আন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

লক্ষ্য মন্দা ঠেকানো : বিশ্বনেতাদের ৭ লাখ কোটি ডলারের পরিকল্পনা

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে আসন্ন মন্দা থেকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, চীন ও ভারত সরকার ৭ লাখ কোটি ডলারের (১ ডলার=প্রায় ৮৫ টাকা) বেশি খরচের পরিকল্পনা করেছে। এই খরচের পরিমাণ অভাবনীয় এবং এর পরিমাণ আরো বাড়বে বলেই ধারণা করা যায়। এর মধ্যে অর্থসাহায্য, ঋণ প্রদান, কর মওকুফ এবং দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নতুন নোট ছাপানোর মতো বিষয়ও রয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গত ১১ মার্চ করোনা ভাইরাসকে বিশ্বব্যাপী ছড়ানো মহামারি হিসেবে ঘোষণা দেয়। এরপরই বিশ্ব অর্থনীতি চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্যঝুঁকির চেয়েও করোনা ভাইরাসের অর্থনৈতিক বিপদ আরো বেশি। কেননা, এর কারণে যত মানুষ মারা যাবে, তার চেয়ে বেশি মানুষ দেউলিয়া হবে। কর্মসংস্থান হারাবে বহুসংখ্যক মানুষ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, বিশ্ব অর্থনীতি আবারও একটি মন্দায় ঢুকছে।
এরকম পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ নানা ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রে ২ ট্রিলিয়ন (২ লাখ কোটি) ডলারের বিল পাশ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পাশ হওয়া সবচেয়ে বড়ো অঙ্কের বিল এটি। মহামারিতে চাকরি হারানো কর্মী ও ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার জন্য এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস জানিয়েছে, ভ্যাকসিন গবেষণায় এরই মধ্যে ১১২ বিলিয়ন ডলার বেশি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশ হওয়া বিলে করোনা ভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প খাতে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং কয়েক লাখ মার্কিন পরিবারকে ৩ হাজার ডলার করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ৩৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সুবিধা, বেকার ভাতা হিসেবে ২৫০ বিলিয়ন ডলার এবং হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য খাতে অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থসহায়তা দেওয়া হবে।
করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় যুক্তরাজ্য সরকার ঋণ নিশ্চয়তা ও স্থানীয় ব্যবসায় কর স্থগিতের মাধ্যমে ৩৩০ বিলিয়ন ডলার খরচের পরিকল্পনা নিয়েছে। এছাড়া মাসে ২ হাজার ৯০০ ডলার পর্যন্ত বেতন পাওয়া কর্মীদের আগামী তিন মাস তাদের বেতনের ৮০ ভাগ সরকারের তরফ থেকে বহন করা হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সব মিলিয়ে কত খরচ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এছাড়া ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বলেছে, প্রতিষ্ঠানটি তাদের হাতে থাকা যুক্তরাজ্য সরকার ও করপোরেট বন্ডের পরিমাণ ২৪২ বিলিয়ন ডলার বাড়াবে। করোনা ভাইরাসের কারণে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে উদ্ধারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে।
জার্মান সরকার ৮২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্যে ঋণ প্রদানসহ সরাসরি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অংশীদার হওয়ার বিষয়ও রয়েছে। ফরাসি সরকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বেকার কর্মীদের ৫০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এছাড়া দেশটি করপোরেট ঋণগ্রহীতাদের জন্য ৩৩০ বিলিয়ন ডলারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। ইতালি নিজের দেশের শ্রমিকদের এবং স্বাস্থ্য খাতে ২৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের কথা জানিয়েছে। স্পেনও ২২০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৮২৪ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা বলেছে, যা দিয়ে সংস্থাভুক্ত দেশগুলোকে ঋণের সুবিধা দেওয়া হবে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো এশিয়ার চীন, জাপান ও ভারত অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। চীন এখন পর্যন্ত ১৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থ-সহায়তা ঘোষণা করেছে, এর মধ্যে কর ও শুল্ক কমানোর বিষয় রয়েছে। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রয়োজন হলে এরকম আরো ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পিপলস ব্যাংক চীনা এরই মধ্যে ১৬২ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ঋণ সহজীকরণের কথা জানিয়েছে।
জাপান সরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নগদ সহায়তাসহ বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আর্থিক মূল্য হতে পারে প্রায় ২৭৪ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ব্যাংক অব জাপান এরই মধ্যে আবাসনসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে লকডাউন ঘোষণার ৩৬ ঘণ্টা পর ২২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসা, খাদ্য-সহায়তাসহ শ্রমিকদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিষয় রয়েছে।
৫ ট্রিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি জি-২০ নেতাদের: করোনা ভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির মোকাবিলা এবং যে কোনো মূল্যে কোভিড-১৯-এর বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়াতে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ২০ অর্থনীতির দেশের নেতারা। বৃহস্পতিবার দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা প্রাণঘাতী নোভেল করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় জি-২০-এর পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা ঠিক করতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এক জরুরি সম্মেলনে যোগ দেন।
সৌদি বাদশা সালমানের সভাপতিত্বে সম্মেলনে তারা ভাইরাসটির বিস্তৃতি রুখতে কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নির্মাণ এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের বিনিয়োগ করারও আশ্বাস দিয়েছেন। ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সর্বশেষ জি-২০ নেতাদের এমন ঐক্যবদ্ধ দেখা গিয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হওয়া প্রায় সব জি-২০ সম্মেলনেই সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বিষয়ে যে মতবিরোধ দেখা যাচ্ছিল, বৃহস্পতিবারের বিবৃতিতে তা ছিল একেবারেই অনুপস্থিত। সূত্র : সিএনএন, বিবিসি, রয়টার্স

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button