জাতীয়শিরোনাম

মানিকগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি : ৩০টি ইউনিয়ন প্লাবিত

মানিকগঞ্জের উপর দিয়ে প্রবাহমান পদ্মা, যমুনা, ইছামতি, ধলেশ্বরীসহ মানিকগঞ্জের আভ্যন্তরীন নদ-নদীতে অস্বাভাবিকভাবে পানি বাড়ায় ৫টি উপজেলার ৩০টি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে বিভিন্ন এলাকা। ফলে জেলার হরিরামপুর দৌলতপুর, শিবালয়, ঘিওর ও সাটুরিয়াসহ ৫টি উপজেলার নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া জেলার ৮১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বাড়ি-ঘর, গ্রামীন রাস্তাঘাট ও হাট-বাজার ডুবে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছে হাজার হাজার পানিবন্দী মানুষ। গবাদি পশুসহ আশ্রয় নিয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রসহ পাকা সড়ক, উচু বাঁধ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বন্যা দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দেওয়ায় বন্যার্তদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে ।
শিবালয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার (জিআর) মো. ফারুক হোসেন জানান, গত কয়েকদিন ধরেই আরিচা পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। গত দুইদিন আগেও বিপদ সীমার (৯.৪০মিটার) এক সেন্টিমিটার নিচে ছিল। এর পরবর্তী ২৪ ঘন্টার মধ্যেই বিপদ সীমার ২৩ সেঃমি বেড়ে যায়। বর্তমানে আরিচা পয়েন্টে বিপদসীমার ৭৪সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
মানিকগঞ্জ জেলার সব থেকে নিম্নাঞ্চল হরিরামপুর উপজেলা চত্ত¡রে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে হাটু পানি হয়ে গেছে। শুধু উপজেলা চত্ত¡রই নয় আবাসিক ভবন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্য্যালয়েও পানি ঢুকে পড়েছে। প্লাবিত হয়েছে ফসলি জমিসহ গোপিনাথপুর, কাঞ্চনপুর, ভেলাবাদ, হারুকান্দি, আন্ধারমানিক, পাটগ্রাম, দড়িকান্দি, জগন্নাথপুর, বাহিরচরসহ বিভিন্ন এলাকা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্য্যালয়ে পানি উঠার কারনে নৌকায় করে গবাদি পশুর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। উক্ত কার্য্যালয়ের সহকারী চিকিৎসক জানান, এলাকা বন্নায় প্লাবিত হওয়ায় এবং রাস্তাঘাট ভেঙ্গে যাওয়ায় অসুস্থ গবাদি পশু হাসপাতালে আসতে পারছে না। নৌকা যোগে কিছু কিছু গবাদী পুশু আসতেছে তাদেরকে আমরা নৌকাতেই চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাচ্ছি। এছাড়া নৌকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিভিন্ন রোগের ভ্যাক্সিনসহ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
আন্ধারমানিক এলাকার আবিদ হাসান আবেদ জানান, হঠাৎ করে পানি ঢুকে পড়ায় পাঁকা সড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট ভেঙ্গে প্রবল বেগে পানি এসে খালের সৃষ্টি হয়েছে। যাহার দরুন উপজেলা ও জেলা শহরের সাথে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। এলাকাবাসী মিলে স্বপ্রনোদিত হয়ে রাস্তার ভাঙ্গন পয়েন্টগুলোতে বাশঁ দিয়ে সাঁকো নির্মাণের ব্যবস্থা করছি।

