sliderজাতীয়শিরোনাম

মুক্তিযুদ্ধ-জনযুদ্ধের কিংবদন্তী নায়ক ওয়াহিদুর রহমানের জীবনাবসান

আহমাদ ইশতিয়াক : মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় কিংবদন্তী ওহিদুর বাহিনীর অধিনায়ক ওহিদুর রহমান আজ সকালে চলে গেলেন। একটু আগে ওহিদুর বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা ভুলু ভাই ফোনে খবরটি জানালেন।
.
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম সংগঠকদের একজন ছিলেন নওগাঁর আত্রাইয়ের ওহিদুর রহমান। যিনি নওগাঁ, রাজশাহী ও নাটোরের বিস্তৃত এক অঞ্চল জুড়ে ২ হাজারেরও বেশী মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বিশাল এক বাহিনী তৈরী করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে উঠা বাহিনীটি পরবর্তীতে ওহিদুর বাহিনী নামে পরিচিত পেয়েছিল।
.
ওহিদুর বাহিনীর বিস্তৃতি ছিল ৪টি জেলার ১৪টি থানা জুড়ে। এই বাহিনী এতোটা বড় অঞ্চল জুড়ে যুদ্ধ করেছিল যে এই যুদ্ধাঞ্চলের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে আত্রাই, ছোট যমুনা, ফক্কিনী, খাজুরা ও নাগর সহ ৬টি নদী ও চলন বিল সহ ১৩টি বিল।
.
মুক্তিযুদ্ধের সময় ওহিদুর বাহিনীর চলাচল ছিল জলপথে। রাজশাহী নওগাঁর মানুষ তাঁর নৌকার বহরকে বলতো ‘ওহিদুরের বায়ান্ন ডিঙ্গি’। মুক্তিযুদ্ধের ৬ সেপ্টেম্বর আত্রাইয়ের সাহাগোলা ব্রিজ ধ্বংস করেছিলেন ওহিদুর বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা। সেই অপারেশনের ১০৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছিলো।
.
মুক্তিযুদ্ধের ১৯ সেপ্টেম্বর আত্রাইয়ের তারানগর বাউল্লায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি নৌকার বহরে অতর্কিত আক্রমন চালিয়ে ১৫০ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছিল ওহিদুর বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা। এই দুটি অপারেশন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত অপারেশনগুলোর মধ্যে অন্যতম।
.
মুক্তিযুদ্ধের আগে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা ছিলেন ওহিদুর রহমান। একাত্তরের পহেলা জানুয়ারি পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি ভারতের নকশাল নেতা চারু মজুমদারের রাজনৈতিক ও সামরিক লাইনকে পার্টিকে গ্রহণ করেছিল। কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় কমরেড আবুল বাশারের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল।
.
সেসময় ওহিদুর রহমান সেই বক্তব্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে মওলানা ভাসানী নৌকাযোগে ওহিদুর রহমানের আত্রাইয়ের বাড়িতে এসে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বললেন।
.
ওহিদুর রহমান পূর্বে কৃষক আন্দোলন ও কৃষক সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁর প্রচুর কর্মী-সমর্থক ছিল। ওহিদুর রহমান তখন স্থানীয় ভবানীপুর বাজারে সভা ডাকেন । সেই সভায় ওহিদুর রহমানের দুই হাজারেরও বেশী কর্মী সমর্থকদের সামনে বক্তব্য দিয়েছিলেন ভাসানী। বলেছিলেন ‘যুদ্ধ বাদে দ্বিতীয় কোন রাস্তা নেই।’
.
প্রাথমিকভাবে ওহিদুর বাহিনীতে কৃষক ও নেতাকর্মীরা যোগ দিলেও একপর্যায়ে ছুটিতে থাকা ও পালিয়ে আসা বাঙালি সেনা, পুলিশ, ইপিআর সদস্য সহ ছাত্র-যুবক-শ্রমিক সহ সর্বস্তরের মানুষ ওহিদুর বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন।।
.
‘মুক্তিযুদ্ধে ওহিদুর বাহিনীর স্থায়ী কোন হেডকোয়ার্টারও ছিলোনা। তবে কয়েকটি অস্থায়ী হেডকোয়ার্টার ছিল। বিশাল বিল হালতির মধ্যে থাকা খোলাবাড়িয়া গ্রাম ছিল তেমনই একটি ঘাঁটি। এছাড়া ঝিকরা, মিরাট, হাঁসাইগাড়িতেও তাঁদের অস্থায়ী ঘাঁটি ছিল। কোন এক জায়গায় অপারেশনের খবর পেলেই ছুটতো ওহিদুরের নৌকার বহর।

