
শিবগঞ্জ সংবাদদাতা: শিবগঞ্জের প্রায দুই শত বছরের পুরানো অতিরিক্ত খরশ্রোতের কারণে পাগলা নদী নামে খ্যাত নদীটি বর্তমানে ঐতিহ্য বিলীেনের পথে। নদীটি ভারতের মালদহ জেলার মহদিপুর নামক স্থান থেকে শুরু হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার শাহাবাজপুর ইউনিয়নের শেষ সীমানা দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কালিনগর ফাটাপাড়া নাম স্থানে শেষ হয়েছে।
নয়টি ব্রীজ থাকা ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাগলা নদীর তীরবর্তী এলাকা বেদখল হয়ে নদীর দুই তীরে শত শত বাড়িঘর বা দোকানপাট গড়ে উঠেছে ও দুই মাথা দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওযায় আগের মত নেই নদীর প্রখরতা, নেই শৈবার/দল(জলজ উদ্ভিদ),নেই নানা প্রজাতির মাছ। নেই পালতোলা নৌকা। নেই নদীর পানির কোন স্বচ্ছতা। নেই জেলেদের মাছ ধরার কোন ভীড়। সরজমিনে পাগলা নদীর তীরবর্তী এলাকা ঘুরে নদী তীরবর্তী বিভিন্ন পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে পাগলা নদীর জৌলুস হারানো বিভিন্ন কারণ। শ্যামপুর ইউনিয়নের বাজিতপুর গ্রামের জয়নাল আবেদন(৭০) জেলে আব্দুর রাজ্জাক, কফিল উদ্দিন,আলাউদ্দিন,জামাল উদ্দিন ও মজিবুর রহমান, হাসান আলি সহ পর্যন্ত সরজমিনে ঘুরার সময় প্রায় ৩০-৪০জন জেলে জানান আগে পাগলা নদীতে ফুয়াড়ী জাল,টাকজাল, ছিপ, চোঙ্গা, ডালি, দহি, হোচ্চা ইত্যাদি দিয়ে পিয়ালী,বায়াম, গুচি, সোল,গজার. চিংড়ী, বেলে,চাং প্রভৃতি মাছ ধরেছি। তখন নদীতে প্রচুর দল বা শৈবাল(জলজ উদ্ভিদ) থাকতো, আর সেই শৈবাল বা দলের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উৎপাদন হতো। কালের প্রবাহে দল বা শৈবাল বিলুপ্তির সাথে সাথে সে মাছও হারিয়ে গেছে।
একদিকে পদ্মা নদীর ভাঙ্গন রোধে বাঁধ নির্মান করায় পদ্মা নদীর সাথে পাগলা নদীর সংযোগ বন্ধ করে দেয়ায় বন্যার সময় পদ্মা নদীর পানি ও মাছ পাগলা নদীতে প্রবেশ করতে পারে না। তারা আরো জানান,শাহবাজপুর ইউনিয়নের শেষ সীমান্তে ভারত সরকার ভারত থেকে বয়ে আসা পাগলা নদীর মুখে বিশেষ কায়দায় পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়ায় সেদিক থেকেও পানি ও মাছ আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ পাগলা নদীর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিলুপ্তের অন্যতম কারণ হলো লাইলন সুতা দিযে,আড়কী জাল,ক্যাপা জাল, রিন জাল, ভুত জাল,টাকজাল,ফুয়াড়ী জাল করা তৈরী করে বিভিন্ন ধরনের জাল দিয়ে মাছ ধরায় মাছের পোণা পর্যন্ত জালে ধরা পড়া ও অপরিকল্পিতভাবে ২০২১ সালে পাগলী নদী খননে নদীর শৈবাল বা দলের বিলুপ্তি ঘটায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে নদীর ঐতিহ্য।
এ ব্যাপারে শ্যামপুর ইউপি চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক মো: রবিউল ইসলাম জানান. নদী খননের ফলে শৈবাল বা দল মাটির নিচে চাপা পড়ায় আর বাড়তে পারেনি। অন্যদিকে ক্যারেন্ট সূতা দিয়ে তৈরী বিভিন্ন ধরনের জালে মাছ ধরায় মাছের উৎপাদন দিন দিন কমে গেছে। তিনি পাগলা নদীর ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন। শিবগঞ্জ উপজেলা মৎস্য অফিসার সঞ্চয় কুমার জানান,নদীতে ক্যারন্ট জালে মাছ ধরা বন্ধ করতে ও নদীর তীর দখলমুক্ত করতে কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। কিছুটা সুফল পাওযা গেছে এবং বেদখল তীর অনেকটা দখল মুক্ত করা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবিন জানান শাহাবাজপুর ইউনিয়নের শেষ সীমানা হতে সদর উপজেলার কালিনগর খাটাপাড়া পর্যন্ত নয়পিট ব্রীজ থাকা ৪১কিলোমিটার দীর্ঘ পাগলা নদীকে জীবন্ত রাখা সকলের নৈতিক দায়িত্ব। নদীর সীমানা নির্ধারণ ও দখল মুক্ত করতে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে ২০১৯ সালে অভিযান চালিয়ে নদীর জমি কিছুটা দখল মুক্ত করেছে। ২০২১সালে নদী খনন করা হয়েছে। বর্তমানে নদীটি আর মৃত্যু নয়। পদ্মা নদীর সাথে সংযোগের ব্যাপারটা নিয়ে বিবেচনার বিষয় রয়েছে। কারণ এখানে নদী ভাঙ্গন রোধে এ বাধ নির্মাণ করা হয়েছে। পাগলা নদীতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারলে আবারো শৈবাল বা দল জন্ম নিবে এবং পুরাতন ঐতিহ্য ফিরে আসবে। তিনি আরো জানান শৈবাল বা জলজউদ্ভিদ বিলুপ্তির অন্যতম কারণ হলো নদীতে বাঁধ, সেতু বা খাল ভরাটের কারণে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া,নদীতে বর্জ, রাসায়নিক সার ফেলে নদীর পানিকে দূষিত তবে পাগলা নদীর ব্যাপারে আমরা একটি পরিকল্পনা তৈরীর জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। সে কমিটি যাচাই বাছাই করে পরিকল্পনাটি যদি ৫০ কোটির নীচে হয়,তাহলে সেটি ঢাকা প্রধান অফিসে পাঠাবে। প্রধান অফিসে অনুমোদনের পর পানি উন্নয়নের বিভিন্ন অফিস ঘুরে অনুমোদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনকরে পাগলা নদীর ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা হবে।



