
:মাহফুজা জেসমিন:
“আমাকে আরো কিছু কথা বলতে দিন। শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ, অধিকার সুরক্ষা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের এসব কথা জানতে হবে। এগুলো না জানলে একটি সুন্দর ও নিরাপদ দেশ গঠন হবে না ” বনানী থানার অফিসার ইনচার্জ সদ্য প্রয়াত সালাহ উদ্দিন অনেক আশা ও প্রত্যয় নিয়ে সেদিন কথাগুলো বলেছিলেন। তিনি কথা বলেছিলেন, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের উদ্দেশ্যে, শিশু ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্য তিনি। তারও চেয়ে বেশি তিনি ছিলেন একজন সচেতন ও সংবেদনশীল মানুষ। পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও সামাজিক নানা কর্মকান্ডে যুক্ত রেখেছিলেন নিজেকে।
নিজের দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠাবান সালাহ উদ্দিন সেদিন বাল্যবিয়ে মুক্ত নিরাপদ কড়াইল গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেছিলেন, বাল্যবিয়ে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হলে, সমাজে শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবাইকে কাজ করতে হবে। সবাইকে সচেতন করতে হবে। শিশুর অধিকার সম্পর্কে আগে জানতে হবে।
মাত্র ২৭ (সাতাশ) দিন আগে! বনানীর কড়াইলে এরশাদ স্কুল মাঠে “শিশু সুরক্ষা মেলা”র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা দিচ্ছিলেন তিনি। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ঢাকার অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। ব্র্যাক এবং ইউনিসেফ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, নারী ও শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা, ইউনিসেফ প্রতিনিধি এবং ব্র্যাকের কর্মকর্তাবৃন্দ। শিশু বিষয়ক সাংবাদিকদের নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক হিসেবে ওই মঞ্চে আমি তার পেছনের সারিতে বসে ছিলাম! তার বক্তৃতা দেয়ার কথা ছিলো ১০ মিনিট। কিন্তু তিনি বার বার সময় চেয়ে নিয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট কথা বলেছিলেন! তিনি আর কথা বলবেন না!

গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারী রেস্তঁরায় জঙ্গীদের হাতে জিম্মি নাগরিকদের উদ্ধারের প্রথম পর্যায়েই গুলি ও বোমায় নিহত হন তিনি। জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক ও শোকাবহ এই ঘটনায় যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন তাদের প্রত্যেকের পরিবারেই এখন শোকের মাতম। তাঁদের উদ্ধার করার জন্য আরেকটু সময় পেলে আরেকটু প্রস্তুতি নিয়ে আসতে পারলে হয়তো আরো অনেকেই বেঁচে ফিরতে পারতেন। ওসি সালাহ উদ্দিনের সংবেদনশীল মন হয়তো এই আপসোস নিয়েই চলে গেছে!
বনানী থানার অফিস সূত্রে জানা যায়, ওসি সালহউদ্দিন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অত্যন্ত সুনামের সাথে কাজ করেছেন। তিনি ২০০৩ সালে কসোভো এবং ২০০৭ সালে সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেন। সেখানে কর্মরত অবস্থায়ই তিনি শিশু সুরক্ষার ওপর প্রশিক্ষণ নেন। এছাড়াও তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। বনানী থানা সুত্র জানায়, শিশু সুরক্ষায় তাঁর বিশেষ মনোযোগের কারণেই বনানী থানায় শিশুদের জন্য ‘শিশু হেল্প ডেস্ক’ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে।
অনুষ্ঠানের দর্শক সারিতে ছিলেন কড়াইল বস্তিবাসী এবং স্থানীয় শিশু-কিশোররা। যারা আসলে মাতৃগর্ভ থেকেই নানান অবহেলা ও অযতেœ বেড়ে উঠেছে। যাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ঘটতে পারেনি উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে। সালাহদ্দিন বাল্যবিয়ের কুফল নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, বাল্য বিয়ের কারণে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপরও ব্যাপক প্রভাব পড়বে। বাল্যবিয়ের প্রভাবে এই প্রজন্ম এবং এর ভবিষ্যত প্রজন্ম শারিরীক ও মানসিক অপুষ্টি নিয়ে বড় হবে। যার প্রভাব পড়বে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে। সমাজে ও রাষ্ট্রে।
তিনি শিশু মনোবিজ্ঞান নিয়ে কথা বলেছিলেন। একটি শিশু কেন বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম নেয়, শিশুর মনোজগতে তৈরি হওয়া ক্রোধ এবং ঘৃণা তার পরবর্তী জীবনে কিভাবে প্রভাব ফেলে, কিভাবে মা-বাবার জীবনাচারণ সন্তানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, কেন একজন মানুষ নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় এসব বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য দেন সেদিন। তিনি শিশু অধিকার সুরক্ষায় সবাইকে অধিকার সচেতন করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

স্থানীয় অধিবাসী এবং কড়াইলে কর্মরত বিভিন্ন এনজিও’র কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানা যায়, এলাকায় কোন বাল্যবিয়ে বা শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে খবর পাওয়া মাত্র সেখানে উপস্থিত হতেন সালাহ উদ্দিন। অপরাধীদের সাজা দিতেন। ব্র্যাকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বাসসকে জানান, ওসি সালাহ উদ্দিন দায়িত্বরত অবস্থায় না থাকলেও যে কোন প্রয়োজনে তিনি ঘটনাস্থলে হাজির হতেন। ঐদিনের মেলার নিরাপত্তার জন্য তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মেলা চলাকালীন নিরাপত্তার দায়িত্ব দেন। তিনি এলাকার আইন-শৃংখলা রক্ষায় সর্বদা সজাগ থাকতেন। গতরাতের ঘটনায়ও তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন বিবেকের তাড়নায়। কিন্তু তার সজাগ দৃষ্টি থমকে গেছে সন্ত্রাসের নিষ্ঠুরতায়!
সালাহ উদ্দিন সহকর্মীদের প্রতিও ছিলেন দায়িত্বশীল। বনানী থানায় কর্মরত তাঁর সহকর্মীরা আজ শোকে মুহ্যমান। দায়িত্বরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাব ইন্সপেক্টর বাসসকে বলেন, “স্যার চলে গেছেন, আমার বুকের একটা পাজর ভেঙে গেছে! তিনি ছিলেন আমাদের মাথার ওপর ছায়ার মতো। তার কাছ থেকে নিজের বড় ভাইয়ের থেকেও বেশি ভালোবাসা পেয়েছি।”
লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, বাসস এবং আহ্বায়ক, শিশু বিষয়ক সাংবাদিকদের নেটওয়ার্ক




