মানবিক সহায়তার টাকায় উত্তমের অমানবিক জোচ্চুরি

রাহুল সরকার : রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরসভায় করোনাদুর্যোগে সরকারের দেয়া ‘মানবিক সহায়তার’ টাকায় মেয়র উত্তম কুমার সাহা অমানবিক এক জোচ্চুরির ঘটনা ঘটিয়েছেন। তালিকায় স্থান পেয়েছে পৌর মেয়রের পরিবারের সদস্য, পৌর কর্মকর্তা কর্মচারি ও এনজিও কর্মকর্তাদের নাম।
গত অর্থ বছরে ত্রাণ মন্ত্রণালয় করোনাদুর্যোগে অসহায় মানুষের মাঝে তাৎক্ষণিক বিতরণের জন্য মোট সাত দফায় তিন লাখ ৬৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু ওই টাকা অসহায়দের মাঝে বিতরণ না করে তিনি আত্মসাৎ করেছেন- এমন অভিযোগ তোলেন ১২ পৌর কাউন্সিলরের ১১ জনই। এরই প্রেক্ষিতে ৮ জুলাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার তিন কার্য দিবসের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ বিবরণী(মাস্টার রোল) জমা দিতে পৌর মেয়রকে পত্র দেন। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌর মেয়র বিতরণ বিবরণী দাখিল করতে ব্যর্থ হলেও ২১ জুলাই তা’ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসে জমা দেন। যাতে অন্যদের ন্যায় পৌর মেয়রের আস্থাভাজন পৌর কর্মকর্তা-কর্মচারি ছাড়াও তাদের স্ত্রী ও মা-বাবা রয়েছেন এবং সেটা একবার নয় একাধিকবার। আবার
তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের অনেকেই কোন টাকা পাননি। আর যারা টাকা পেয়েছেন তাদের নামের পাশে তিনগুণ-চারগুণ বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। এঘটনাকে ১১ পৌর কাউন্সিলর বলছেন মেয়রের অমানবিক জোচ্চুরি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস থেকে প্রাপ্ত বিতরন বিবরণীতে দেখা যায়- তালিকার বেশিরভাগ স্থান জুড়ে রয়েছে পৌর কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের নাম। হাতে লেখা অনেক নামের পাশে জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বার ও মোবাইল নাম্বার থাকলেও একদিকে এক ঠিকানা এবং আরেকদিকে অন্য ঠিকানা রয়েছে। কিছু নামের পাশে বাবার নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নাম্বার, ঠিকানা কিংবা মোবাইলফোন নাম্বার কোনটাই নেই। তালিকায় রয়েছে পৌর মেয়রের ভাতিজা বিধান সাহা, ক্লিনটন সাহাসহ বেশকিছু সদস্যের নাম। এছাড়া তার ডান হাত বলে পরিচিত কর্মকর্তা পৌরসভার নকশাকার আশরাফুজ্জামান লিটনের নাম নানাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে একাধিকবার।
এর পাশাপাশি রয়েছেন লিটনের বাবা-মাসহ স্ত্রীর নাম। অনেক নামের পাশে মোবাইল নাম্বার দেয়া হলেও তারা ঠিকানা অনুযায়ী বসবাস করেননা এবং যে টাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে সে টাকাও তারা পাননি। এমনকি টাকা পুরোপুরি না পাওয়ার মত ঘটনাও রয়েছে। তালিকায় স্থান
পেয়েছে বেসরকারি সংস্থা ‘আশা’র রিজিওনাল ম্যানেজার, ব্র্যাক’র উপজেলা ম্যানেজার (লিগ্যাল এইড), জাগরণী চক্র ফাউণ্ডেশন’র ম্যানেজার, উদ্দীপন’র শাখা ব্যবস্থাপকের নাম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ব্র্যাক’র উপজেলা ম্যানেজার (লিগ্যাল এইড) হিসেবে যার নাম লেখা রয়েছে তিনি দেড় বছর আগে বদলি হয়ে বর্তমানে পঞ্চগড়ে অবস্থান করছেন। কথা হয় পৌরশহরের ইক্ষু ক্রয় সেন্টার এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম দুদুর। তার নামে দেড় হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে এবং তাতে যথারীতি সাক্ষরও করা হয়েছে। কিন্তু তিনি এক টাকাও পাননি বলে দাবী করেছেন। তিনি আরো দাবী করেন, গত এক-দুই বছরের মধ্যে পৌরসভা থেকে তাকে কোন অর্থ সহায়তাই দেয়া হয়নি। এমনকি পৌরসভার কোন কাগজে তিনি কোনদিন
সাক্ষরও করেননি। তিনি বলেন, আমার মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ঠিক রেখে ভুয়া সাক্ষর ও ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছে মুন্সিপাড়ার সফিকুল ইসলামের ছেলে নুর আলম খোকনের ক্ষেত্রেও। তাকে দুই হাজার টাকা দেয়ার তালিকা করে বাড়ির ভুয়া ঠিকানা কথাকলি রোড উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রমজানের ঈদের রাতে মেয়র ব্যক্তিগতভাবে আমাকে এক হাজার টাকা দেন। কিন্তু সেটা যে ছিল অর্থ সহায়তার টাকা তা’ আমি জানতামনা। তিনি বলেন, পরবর্তীতে জানতে পারলাম আমাকে দু’হাজার টাকা অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে- যা শুনে সত্যিই আমি মর্মাহত হয়েছি। একই ধরণের কথা বলেন পৌরসভার এক কর্মচারি। তিনি বলেন, মেয়র মহোদয় আমাকে ডেকে পাঁচশ’ টাকা দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তালিকায় দেখলাম আমার নামে ১৫শ’ টাকা লেখা রয়েছে। এক্ষেত্রে যে সাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে সেটিও আমার নয়।
এবিষয়ে জানতে চাইলে ১১ জন পৌর কাউন্সিলরের সকলই এক বাক্যে বলেন, মানবিক সহায়তার অর্থ নিয়ে মেয়রের এটা অমানবিক জোচ্চুরি ছাড়া কিছুই নয়- যা’ তদন্ত হওয়া জরুরী। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার বাবুল চন্দ্র রায় বলেন, বার বার তাগাদা দেয়ার পরও নির্দিষ্ট সময়ে পৌর মেয়র মাস্টার রোল জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ২১ জুলাই অবশেষে তিনি মাস্টার রোল জমা দিয়েছেন। তবে মাস্টার রোলে কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়েছে। উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে বিষয়গুলো সম্পর্কে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান বলেন, এটি আসলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের বিষয়। আমি পদাধিকার বলে সভাপতি হওয়ায় মাস্টার রোল চেয়ে পৌর মেয়রকে পত্র দিয়েছিলাম। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেটি হাতে না পেলেও এখন হাতে এসেছে। এনিয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস প্রশ্ন তুললে তা’ খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে পৌর মেয়র উত্তম কুমার সাহার সাথে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবী করেন, যা হয়েছে সবই নীতিমালা অনুযায়ী হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, অনেক কাউন্সিলরের বাপ-মার নামে বয়স্কভাতা করে দিয়েছি- এটাকে কি বলা যায়। জনপ্রতিনিধি হলে অনেককিছু মেনে নিয়ে চলতে হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নূরুল ইসলাম দুদুকে দেড় হাজার নয় আরো বেশি টাকা দেয়া হয়েছে।




