটি অংশ, যাদের জমির লোভ রয়েছে, তারা এসব হামলা করছে সুবিধার জন্য। তারা কি মুসলমানদের ওপর হামলা করছে না? করছে। তারা সাঁওতালদের ওপর হামলা করছে। চাকমা, মারমা, বিহারিদের ওপরও আক্রমণ হচ্ছে।

সমকাল: বাংলাদেশে নাগরিক আন্দোলন শক্তিশালী হলো না কেন?
বদরুদ্দীন উমর: এখানে নাগরিক আন্দোলন হয় প্রচলিত ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য। দেখবেন, এরা দু-চার কথা সরকারের বিরুদ্ধে বলে, তারপর এমন কথা বলবে যে, তারা নিউট্রালাইজ হয়ে গেলে। এর ফলে এদের সমালোচনায় জনমনে কোনো প্রভাব পড়ছে না। এ ধরনের নাগরিক আন্দোলনের মধ্যে সত্যের চেতনা, স্বাধীনতার চেতনা, জনগণের স্বার্থের চেতনা, সংগ্রামের চেতনা, প্রতিরোধের চেতনা নেই। ফলে তাদের কাজ তো এমনই হবে।

সমকাল: এই সাক্ষাৎকার যেদিন প্রকাশ হবে, আপনি সেদিন নব্বই বছরে পা দিচ্ছেন। জীবনে কোনো আক্ষেপ আছে কিনা।
বদরুদ্দীন উমর: আমার আক্ষেপ একটাই, এ দেশের মানুষের মধ্যে কোনো ধরনের পরিবর্তন দেখে যেতে পারলাম না। এই সমাজের মৌলিক কোনো পরিবর্তন দেখে যেতে পারলাম না। যদিও তার জন্য চেষ্টা করলাম। কিন্তু আমার নিজের জীবনের কথা জিজ্ঞেস করলে ইংরেজিতে বলি- আই হ্যাভ লিভড দি লাইফ দ্যাট আই ওয়ান্টেড টু লিভ। মডেস্ট, অনারেবল অ্যান্ড প্রডাক্টিভ। আমি সেই জীবনই যাপন করেছি, যা যাপন করতে চেয়েছি। সাধারণ, সম্মানজনক ও উৎপাদনমুখর।

সমকাল: আপনাকে জন্মদিনের আগাম শুভেচ্ছা।
বদরুদ্দীন উমর: আপনাদের জন্যও শুভকামনা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button