বিবিধশিরোনাম

যৌন শিক্ষা প্রকল্পে যা পড়ানো হচ্ছে ক্লাস রুমে

বাংলাদেশের সামাজিক ব্যবস্থায় পরিবারসহ প্রায় সকল স্থানে মাসিক, স্বপ্নদোষ, কনডম ইত্যাদি শব্দকে নিষিদ্ধ জ্ঞান করা হয়। ঠিক এর উল্টো চিত্র দেখা গেল ঢাকার বিমানবন্দরের কাছে আশকোনা এলাকার একটি বিদ্যালয়ে। সেখানে শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমেই এসব শব্দ নিয়ে অবলীলায় আলোচনা করছে। বিবিসি এমন খবর প্রকাশ করে।
এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বয়ঃসন্ধিকালীন এসব অবশ্যম্ভাবী ইস্যুগুলো সম্পর্কে জানছে। তারা শিখছে প্রজননস্বাস্থ্যের নানা দিক। তারা যৌনবাহিত এবং যৌনাঙ্গবাহিত রোগ সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছে। শিখছে এসব রোগ থেকে দূরে থাকার উপায়।
এই শিক্ষার অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণের জন্য তারা নানা রকম কম্পিউটার গেম এবং লুডো ও মনোপলির মতো দুটি বোর্ড গেমের সাহায্য নিচ্ছে । সেই সাথে রয়েছে ক্লাস লেকচার।
আশকোনার বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কিশোর কিশোরী কর্নারে প্রদিবেদক যেদিন যায়, সেদিন তাদের পড়ানো হচ্ছিল বাল্যবিবাহ নিয়ে। শিক্ষার্থীরা বাল্যবিবাহ নিরোধ নিয়ে একটি নাটিকার মহড়া করছে।
বিদ্যালয়টির একটি বিশেষ শ্রেণীকক্ষে গত ৫ বছর ধরে বিদ্যালয়টিতে এসব শিখছে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা। কোর্সটি অনেকটা পশ্চিমা দেশগুলোর বিদ্যালয়ে পড়ানো সেক্স এডুকেশন বা যৌন শিক্ষার আদলে সাজানো। যদিও সংশ্লিষ্টরা এই কোর্সকে যৌন শিক্ষা বলতে নারাজ।
বাংলাদেশ সরকারের ‘জেনারেশন ব্রেকথ্রু’ নামের একটি প্রকল্পের আওতায় এই শ্রেণীকক্ষটি তৈরি হয়েছে। কক্ষটির নাম দেয়া হয়েছে ‘কিশোর কিশোরী কর্নার’। আর এখানে তারা পড়ছে ‘জেমস’ নামে একটি কোর্স যেটির পূর্ণরূপ দাঁড়ায় ‘জেন্ডার ইকুয়িটি মুভমেন্ট ইন স্কুলস’।
এই কোর্সটি সাজানো হয়েছে ‘আমার জেমস ডায়েরি’ নামের একটি বই, সাতটি কম্পিউটার গেমস, দুটি বোর্ড গেম, একটি এনিমেশন ভিডিও আর একশোটি পর্বের রেডিও ধারাবাহিক দিয়ে। আর শ্রেণীকক্ষে পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
দুই বছরের এই কোর্সে যোগ দেয়া সকল শিক্ষার্থীরা জেন্ডার সমতা, বাল্যবিবাহ, মাসিক রজঃস্রাব,স্বপ্নদোষ, বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন,শারীরিক ও যৌন সহিংসতা, যৌনবাহিত রোগ, জননাঙ্গবাহিত রোগ সম্পর্কে জানতে পরছে।
জেনারেশন ব্রেকথ্রু সম্পর্কে কর্মকর্তারা বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যালয়গুলোতে যৌনশিক্ষা দেবার চেষ্টা বহু বছর থেকেই করা হচ্ছে, কিন্তু যৌন বিষয় নিয়ে সামাজিক ট্যাবুর কারণে কখনো এটা সফল করা যায়নি।
এমনকি পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষা বিষয়ক অধ্যায় জুড়ে দেবার পরেও দেখা গেছে শ্রেণীকক্ষে সেসব অধ্যায় শিক্ষকেরা পড়াচ্ছেন না। শিক্ষার্থীদেরকে বাড়িতে গিয়ে এসব অধ্যায় পড়বার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। আবার অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে অভিভাবকেরা বইয়ের সেসব অধ্যায় স্টাপলিং করে আটকে দিচ্ছে, যেন অধ্যায়গুলো শিক্ষার্থীদের নজরে না পড়ে।
