রংপুর নগরীতে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ছাদ বাগন

আব্দুর রহমান রাসেল,রংপুর ব্যুরো: রংপুর মহানগরীতে চাষের জায়গার অভাব থাকায় বাড়ির মালিকরা ছাদেই বাগান গড়ে তুলেছেন। রংপুর শহরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ছাদ বাগান। রংপুরের রেজিনা সাফরীন শখ করে নিজের ৩ হাজার স্কয়ার ফিট ছাদে বাহারি আমসহ নানা প্রজাতির গাছে ভরে রেখেছে। তার এই ছাদ বাগানটি দেখতে প্রতিনিয়ত আসছে গাছ প্রেমিরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, ছাদ বাগানগুলো শহরের পরিবেশটা আরও সুন্দর করে তুলছে।
পাঁচ বছর আগে বিদেশি জাতের একটি আমগাছ দিয়ে ছাদবাগান শুরু করেন রেজিনা সাফরীন। ইন্দোনেশিয়ার ‘কিং অব চাকাপাত’ নামের ওই গাছটি পেতে তাকে গুনতে হয় চার হাজার টাকা। শখ-সাধ্য আর পছন্দকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে মুকুলসহ আম গাছটি কিনে বিপাকে পড়েন তিনি। কারণ বেশি দামি গাছ কেনায় পরিবারের লোকজন তাকে নিয়ে হাসাহাসি করেন। কিন্তু বছর না যেতেই কিং অব চাকাপাত গাছের ফলনে সবার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। চার হাজারে কেনা গাছটিতে প্রায় আধা মণ আম ধরে। যার মূল্য ছিল ২০ হাজার টাকার উপরে। এরপর আর থেমে থাকেননি তিনি।
নগরীতে মাটির অস্তিত্ব দিন দিন কমে আসছে। হারিয়ে যাচ্ছে খোলামেলা জায়গা। আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে ছেয়ে গেছে শহর৷ ইট-কাঠের বদলে দ্রুতই বৃদ্ধি পাচ্ছে ইস্পাতের কাঠামো ও কাচে মোড়ানো বহুতল ভবন।কিছু নির্দিষ্ট এলাকার তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় সামান্য বেড়ে যায় এবং শহরজুড়ে তৈরি হয় অসংখ্য হিট আইল্যান্ড বা তাপ দ্বীপ।
সফল ছাদবাগানি রেজিনা সাফরীন বলেন, শুরুতে পরিবার থেকে ছাদে বাগান গড়তে অনীহা থাকলেও পরে আমার স্বামী ও সন্তানরা উৎসাহ জুগিয়েছেন। এরপর থেকেই শুরু হলো ছাদ বাগান। ছাদ বাগানে এসে অবসর সময় কাঠছে। পাশাপাশি পরিবেশ সুন্দর হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন,আমার প্রায় নয় শতাংশ জমির উপর নির্মিত পাঁচতলা ভবনের ছাদে থাকা বাগানটির আয়তন ৩ হাজার স্কয়ার ফিট। স্বল্প খরচে দেশি-বিদেশি গাছের চারা দিয়ে ছাদবাগানটি সুন্দর করে সাজিয়েছি। এই বাগান দেখতে প্রতিবেশীদের পাশাপাশি অনেক দর্শনার্থীরাও প্রতিনিয়ত আসছেন। আমার খুর ভারো লাগছে । আমার ছাদ বাগান দেখে অনেকেই নতুন করে শুরু করেছে।
দমদমা কলাবাড়ি থেকে দেখতে আসা দর্শনার্থী ফয়ছাল আহম্মেদ পলাশ বলেন, আমি বিভিন্ন বই প্রস্তুকে পড়েছি ছাদ বাগানের কথা। আজ বাস্তবে এই ছাদ বাগান দেখে অনেক ভালো লাগছে। আমি নিজেই পরিত্যাক্ত জায়গায় বিভিন্ন প্রজাতির ফল চাষ আবাদ করব। এতে করে আমার পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করতে পারবো।
রংপুরের পীরগাছা থেকে আসা মোহাম্মদ আলী বলেন, আমরা টিভিতে দেখেছি ছাদ বাগানের গল্প। আজ বাস্তবে দেখলাম খুব সুন্দর লাগছে।
রংপুর মহানগরীর মগলের বাগ শান্তি পাড়া থেকে দেখতে আসা তৈয়বুর রহমান বলেন, এই সিটি শহরে চাষ আবাদ করার তেমন কোন জমিজমা নাই। অল্প জমিতে সল্প সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির ফল গাছ ও সবজি চাষ আবাদ করতে হয়। আজকে এই ছাদ বাগানে এসে ফলের গাছ ও সবজির চাষ আবাদ দেখে মনে হচ্ছে আমরাও নিজের ছাদে কৃষি চাষ আবাদ করব।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর উপপরিচালক, কৃষিবিদ মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল বলেন,নগর ভবনে ফলের গাছ ও সবজির চাষাবাদ করার কোনো জায়গা থাকে না। বাড়ির ছাদে বাগান করে নিজেদের পুষ্টির চাহিদা মেটাচ্ছেন। পাশাপাশি তাদের অবসর সময়ও কাজে লাগাচ্ছেন। বাড়ির ছাদে বাগান গড়ে তোলায় প্রকৃতিতে পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে। রংপুর জেলা শহর ও উপজেলা শহরের ছাদ বাগান বাড়তে শুরু করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে ছাদবাগান সম্প্রসারণে বাগানিদের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হবে। এখন পর্যন্ত কোন প্রকল্প নেই, তবে ছাদ বাগানের প্রকল্পের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়ে।
রংপুর শহরের অধিক জনসংখ্যা, অতিরিক্ত নগরায়ন, যানবাহন, জলাধার ও গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে পরিবেশ দূষণ বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় অনেক বেশি।
আগে ছাদবাগানের গুরুত্ব কম ছিল। তবে এখন প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ ছাদবাগানের দিকে ঝুঁকছে। একটা সময় বাড়ির ছাদে কিংবা ব্যালকনিতে গাছ লাগানো শখ মনে করতেন অনেকে। শহরের অভিজাত এলাকাগুলোতে বাড়ির ছাদে, বাসার ব্যালকনিতে ফুল, ফলের গাছ দেখা যেতো। তবে খুশির খবর হলো, এখন রংপুরে আবাসিক কিংবা বাণিজ্যিক ভবনগুলোতে গাছ দেখা যাচ্ছে৷ দিন দিন এর পরিমাণ বাড়ছে।
আজ সোমরাব সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রেজিনা সাফরীনের ছাদবাগানে রয়েছে- ইন্দোনেশিয়ার কিং অব চাকাপাত ম্যাংগো, থাইল্যান্ডের মহিলিসা ম্যাংগো, আপেল ম্যাংগোসহ বিভিন্ন দেশের ১৮ প্রজাতীর আমসহ অনেক গাছ। আমাদের দেশে ছাদকৃষি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রংপুরে ছাদকৃষি দিন দিন বাড়ছে। ছাদে এখন শুধু ফুল বা বাহারি গাছ নয়, শাক-সবজি, ফলমূল সবই চাষ করা হচ্ছে। শুধু রাজধানী নয় বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শহরে বাড়ির ছাদে বাগান করা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। অধিকাংশ বাড়ির ছাদের দিকে তাকালেই বিভিন্ন ধরনের বাগান দেখা যায়। ছাদ কৃষির প্রতি নগরবাসীর আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বহুমাত্রিক সুবিধা ও সাফল্যের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।




