sliderস্থানিয়

মুরগীর মাংস না খেয়েই পার করলেন ৫৪ বছর শহীদ জসীমউদ্দীনের স্ত্রী জোহরুন নেশা

শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা: মুরগির গোস্ত তখন চুলার উপরে রান্না করছিলাম । এমন সময় হঠাৎ করে কয়েকজন পাক বাহিনী পন্থী দেশীয় কযেকজন রাজাকার আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করেই আমার স্বামীকে ধরে নিযে যায়। তারা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আমার স্বামীকে আর ফিরে পাইনি। পরে লোক মুখে শুনি আমার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তারপর থেকে ৫৪ বছর যাবত আমি কোন দিন মুরগির গোস্ত খাইনা।

এভাবেই কান্না জড়িত কন্ঠে কথাগুলো বলছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের প্রাক্কালে স্বামীহারা ৮৫ বছর বয়স্ক শহীদ জসীম উদ্দীনের স্ত্রী জোহরুন নেশা। তিনি জানান, ১৯৭১ সালে ১৩ ডিসেম্বর সোমবার দুপুরে আমি রান্না করছিলাম এবং আমার স্বামী গলিতে গরুকে শানি (গরুর খাওয়ার) দিচ্ছিলো। এ সময় পাকিস্থান পন্থী ৫-৬ জন রাজাকার এসে আমার স্বামী জসীমউদ্দীন ও আমার ভাসুর ফজলুর রহমানকে ধরে নিয়ে যায়। ওই সময় আমরা আমার স্বামী ও ভাসুরকে ছাড়ানোর জন্য কান্নাকাটি করলে তারা আমি ও আমার পরিবারকে গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। শুধু তাই নয়, আমার স্বামীকে ধরে নিযে যাওয়ার পরেও তারা বেশ কযেকবার বাড়িতে এসে হুমকি দিযে যয়, যে যদি কান্নাকাটি করি তাহলে আমি সহ আমার পরিবারের সকল সদস্যকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। তারপর আমি ও আমার ছেলে আব্দুস সোবহান মধুকে নিয়ে অনেকের সাথে যোগাযোগ করেও কোন লাভ হয়নি।

পরের দিন মঙ্গলবার সকালে লোকমুখে জানতে পারি আমার স্বামী,ভাসুর ও প্রতিবেশী কালুসহ আরও বেশ কয়েকজনকে হুমায়ুন রেজা হাই স্কুলের দক্ষিণ পাশে গুলি করে মেরে ফেলেছে। হত্যার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান যে, লোকমুখে শুনেছি বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে এ অবস্থাটা বুঝতে পেরে সারাদেশে বুদ্ধিজীবী এবং স্বাধীনতা পন্থীদের হত্যার পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদেরকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, আমার স্বামী শহীদ হওয়ার পর ১৯৭৩ সালের নভেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে সমবেদনা জানিয়ে একটি চিঠি ও ১০০০ টাকা অনুদান দিয়েছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমা প্রশাসকের মাধ্যমে। এরপর আর কেউ কোনদিন আমাদের খোঁজ নেযনি। যেহেতু স্বামীকে হারিযেছি । সেহেতু আর কারো সহানুভুতির প্রযোজন মনে না করে বুকে পাথর দিযে পার করলাম ৫৪টি বছর। মুরগীর মাংস খাওযাতো দুরের কথা,মুরগীর মাংস দেখলে আমার গা শিহরিযা উঠে এবং পাকবাহিনীর প্রতি আক্ষেপ ও ঘৃন্য হয়। তাই যতদিন বেঁচে আছি ততদিনই আমি মুরগীর মাংস খাবো না। কিন্তু করার কিছু নেই। শুধু দেশবাসীর কাছে আমার স্বামীর জন্য দোয়া চাই।

শহীদ জসিম উদ্দিন এর ছোট ছেলে শহিদুল ইসলাম সাধু কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, আমার বাবাকে আমি দেখিনি তখন সদ্য শিশু ছিলাম। কোন কিছু মনে করতে পারি না। তবে আমি আমার মায়ের মুখ থেকে সব কথা শুনেছি। আমার বাবা ছিলেন একজন ব্যাবসায়ী ও কৃষি কাজও করতেন, চাওযাা পাওয়ার কোন হিসাব মিলাতে যাই না তবে আমার বাবা আমাদের মাতৃভূমির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এটাই আমাদের গর্ব।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button