বাংলাদেশের চারটি জেলার তিনশো ৫০টি বিদ্যালয়ে বিদেশী দাতাদের অর্থায়নে ২০১৪ সালে যখন ৫ বছর মেয়াদী জেনারেশন ব্রেকথ্রু প্রকল্পটি শুরু হয়। এসময় তারা এই ট্যাবুর বিষয়টি মাথায় রেখেছিলেন।
প্রকল্পটির পরিচালক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলছেন, প্রকল্পটি শুরু করতে গিয়ে স্কুলগুলো থেকে বাধা আসবে বলে আশঙ্কা করেছিলেন। কিন্তু বাধা যতটুকু এসেছে তা ঢাকার বিদ্যালয়গুলো থেকে। গ্রামের বিদ্যালয় গুলো থেকে কোন বাধা আসেনি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা কোর্সটিকে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেছে। এমনকি প্রকল্পে যে ৫০টি মাদ্রাসাকে যুক্ত করা হয়েছিল, সেখান থেকে এসেছিল অভূতপূর্ব ইতিবাচক সাড়া।
এ বিষয়ে ড. হোসেন বলেন, ‘বাস্তবে দেখা গেল মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকেরা এ বিষয়ে অনেক অগ্রসর’।
প্রকল্পের মেয়াদের পাঁচ বছর শেষে এসে দেখা যায়, যে বিদ্যালয় গুলোতে এই বিষয়টি পড়ানো হচ্ছে সেখানকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে যেসব বিদ্যালয়ে এই বিষয়টি পড়ানো হয় না, সেখানকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক ছাত্র বলেন, ‘আমার অন্যান্য স্কুলের যেসব বন্ধু আছে তারা এইসব শব্দ শুনলে অনেক লজ্জা পায়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আর এসব হয় না।’
অষ্টম শ্রেণীর একজন ছাত্রী বলেছিল, ‘প্রথম প্রথম আমি নিজেও এইসব ব্যাপারে অনেক সংকীর্ণ ছিলাম। যেসব বিষয় আমি আমার মা কিংবা বন্ধুদেরকে বলতে পারতাম না, পরামর্শ চাইতে পারতাম না, এখন অবলীলায় তা পারি।’
সপ্তম শ্রেণীর আরেক ছাত্রী বলেন, ‘জেমস ক্লাস করবার পর আমরা অনেক বেশী ফ্রি হয়ে গেছি।’
যেসব শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই জেনারেশন ব্রেকথ্রুর ক্লাসরুমে পাঠানো হয়েছিল, তারাও শুরুর দিকে জড়সড় হয়ে থাকতেন।
অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এ নিয়ে বিদ্যালয়টির শিক্ষিকা মঞ্জুয়ারা খাতুন বলেন, ‘আমাদের নিজেদের ভেতরেই একটা জড়তা ছিল। সেই জড়তা কাটিয়ে উঠতে আমাদের কিন্তু সময় লেগেছে। সেক্স বিষয়ক কোন শব্দ আলোচনায় এলে বাচ্চার লজ্জা পেত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরো উলটে গেছে।’
২০০১৮ সালের সাথে সাথে জেনারেশন ব্রেকথ্রু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। যদিও অনেক বিদ্যালয়ে কোর্সটি পড়ানো অব্যাহত আছে, বিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে দাতা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের যোগাযোগ বন্ধ হয়নি, কিন্তু কাগজে কলমে প্রকল্পটি শেষ।
যৌন শিক্ষা প্রদানের নতুন এই পদ্ধতিটি বন্ধ হওয়া নিয়ে ড. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, তারা অচিরেই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন। সেখানে বিদ্যমান সাড়ে তিনশো বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হবে আরো দুশোটি বিদ্যালয়। আর পর্যায়ক্রমে এই কোর্সটিকে অবশ্যপাঠ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের সব বিদ্যালয়ে, অবশ্য এখন পর্যন্ত এর সবই রয়েছে আলোচনা পর্যায়ে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button