হরিরামপুর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান আবুল বাসার সবুজ জানান, হরিরামপুর উপজেলা নিচু এলাকা হওয়ায় বেশির ভাগ এলাকাই বন্যার প্লাবিত হয়েছে। এলাকার বেশির ভাগ রাস্তায় পানি ওঠে যাওয়ায় জেলা সদরের সাথে হরিরামপুর উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা দলীয়ভাবে এবং সরকারী সাহায্যপুষ্টে বিভিন্ন এলাকায় ত্রান সামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা করছি।
হরিরামপুর উপজেলার নির্বাহী অফিসার কাজী আরেফীন রেজওয়ান জানান হরিরামপুরের বন্যা পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। মাত্র ১ দিনেই আমাদের উপজেলা চত্ত¡র তলিয়ে গেছে। রাস্তায় বিভিন্ন পয়েন্ট ভেঙ্গে যাওয়ায় জেলার সাথে পরিবহন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলার প্রায় ইউনিয়নেই বন্যায় ক্ষতি হয়েছে। বানভাসি মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দে আসার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা না থাকায় মাত্র ৮/৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষ আসতে শুরু করেছে। বন্যা দুর্গত মানুষদের নিকটস্থ উচু জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আমরা দুর্গতদের শুকনা খাবারসহ ত্রান সামগ্রীর ব্যবস্থা করছি।
উপজেলা চত্তরের পার্শ্বে হেলিপ্যাড এলাকায় বেশ কিছু পরিবার গবাদি পশু ও পরিজন নিয়ে উঠেছে। আশ্রয় নেওয়া আনু বেগম জানায় বাড়ি ঘরে পানি উঠায় পরিবার পরিজন গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়ে হেলিপ্যাড এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন। চাল ডাল আর জ্বালানীর অভাবে রান্না বান্না করতে পারছেন না ঠিকমত। এক বেলা রান্না করে খেয়ে বাকি দুই বেলাই কাটাতে হয় না খেয়ে।
দৌলতপুর উপজেলার চরকাটারী, বাঁচামারা, বাঘুটিয়া, জিয়নপুর, ইসলামপুর, বাসাইল, মুন্সিকান্দি, জোতকাশি, বেপারীপাড়া, ফকিরপাড়া, রাহাতপুর, হাজিপাড়া, কাচারীপাড়া, গোবিন্দপুর, বাঘপাড়া, মন্ডলপাড়া, বড়টিয়া, কাটাখালি, বৈন্যা ও আমতলী এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
শিবালয় উপজেলার আরিচা লঞ্চঘাট এলাকা, আলোকদিয়া চর, বাল­া, কুষ্টিয়া, মান্দ্রাখোলা, আরোয়া, জগৎদিয়া, দক্ষিন সালজানা বাউলিকান্দা, দেবিনগর, নয়াকান্দি, রুপসা, নালি, দরিকান্দি এলাকায় প্লাবিত হয়েছে। আরিচা থেকে পাটুরিয়া ফেরিঘাট যাওয়ার রাস্তার এলাচিপুর এলাকায় বন্যার পানির স্রোতে রাস্তার কিছু অংশ ভেঙে যাওয়ায় ওই রুটে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে।
ঘিওর উপজেলার কুস্তা, ঘিওর, মাইলাগি, বৈকন্ঠপুর, সিংজুরী প্রভৃতি নতুন নতুন এলাকায়ও পানি বারতে শুরু করেছে। অনেক অনেক স্থানেই বাঁধ ভেঙে নদী তীরবর্তী এলাকাসমূহে পানি ঢুকে পড়েছে। নিম্নাঞ্চলের অনেক বাড়িঘর ইতোমধ্যেই ডুবে গেছে। ফসলের ক্ষেতও প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার দুর্গতদের জন্য সরকারিভাবে কোনো ত্রাণ সাহায্যে আসেনি বলেও জানান স্থানীয় এলকাবাসী।
সাটুরিয়া উপজেলার আয়নাপুর, পাচুটিয়া, তিল­ী, আকাশী, ভুমিহীন চর, পশ্চিম চরতিল­ী রাজৈর, বরাইদ, গোপালপুর উত্তর ঝনকা, পাতিলা পাড়াসহ চরাঞ্চল ও নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পশ্চিম চর তিল­ী এলাকার পানি উন্নয়ন বোর্ড এর দেড় কোটি টাকা ব্যায়ে অস্থায়ীভাবে করা প্রতিরক্ষামূলক বাঁধে ধস দেখা দেওয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে ওইসব এলাকার জনগন। এছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ মাদ্রাসা, হাট বাজার, রাস্তা ঘাটসহ শত শত বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে।
মানিকগঞ্জ কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আলিমুজ্জামান মিয়া জানান, বন্যার পানিতে বোরো, আমন ধান, রোপা ধানের বীজতলা ও শাকসবজির হাজার হাজার একর জমি বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এক সপ্তাহের বেশি এসব ফসল পানিতে ডুবে থাকলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. নাজমুছ সাদাত সেলিম জানান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ৩১১ নম্বর রুমে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।
সুত্র : কারু নিউজ

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button