ওহিদুর বাহিনীর প্রধান সহকারী কমান্ডার ছিলেন আলমগীর কবির। পরবর্তীতে বিএনপি আমলে তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন।
.
যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারেরা ওহিদুর রহমানের আত্রাইয়ের পৈত্রিক ভিটে পুড়িয়ে দিয়েছিল। তবে তাঁদের নওগাঁ শহরের বাড়ির লুটপাট হলেও পুড়িয়ে দেয়নি।
.
মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় ধরে কমিউনিস্ট রাজনীতি করেছিলেন ওহিদুর রহমান। একপর্যায়ে নওগাঁর মানুষ চেয়েছিলো এই মানুষটি অন্তত একবার সংসদ সদস্য যেন নির্বাচিত হয়। অন্তত তিনি নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নতি হবে। কিন্তু প্রথমে তিনি রাজি হননি। একপর্যায়ে স্থানীয়দের জোরাজুরিতে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাঁকে মনোনয়ন দেয়নি। পরে আত্রাইয়ের মানুষ নিজেরাই গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে স্বেচ্ছায় চাঁদা তুলে, হাটে বাজারে পয়সা তুলে তাঁকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করেছিল।
.
ভোটের ফলাফলে দেখা গিয়েছিল ওহিদুর রহমান মোট ৮৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। এতোটাই জনপ্রিয়তা ছিলো তাঁর। সংসদ সদস্য হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু আজীবন প্রচণ্ড নির্লোভ আর সৎ ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই সততা ধরে রেখেছিলেন।
.
এলাকার সংসদ হওয়া সত্ত্বেও একটা পয়সা নিজের জন্য ব্যয় করেননি। উল্টো নিজের পৈত্রিক জমি বিক্রি করে এলাকায় রাস্তাঘাট, স্কুল করেছেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় যে বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানিরা সেখানে একটা বাড়ি করার মত অর্থও যোগাড় করতে পারেননি তিনি।
.
নওগাঁয় বসবাস করতেন পৈত্রিক বাড়িতে। আর গ্রামের বাড়িতে গেলে থাকতেন চাচাতো, জেঠাতো ভাইদের বাড়িতে। এই অবস্থায় দেখে লজ্জায় পড়ে যেত খোদ মুক্তিযোদ্ধারাই। তাঁর সাফ জবাব ঘর করার মত আমার কাছে টাকা নেই। কিন্তু কেউ করে দিতে চাইলেও নিতে নারাজ তিনি।
.
শেষপর্যন্ত গ্রামবাসী ও ওহিদুর বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা জোর করে আত্রাইয়ের ইউএনওর কাছে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁকে একটি বাড়ি করে দেয়ার আবেদন দেয়। ইউএনও নিজেও চেয়েছিল অন্তত গ্রামে তাঁর জন্য একটা ঘর তৈরি হোক। শেষপর্যন্ত সবার চাপে পড়ে তিনি রাজি হয়েছিলেন। তখন তাঁর গ্রামে তখন সরকার থেকে বীর নিবাস উপহার দেয়া হয়।
.
গত বছর ওহিদুর বাহিনীর উপর রিপোর্টের কাজে নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোরে ওহিদুর বাহিনীর সেই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তাঁর যুদ্ধাঞ্চল ঘুরে দেখেছিলাম। গিয়েছিলাম তাঁদের প্রায় প্রতিটি অপারেশন স্থলে। ওহিদুর রহমানের তখন ৮২ বছর, বার্ধক্যের দরুন তিনি ঘর থেকেই বেরোতে পারেন না। কিন্তু সেকি আতিথেয়তা! তিনি কেবল বলার বাকি, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুক্তিযোদ্ধারা তাঁর বাড়িতে ছুটে এলেন। সবার কাছেই তিনি কমরেড আর কমান্ডার! সবাই ঘিরে ধরে রাখলেন তাঁকে। সেকি আন্তরিকতা।
.
নওগাঁর পৈত্রিক বাড়িতেই দীর্ঘসময় বসে বসে আমাকে কতো স্মৃতিচারণাই না করেছিলেন। নওগাঁয় যতোদিন ছিলাম সারাদিন কাজ শেষে প্রতিদিন সন্ধ্যা বেলায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে আড্ডায় বসতাম। তিনি বিছানায়, আমি পাশে বসে। কতো কি ইতিহাস, কতো অজানা বিষয় জেনেছি।
.
তাঁর ছেলে অ্যাডভোকেট সুমন পাশে একটি একতলা দালান তৈরি করেছেন। কিন্তু ওহিদুর রহমান সেই ঘরে থাকতে চাইতেন না। বলতেন, ‘আমি আমার মতো থাকবো। এই ঘরই আমার সম্বল। বাবা এই ঘরটা দিয়ে গেছে। নিজে তো কিছুই করতে পারিনি। আমার সাথে মানুষের ভালবাসা আছে, আমার আর কিছুরই প্রয়োজন নেই।’
.
আহ ওহিদুর রহমান। আপনাকে কি বলে যে বিদায় দিবো সে ভাষা জানা নেই। কেবল পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা তিনি যেন আপনাকে আপন দরদে আগলে রাখেন। বিদায় কিংবদন্তী।
.
ছবিটি গতবছর নওগাঁয় তাঁর বাড়িতে তুলেছিলাম।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button