মানিকগঞ্জে শহীদ রফিক জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে স্মৃতিচিহ্ন

দীর্ঘ ১৫ বছর প্রতীক্ষার পর মানিকগঞ্জের সিংগাইরে ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহম্মদের নামে নির্মিত গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে শহীদ রফিকের ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্নগুলো শোভা পাচ্ছে। শহীদ রফিকের ব্যবহৃত পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, নিজের হাতে কারুকাজ করা টেবিল ক্লথ, দুটি চেয়ার ও একটি টেবিল দেখতে দর্শনার্থীরা ছুটে যাচ্ছেন জাদুঘরে। তবে গ্রন্থাগারে ভাষা শহীদদের ওপর লেখা বইয়ের স্বল্পতা থাকায় নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা থেকে যাচ্ছে মাতৃভাষার অনেক তথ্যই। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ রয়েছে নতুন প্রজন্মের অনেকেই। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে প্রথম শহীদ মানিকগঞ্জের মানুষের গর্বের ধন রফিক উদ্দিন আহম্মদ। ২০০০ সালে মরণোত্তর একুশে পদকও পেয়েছেন এই সূর্য সন্তান। জেলার সিংগাইর উপজেলার পারিল গ্রামে ভাষা শহীদ রফিকের জন্ম। পারিল গ্রামটি পরবর্তীতে নামকরণ করা হয় রফিক নগর হিসেবে। জানা গেছে, ২০০৮ সালের ২৪শে মে জেলা পরিষদ রফিক নগরে নির্মাণ করে ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহম্মেদ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। শুরু থেকেই পাঠাগারে কিছু বই এবং ছবি দিয়ে সাজানো হলেও জাদুঘরে দেয়া হয়নি রফিকের ব্যবহৃত স্মৃতি চিহ্নগুলো।
প্রতিবছরই ফেব্রুয়ারি মাস এলেই সরগরম হয়ে ওঠে জাদুঘর ও গ্রন্থাগারটি। বছরের বাকি সময় থাকে অযত্ন আর অবহেলায়। জাদুঘরে কিছু আলোকচিত্র থাকলেও রফিকের কোনো স্মৃতিচিহ্ন এতদিন ছিল না। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে শহীদ রফিক পরিবারের সদস্যদের কাছে শহীদ রফিকের ব্যবহৃত স্মৃতি চিহ্নগুলো জাদুঘরে সংরক্ষিত রাখার দাবি করে আসছিল এলাকাবাসী ও দর্শনার্থীরা। তবে শহীদ রফিকের পরিবার দেরিতে হলেও সমপ্রতি শহীদ রফিকের ব্যবহৃত পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, নিজের হাতে কারুকাজ করা টেবিল ক্লথ, দু’টি চেয়ার ও একটি টেবিল জাদুঘরে দান করায় এলাকাবাসী ও দর্শনার্থীরা খুশি। একুশে ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে এবং রফিকের ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্নগুলো দেখতে দূর-দূরন্ত এলাকার মানুষজন ছুটে আসছে শহীদ রফিক গ্রন্থাগার ও জাদুঘরে। সরজমিন শহীদ রফিক গ্রন্থাগার ও জাদুঘরে গিয়ে দেখা গেছে, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের ভিড়। তারা প্রথমবারের মতো জাদুঘরে শহীদ রফিকের ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্নগুলো দেখতে পেয়ে আনন্দিত। তবে অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন ভাষা শহীদদের উপর লেখা পর্যাপ্ত বই না থাকায়। অথচ গ্রন্থাগারে ১৬ হাজার বইয়ের ভাণ্ডার রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাব্বির আহমেদ বলেন, প্রতিবছরই একুশে ফেব্রুয়ারির আগে ভাষা শহীদ রফিকের গ্রন্থাগার ও জাদুঘরে আসি। কিন্তু এসে অনেকটা হতাশ হয়ে ফিরে যাই। শহীদ রফিকের ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্নগুলো দেখার ইচ্ছা জাগছিল বহুদিন ধরে। সেই ইচ্ছা দীর্ঘদিনেও পূরণ হয়নি। তবে এবার জাদুঘরে এসেই দেখতে পাই শহীদ রফিকের ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্নগুলো। যা দেখতে পেয়ে প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। দেরিতে হলেও শহীদ রফিকের স্মৃতিচিহ্নগুলো জাদুঘরে দেয়ায় ধন্যবাদ জানাই শহীদ রফিক পরিবারের সদস্যদের। লেখক ও গবেষক মিয়াজান কবীর শহীদ রফিক গ্রন্থাগার ও জাদুঘর পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের বলেন, ভাষা শহীদ রফিকের নামে স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার গড়ে উঠলেও সেখানে প্রদর্শন করার মতো কোনো ডকুমেন্টস সেভাবে সংরক্ষিত হয়নি। ফলে দর্শনার্থী কিংবা শিক্ষার্থী যারাই এখানে আসেন তারা হতাশ হয়ে আবার ফিরে যান। শহীদ রফিক গ্রন্থাগারের লাইব্রেরিয়ান ফরহাদ হোসেন খান বলেন, দীর্ঘদিন প্রত্যাশার পর শহীদ রফিকের ব্যবহৃত স্মৃতিগুলো গ্রন্থাগার ও জাদুঘরে আনার কারণে দর্শনার্থীদের মনের খোরাক মিটেছে। এখানে প্রায় ১৬ হাজার বই রয়েছে। তবে এখানে যেসব দর্শনার্থী আসছেন তাদের বেশির ভাগ চাহিদাই থাকছে ভাষা শহীদদের উপর লেখা বইয়ের প্রতি। ভাষা শহীদদের উপর অল্পসংখ্যক বই থাকায় পাঠকের চাহিদা মেটাতে পারছি না। ভাষা শহীদ রফিকের ছোট ভাই খোরশেদ আলম বলেন, দেরিতে হলেও শহীদ রফিকের ব্যবহৃত পাঞ্জাবি, লুঙ্গি, তার হাতের কারুকাজ করা টেবিল ক্লথ, দু’টি চেয়ার ও একটি টেবিল জাদুঘরে দিয়ে দায়মুক্ত হয়েছি। শহীদ রফিক জাদুঘর ও পাঠাগার কর্তৃপক্ষ অনেকদিন ধরেই আমাদের তাগিদ দিয়ে আসছিলেন। নানা কারণেই শহীদ রফিকের ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্নগুলো দেয়া হয়নি। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এডভোকেট গোলাম মহিউদ্দিন জানান, শহীদ রফিকের ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্নগুলো জাদুঘরে দেয়ার জন্য শহীদ রফিকের পরিবারের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই অনুরোধ করেছিলাম। অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন পর হলেও শহীদ রফিকের ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্নগুলো জাদুঘরে পেয়ে দর্শনার্থীদের চাহিদা মেটাতে পেরেছি। এজন্য শহীদ রফিকের পরিবারকে আমরা জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই।
মানবজমিন




