
মতিউর রহমান, মানিকগঞ্জ : ৭৫ উর্ধ্ব আবুল কালাম আজাদ এক সময় ছিলেন যাত্রা দলের তবলা বাদক। গলার কন্ঠের সুরও মায়াবি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রায় সকল গান অবিকল রপ্ত করেছেন। ভাগ্যে নির্মম পরিহাসে টানা ৩০ বছর যাত্রা শিল্পের সাথে জড়িত থাকার পর আজ সে কুলির কাজ করছেন। দেশে করোনা ভাইরাসের কারনে এখন অনেকের মতো কর্মহীন হয়ে পরেছে। করোনার প্রভাবে দিন আনে দিন খাওয়া আজাদ পরেছেন মহাবিপাকে। স্ত্রী অন্যের বাড়ী ঝিয়ের কাজ করতে। দুজনের যা আয় হতো এই দিয়ে দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে সাইফুল ইসলাম বকুল মানিকগঞ্জ সরকারী দেবেন্দ্র কলেজে অনার্সে পড়াচ্ছেন। আর ছোট ছেলে শরীফুল ইসলাম স্থানীয় জয়রা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০ম শ্রেণীতে পড়ছে। করোনার কারনে বাড়ী ওয়ালারা ঝুকি এড়াতে আপাতত আসতে বারন করেছে। দুজনেরই আয়ের পথ বন্ধ। বড় ছেলে বাবা মায়ের কষ্ট লাঘব করতে বাড়ী বাড়ী গিয়ে টিউশনী করাতেন । সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় সংসার চালানো হিমশিম খাচ্ছেন পঁচাত্তর বয়সি আবুল কালাম আজাদ। এপর্যন্ত সরকারি ভাবে মাত্র একদিন খাদ্য সহযোগীতা পেয়েছেন। পৌরসভার মানরা এলাকায় দুই হাজার টাকায় এক টিনের ঘরে ভাড়া থাকেন আজাদের পরিবার। মঙ্গলবার বেলা তখন দুপুর একটা। মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের তিন তলায় নিউজ রুমে বসে কাজ করছিলাম। প্রেসক্লাবের ষ্টিলের প্যাচানো সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতলার সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মাথা নীঁচু করে দাঁড়িয়ে আমার ও অন্য দুই সহকর্মীর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। করোনার থেকে সুরক্ষায় মুখে মাস্ক পড়া ছিল তার। এমন অবস্থায় তার নাম জিজ্ঞাস করতেই বললেন আবুল কালাম আজাদ। বিভিন্ন সময় কুলির কাজের ফাঁকে ফাঁকে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে গান গাইতেন। কন্ঠ তার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো সুর। সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে গাইতে থাকলেন এক পর্যায়ে অত্যন্ত বিনয়ের মাথা নীচু করে বললেন, স্যার খুব কষ্টে আছি।
জিজ্ঞেস করতেই, তিনি তাঁর ও তার পরিবার সম্পর্কে ওই সব তথ্য জানালেন। বয়স ৭৫ ছাড়িয়েছে। আদি বাড়ি পাবনা জেলায়। গত ২০ বছর ধরে তিনি মানিকগঞ্জে থাকেন,ভোটাও হয়েছেন। জেলা শহরের জয়রা এলাকায় ২ হাজার টাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। জেলা শহরের সব দোকান পাট অফিস আদালত বন্ধ। সাংবাদিকদের অফিস খোলা আছে তাই তিনি খুব আশা করে এসেছেন। যদি কিছু খাদ্য সহায়তা পাওয়া যায়। এই বলেই শোনাতে লাগলেন হেমন্তের সেই হৃদয় ছোঁয়া গান “আমার মতো এতো সুখি নয়তো কারো জীবন। এ আদর-স্নেহ ভালোবাসা জড়ানো মায়ার বাঁধন। জানি এ বাঁধন ছিঁরে গেলে আসবে আমার মরণ ! বুকে ধরে যত ফুল ফুটালাম, সে ফুলে কাঁটা ছাড়া কি পেলাম…., ভাগ্যর পরিহাস….. , নিয়তির কাছে বারবার হেরে যায় মানুষ এমন! “আমার মতো এতো সুখি নয়তো কারো জীবন !
আমরা সংবাদ কর্মীরা যে, কতখানি ঝুঁকি, সংকট আর সীমাবদ্ধতা নিয়ে চলছি তা নিশ্চয়ই তিনি জানবেন না। কি আর করা পকেট থেকে একশত টাকা দেওয়ার পাশিপাশি প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে কর্মহীন মানুষের জন্য রাখা দুটি প্যাকেট তার হাতে তুলে দেওয়া হলো। যার একটি প্যাকেটে আছে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, তেলসহ ১০কেজি এবং অন্য প্যাকেটে আছে ৫ কেজি আটা ও ১ কেজি চিনি।
প্যাকেট দুটি তাঁর হাতে যখন তুলে দিতেই তিনি কিছুক্ষণ তাঁকিয়ে রইলেন । বললেন এই দিয়ে তার চার সদস্যের পরিবারে কয়েকদিন চলবে।




