শিরোনামশীর্ষ সংবাদ

শিশুদের অসুস্থতার কারণ মারাত্মক অপুষ্টি

ত্রিপুরা পল্লীতে চরম আতঙ্ক

সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরা পল্লীতে অজ্ঞাত রোগের কারণে বসবাসকারীদের মধ্যে চরম আতংক বিরাজ করছে। গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন করে আরো ৭ জন শিশু আক্রান্ত হওয়ায় তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এই রোগে এই পর্যন্ত ৫৩ জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং ৯ জন মারা গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালে ৪০ ও চমেক হাসপাতালে ১৩ জন চিকিত্সাধীন রয়েছে। মারাত্মক অপুষ্টির কারণে শিশুরা এই আক্রান্ত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা ধারণা করছেন।
বৃহস্পতিবার আক্রান্ত হওয়া শিশুরা হচ্ছে: সামান্ত ত্রিপুরার পুত্র গোপাল বাবু (৬), শান্ত কুমার ত্রিপুরার পুত্র মানিক কুমার ত্রিপুরা (৮) ও মানিরং ত্রিপুরা (১০), বাবুল ত্রিপুরার পুত্র রুমি ত্রিপুরা (৫), সুমন ত্রিপুরার পুত্র পারুল ত্রিপুরা (৪), সতী কুমার ত্রিপুরার পুত্র সম্মালক্ষ্মী ত্রিপুরা (৫) ও সুভাষ ত্রিপুরার পুত্র অজয় ত্রিপুরা (৩)। তারা সকলেই ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এসএম নুরুল করিম ইত্তেফাককে বলেন, ‘সকালে আরো কয়েকজন শিশু আক্রান্ত হয়েছে বলে খবর পেয়েছি। পরে অ্যাম্বুলেন্সে এনে এসব শিশুদের বিআইটিআইডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আক্রান্ত ত্রিপুরা পল্লীতে স্বাস্থ্যকর্মীরা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তাদের প্রাথমিক চিকিত্সা প্রদান করছেন। পল্লীতে পুষ্টিজাতীয় খাবার সরবরাহ করা হয়েছে।’
ঢাকা থেকে আসা আইইডিসিআর এর বিশেষজ্ঞ গতকাল বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং আক্রান্ত রোগী থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। রক্ত, প্রসাব, লালা, নাকের পানি সংগ্রহ করে তারা। পরে বিশেষজ্ঞ টীমটি চমেক হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রোগীদের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করেন। এছাড়া ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি’র তত্ত্বাবধানে রোগীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা ঢাকায় আলাদাভাবে পাঠানো হয়েছে। বিশিষ্ট চিকিত্সক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক এমএ ফয়েজ আইইডিসিআর টীমের সাথে ছিলেন। পরে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘এরা যেকোন সংক্রমণে অতি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। তারা দীর্ঘদিন যাবত রোগের জীবাণু বহন করছে। এটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক ব্যাধি। এসব শিশুরা মারাত্মক অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতায় ভুগছে। তাদের রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমে গেছে। রক্তের স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে হিমোগ্লোবিন অনেক কম। সংগ্রহ করা নমুনার উন্নত পরীক্ষার পর বিস্তারিত জানা যাবে । আক্রান্তদের পুষ্টিজাতীয় খাবার, অ্যান্টিবায়োটিক ও স্যালাইন দেয়া হচ্ছে।’
সীতাকুণ্ড উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের পাহাড়ে কয়েক যুগ ধরে ত্রিপুরা পরিবারগুলো বসবাস করছে। পাহাড়ে জঙ্গল পরিষ্কার ও জুমচাষ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। স্থানীয় লোকদের সাথে তাদের তেমন যোগাযোগ নেই। অসুস্থ হলে তারা কবিরাজী ও হোমিওপ্যাথিক চিকিত্সা নিয়ে থাকে। আধুনিক চিকিত্সা সেবার বাইরে রয়েছে এই জনগোষ্ঠী। জন্মের পর থেকে শিশুদের কোন টীকা দেয়া হয় না। চিকিত্সকরা ত্রিপুরা পল্লীতে বসবাসকারীদের সাথে কথা বলে জানতে পারেন চলতি মাসের শুরু থেকেই শিশুদের মধ্যে ভাইরাসজনিত রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি দেখা দেয়। পরে গত শুক্রবার স্থানীয় অমল নামে এক পল্লী চিকিত্সক ত্রিপুরা পল্লীতে রোগের প্রকোপ সম্পর্কে সীতাকুণ্ড স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জানালে বিষয়টি প্রকাশ পায়।
ইত্তেফাকের সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি জানান, ত্রিপুরা পল্লী এলাকায় বিশুদ্ধ পানির কোন ব্যবস্থা নেই। এলাকায় তিনটি গভীর নলকূপ থাকলেও দীর্ঘদিন যাবত এসব নলকূপ নষ্ট। তারা পাহাড়ের ছড়ার পানি পান করে। গতকাল স্থানীয় এমপি ও জেলা প্রশাসক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, নিহত ৯ শিশুর পরিবারের প্রত্যেককে সরকারিভাবে ১০ হাজার টাকা ও ১০ কেজি চাল এবং এমপি নিজস্ব তহবিল থেকে প্রতি পরিবারকে ৫ হাজার টাকা করে প্রদান করেছেন। সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী ইত্তেফাককে বলেন, আক্রান্তদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। আইইডিসিআর বিশেষজ্ঞ টিম নমুনাগুলো ঢাকায় ল্যাবে পরীক্ষা করবেন। রিপোর্ট পেতে ৫/৬ দিন সময় লাগবে।
সুত্র : ইত্তেফাক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button