জাতীয়

সাংবিধানিক কাঠামোই সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে ‘বাঁধা’

সুজনের গোলটেবিল বৈঠক
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, বিরাজমান সাংবিধানিক কাঠামোই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের পথে একটি অন্তর্নিহিত প্রতিবন্ধকতা। এই অবস্থায় সবচেয়ে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষেও প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সহজ হবে না। সংশ্লিষ্ট সকলকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে করণীয়’ শীর্ষক আলোচনার সভায় এসব কথা বলা হয়। সভায় তফসিল ঘোষণার আগেই সকলের জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেইং ফিল্ড) নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্যে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বর্তমান সাংবিধানিক বিধান একটি সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে একটি অন্তর্নিহিত বাঁধা। কেননা বর্তমানে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যেই পরবর্তী মেয়াদের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তা বর্তমান সংসদ বহাল রেখেই। এ বিধান বহাল রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে লেভেল প্লেইং ফিল্ড করা দুরূহ হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান হবে সুদূরপরাহত। অন্যভাবে বলতে গেলে, দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হলে ক্ষমতাসীনরা বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে।
তিনি আরো বলেন, শত শত কোটি টাকা ব্যায় করে আমরা পুলিশ-র্যাবকে ভোটের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেই। কিন্তু আমরা অতীতে দেখেছি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারাই সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তারা সিল মারে, আরো অনেক কাজে অন্যায়ভাবে সহায়তা করে। নির্বাচনের একটা সিকিউরিটি প্লানের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত। সেনাবাহিনী নিয়োগ করে হলেও এটা দরকার।
তিনি আরো বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন বিতর্কিত নির্বাচন হয়েছে। তার পরিণাম আমরা ভোগ করছি। আমি মনে করি আরেকটা বিতর্কিত নির্বাচন আমাদের চরম সঙ্কটের দিকে নিয়ে যাবে। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার স্বার্থে ইসিকে সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকারের সহায়তা ও সদাচারণ নিশ্চিত করতে হবে।
সুজনের সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, নির্বাচন কমিশনকে যে ক্ষমতা দেয়া আছে, প্রয়োজন মনে করলে সঠিক নির্বাচনের স্বার্থে ইসি তাই বাইরেও কাজ করতে পারে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আগেই বলে দিয়েছেন, রাজনৈতিক দলের মধ্যস্ততা বা তফসিলের আগে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা ইসির দায়িত্ব নয়।
এই বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এক দল ভোট চাইছে, জনসমাবেশ করছে। আরেক দল শৃঙ্খলিত হয়ে আছে। এমনকি দলীয় সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রমও পরিচালনা করতে পারছে না। এই অবস্থায় তফসিলের ৪৫ দিনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা অবাস্তব। এখন থেকেই সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তাত্ত্বিক দিক থেকে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো দেশের কমিশনের চেয়ে শক্তিশালী এবং বড়। কিন্তু সরকার শতভাগ সহায়তা করলেও কী ভাল নির্বাচন সম্ভব? দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু এর অন্তরায় হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাজনৈতিক দলগুলোকে ঠিক করতে হবে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন চায় কি না। আবার ইসির ওপর সবার আস্থা না থাকলেও তাদের পক্ষে নির্বাচন করা কঠিন। সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার মনে করেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে আদালতেরও ভূমিকা আছে। ভারতীয় নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী বিচার বিভাগের কারণে।
সুজন-এর সহ সভাপতি বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আইন-বিধি রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ আইন ভঙ্গ করতে উত্সাহ পায়। নির্বাচনে জিততেই হবে এমন মানসিকতা পোষন করলে কখনই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না।
সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতি হঠাত্ করে বদলায়। নির্বাচনী ব্যায় নিয়ন্ত্রণে ইসিকে তত্পর হতে হবে। অযথা ব্যয় কমাতে হবে। ইসির উদ্যোগে প্রজেকশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
অংশীজনদের সঙ্গে ইসির সংলাপের বিষয়ে গবেষক ও প্রাবন্ধিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ইসি শুধু আওয়ামী লীগকে ডেকে আলোচনা যদি আলোচনা করত, তারা কী রকম নির্বাচন চায়, কী রকম সহায়তা করবে, সেটা জানত তাহলে ভাল হত। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘন ঘন বসলে ভাল। কারণ সব দল যদি বলে, তারা সুইজারল্যান্ডের মত নির্বাচন চায়, কিন্তু আওয়ামী লীগ না চাইলে তা হবে না। তিনি প্রশ্ন রাখেন, তাহলে শুধু শুধু মতবিনিময়ে সময় নষ্ট করে কী লাভ?

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button