slider

মানিকগঞ্জে নানা বৈচিত্র্যে পহেলা বৈশাখ উদযাপন

মো.নজরুল ইসলাম, মানিকগঞ্জ:”নারী বান্ধব সমাজ গড়ি, বাঙালি সংস্কৃতি সুরক্ষা করি “বৈশাখের নতুন উদ্দীপনা ছড়িয়ে যাক ঘরে ঘরে” এই ধরনের বিভিন্ন স্লোগান নিয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বারসিক ও সিংগাইর বিনোদপুর ঋষি পাড়ায় কনকলতা কিশোরী ক্লাব, বরবরিয়াল কৃষক কৃষাণী সংগঠন ও মানিকগঞ্জ পৌরসভাধীন নয়াকান্দি প্রজাপতি কিশোরী ক্লাব এর যৌথ আয়োজনে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পহেলা বৈশাখ ১৪৩১ উদযাপন উপলক্ষে কিশোরী ও কৃষক কৃষাণীদের সাথে গ্রামীণ খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও খাদ্য উৎসব পালিত হয়।
বৈশাখের এই আনন্দ নিয়ে কনকলতা কিশোরী ক্লাবের সভাপতি সুবর্না রানী দাস এর সভাপতিত্বে ও বারসিক প্রকল্প সহায়ক রিনা সিকদার এর সঞ্চালনায় কর্মসূচির ধারণা পাঠ করেন বারসিক প্রকল্প কর্মকর্তা মো.নজরুল ইসলাম। আলোচনায় আরও অংশগ্রহণ করেন বিনোদপুর ঋষি পাড়া নারী উন্নয়ন সমিতির সভাপতি নারীনেত্রী ঝর্না রানী দাস, সাধারণ সম্পাদক দিতি রানী দাস, কিশোরী পুষ্পিতা দাস, সোনালী দাস প্রমুখ। এদিকে একই সময়ে মানিকগঞ্জ বরবরিয়াল কৃষক কৃষাণী সংগঠনের সভাপতি মহেন্দ্র মনিদাস এর সভাপতিত্বে ও বারসিক কর্মকর্তা গাজী শাহাদাত হোসেন বাদল এর সঞ্চালনায় সূচনা বক্তব্য রাখেন বারসিক আঞ্চলিক সমন্বয়কারী বিমল চন্দ্র রায়। ধারণা পাঠ করেন বারসিক সহযোগী কর্মসূচি কর্মকর্তা আছিয়া আক্তার, অনন্যা আক্তার প্রমুখ।
এছাড়াও মানিকগঞ্জ পৌরসভার নয়াকান্দি প্রজাপতি কিশোরী ক্লাবে অভিন্ন কর্মসূচিতে বারসিক প্রকল্প সহায়ক ঋতু রবি দাস ও সমাজকর্মী অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা বলেন প্রতি বছর অনেকগুলো বার্তা নিয়ে পহেলা বৈশাখ আমাদের ঘরে হাজির হয়। গ্রামের কৃষক কৃষাণীরা প্রকৃতির অপরুপ চিত্র ও আগমনী দেখে ভালো মন্দ বুঝতে পারে এবং সময়োপযোগী ফসল উৎপাদন সহ প্রকৃতি নির্ভর টেকসই কৃষি উন্নয়নে কর্মপন্থা ঠিক করেন। আমরা তাদের এই লোকায়ত চর্চাকে সম্মান জানাই।

উল্লেখ্য যে-অনেক আগে থেকেই পহেলা বৈশাখ বাঙ্গালীর প্রাণের উতসব যেটি বর্তমানে বহুমাত্রিক রুপ নিয়েছে।আমাদের দেশেও পাহার-হাওর লবণাঞ্চল সমতলসহ নদী কেন্দ্রীক অঞ্চল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন রুপে পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। যেমন ব্যবসায়ী বণিকেরা নতুন হালখাতা খুলে দেনাদার পাওনাদার এর মধ্যে মিস্টিমুখ করিয়ে প্রীতির হাসি সৃষ্টি করেন। কবি সাহিত্যকরাও তাদের ডায়রি বদল করেন,নতুন বই প্রকাশ করেন।বৈশাখকে তারা কল্পনা করেন সময় পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে।পুরাতন বছরের রোগ,শোক,ব্যথা,ব্যর্থতা,হতাশা ভুলে তারা নতুন করে ভালসাবা-প্রেমে,শস্যে-সংঙ্গীতে,সুখে-শান্তিতে যেন ভরে দেয় তাদের জীবন সংসার। এই সব কারনে বৈশাখ ধরা দেয় কবিদের কাছে রুদ্র রুপে শুধু তাই নয় বৈশাখের রুদ্র রুপে তারা বিচলিত নন বরং বৈশাখের কাল বৈশাখীর জন্য তারা পথ চেয়ে থাকেন উদগ্রীব হয়ে,যাতে জীর্ন পাতারা ঝরঝর করে ঝরে পরে,স্বপ্ন দেখে নতুন পল্লবে ভরে উঠবে জীবনের ডালপালা। নতুন রঙে,নতুন সঙে,নতুন গানে, আয়োজনের মিলনমেলায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে বাংলার পথ ঘাট। তবে সকল অঞ্চলেই হিন্দু,মুসলিম,বোদ্ম খ্রিস্টানসহ ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে এক চাদরের তলে বৈশাখী অনুষ্ঠানমালার মিলন মেলায় সামিল হয়। সময়ের প্রয়োজনীয়তায় এই উতসবে যোগ হয়েছে বিভিন্ন উপাদান। কাচা মরিচের পান্তাভাত,শাক পোলাও, মাংস,খিচুরীসহ হরেক রকমের খাওয়ার আয়োজন তো আছেই। পুঁিজবাদী এই সমাজে নতুন করে যোগ হয়েছে পান্তা ইলিশের ঘনঘটা। এসব প্রতিযোগীতায় শিশু-কিশোর-ছাত্র-যুবকদের সাথে যুক্ত হয়েছে গ্রামীন কৃষক-কৃষাণী ও নবীণ প্রবীণের মহা সম্মিলনে বাড়ছে আন্ত:নির্ভরশীলতা তৈরী হচ্ছে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার আন্ত:প্রজন্ম। ইতিবাচক এই সব সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত থাকলে পরিবর্তনকারী যুব সংগঠন দ্বারা সমাজে নারী-পুরুষের সামাজিক ন্যায্যতা সৃষ্টি করা সম্ভব।

কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে ইতিবাচক চর্চাগুলো হ্রাস পেয়ে নেতিবাচক চর্চা প্রসারিত হচ্ছে।বৈশাখী মিলন মেলায় আনন্দের পাশাপাশি আগে থেকেই কমবেশী গ্রামীন মেলা, হাতের তৈরী খেলনা গহনা পোশাকসহ বিভিন্ন আয়োজনে সীমিত আকারে অর্থনৈতিক দেনদরবার চলত। এদিক থেকে সামষ্ঠিক অর্থণীতিতে এর প্রভাবও কম বেশী দেখা যেত। অর্থণীতির ভাষায় টাকার যত বিনিময় ঘটবে অর্থণীতির চাকা তত গতিশীল থাকবে। সময়ের আবর্তে আধুনিকতার দাপটে এটি আজ উৎসব থেকে মহাউতসবে পরিনত হয়েছে। এই দিনকে কেন্দ্র করে এখন কারবার,ফটকা কারবার এবং বাজার অর্থণীতিতে সম্প্রতী ও নির্ভরশীলতাকে পিছনে ফেলে মুনাফাই যখন মূখ্য তখন বাকি সব আয়োজন হযে যাচ্ছে তুচ্ছ। বর্তমান মুনাফা কেন্দ্রীক উৎসব বহুকেন্দ্রীক নয় এককেন্দ্রীক সেটি হলো বাজার কেন্দ্রীক মনোপলি ব্যবসা যেটি গুটিকয়েক পরিবারকে ধনী থেকে আরো ধনী করছে। একদিকে আমরা দেখছি লোকায়ত সংস্কৃতির উপাদানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে ভোগবাদিরা সেই উপাদনগুলোকে আত্মস্বাত করে তাকে প্যাটেন্টসহ নতুন রুপ দিয়ে গুটি কয়েক কোম্পানি বাজার দখলের প্রতিযোগীতায় নেমেছে এবং তারা বিজয়ীও বটে। যেমন- কৃষক নিজ হাতে শরিষার তৈল করে সংসার সামলাতেন। গ্রামে তৈল উৎপাদনকারিকে কুলু বলা হইত। তারা গাওয়াল করত। বৈশাখের দিন হাতের তৈরী তৈল দিয়ে ভর্তাসহ অন্যন্য তরকারির জুরি ছিল না। কাসিন্দ তৈরী ও গাওয়াল করা ছিল হিন্দুদের বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রধান পেশা। হলুদ,মরিচ,আদাসহ অধিকাংশ মসলা নিজেরাই তৈরী করত এবং পাটায় বেটে রান্না করার মজাই ছিল আলাদা। মাটির হারিতে রান্না,বাসনে খাবার,কলাপাতায় সিন্নি, পাটিতে দাওয়াত, হাতে ভাজা মুরি,খই,বিন্নিসহ হরেক রকমের খাবার ও তৈজসপত্রের ইয়াত্তা নেই। এগুলোর নাম ঠিক রেখে রুপ পরিবর্তন করে নতুন মোড়কে সাজিয়ে বেক্সিমকো,স্কয়ার,একমি,আরএফএলসহ গুটি কয়েক কেম্পানির করায়াত্তে জিম্মি হয়েছে এবং মুনাফার দরদামে ওঠানাামা করছে উতসব কেন্দ্রীক বৈশাখী উপাদান। সাংস্কৃতিক চর্চাগুলোতে অপসংস্কৃতির ছত্রছায়া চরমভাবে বিদ্যমান। যেমন- গানবাজনায় আধুনিক সাজসরঞ্জাম,উচ্চতর ভলিওমের বাদ্যযন্ত্র,বিদেশী ভাষার গান কোমলমতি তরুনপ্রজন্মকে দ্রুত আকৃষ্ট ও নিজস্বসংস্কৃতি থেকে বিপথগামী করছে। আমরা এগুলো দূর করতে সাংস্কৃতিক জাগরণ চাই।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button