sliderবিনোদনশিরোনাম

মানবতাবাদী লালন সাঁইয়ের প্রয়াণ দিবস আজ

মানবতাবাদী লালন সাঁইজির ১৩৪তম প্রয়াণ দিবস আজ। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ফকির লালন সাঁই ১১৬ বছর বয়সে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার নিজ আখড়ায় মৃত্যুবরণ করেন। বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি লালন স্মরণোত্সবের আয়োজন করেছে আজ। উৎসবের উদ্বোধন করবেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন মুরশিদ। এতে সভাপতিত্ব করবেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. সৈয়দ জামিল। এছাড়া কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আখড়া বাড়িতে আয়োজন করা হবে লালন স্মরণোত্সব।

বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) থেকে ৩ দিনব্যাপী এ লালন মেলা শুরু হবে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এবং লালন একাডেমি মেলার আয়োজন করেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, লালন ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বেড়েই চলেছে। লালন মেলা শুরুর আগেই আখড়াবাড়িতে ভক্ত অনুসারীদের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। ভক্ত-অনুসারীরা খণ্ডখণ্ডভাবে দলবদ্ধ হয়ে লালন ফকিরের গান গাইছেন। লালনের বাণী ও আদর্শ নিয়ে একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করছেন। লালনের গানে গানে মুখরিত হয়ে উঠেছে। ভক্ত অনুসারীরা লালন ফকিরের মাজার প্রাঙ্গণ, মাঠ, কালি নদীর পাড়ঘেঁষে অস্থায়ীভাবে তৈরি করেছেন আস্তানা। লালন মেলায় কালি নদীর পাড়ে মাঠে বসেছে গ্রামীণ মেলা। আশপাশের এলাকায়ও হরেক রকমের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে আসা খন্দকার জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা ঝিনাইদহ থেকে গত কয়েকদিন আগে ছেঁউড়িয়ায় এসেছি। আমি একজন লালন ভক্ত। আমার মতো শতশত ভক্ত-অনুসারীরা এখানে এসেছেন। প্রতিদিনই লোকজন আসছে বিভিন্ন জেলা থেকে। খুবই ভালো লাগছে। এবারের মেলাটা খুবই বড় মেলা হবে বলে আশা রাখি।”

লালন একাডেমির বাউল শিল্পী দীপু শাহ বলেন, “লালনের উৎসব এর আগে বন্ধ থাকায় সাধু-গুরুরা হতাশায় ভুগছিলেন। এবার লালনের তিরোধান দিবস পালন হবে। এজন্য আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। সুন্দরভাবে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করা হবে। যতদিন বেঁচে থাকবো সাঁইজির কথা শুনিয়ে যাব।”

লালন মেলায় আসা এক দর্শনার্থীরা বলেন, “এখানে এসে খুবই ভালো লাগছে। লালন ভক্ত ও অনুসারীদের আস্তানাগুলো দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। তাদের গাওয়া গান শুনতে ভালো লাগে। জায়গায় জায়গায় তারা গান গাচ্ছেন। লালন সাঁইজির গানে ও বাণীতে এই এলাকার মুখরিত হয়ে উঠেছে।”

লালন একাডেমির কয়েকজন সদস্য জানান, লালন ফকির দীর্ঘ সময় ধরে তার নিজস্ব আত্মদর্শনের আলোকে ভক্ত ও শিষ্যদের নিয়ে যেসব উৎসবমুখর কর্মকাণ্ড করতেন তারই ধারাবাহিকতায় পহেলা কার্তিক সাঁইজির তিরোধান দিবস পালন করতে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভক্ত-শিষ্য-অনুসারীরা ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে মিলিত হন। কুষ্টিয়ার আখড়াবাড়ির ভেতরে ও বাহিরে যেন পা ফেলার জায়গা থাকে না। এবারও লালন মেলা শুরুর এক সপ্তাহ আগে থেকেই দূরদূরান্ত থেকে হাজারো ভক্তরা এসেছেন। সাধু ভক্তদের এই মিলন মেলায় লালনের রেখে যাওয়া মানবমুক্তির আধ্যাত্মিক বাণী সম্বলিত গান গাওয়া হয়। লালন শাহের গান শুনতে ও এখানে ঘুরতে জড়ো হচ্ছেন অসংখ্য দর্শনার্থীরা।

বাউলসাধক কফিল শাহ বলেন, “লালনের গানে সবার ওপরে রয়েছে মানুষ। সবকিছুর সন্ধান পাই তার গানে। জগতের সকল ভাবনার উত্তর তার গানে। কিন্তু লালনকে বুঝতে পারি না। সারা জীবন ধরে লালনেরই সন্ধান করে চলেছি। যত দিন যাচ্ছে ফকির লালন সাঁইয়ের জীবন ও গানের ব্যাপ্তি ততই প্রভাব বিস্তার করছে মানুষের মাঝে।”

তিনি আরও বলেন, সাঁইজি ১১৬ বছর বেঁচে ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ও বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাননি। বরং তার সৃষ্টির ঔজ্জ্বল্য বেড়েছে, বেড়েছে পরিধি। ফকির লালন শাহ শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে এক ঐন্দ্রজালিক মোহময়তা বিস্তার করে চলেছেন। দিন দিন তার সে ঐন্দ্রজালিক বলয়ের বিস্তৃতি ঘটছে। অগণিত মানুষ তার বিশাল সৃষ্টি জগতে প্রবেশ করে সন্ধান করছেন যেন লালনেরই।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও লালন একাডেমির অ্যাডহক কমিটির সভাপতি শারমিন আখতার জানান, বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৪তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে ৩ দিন ব্যাপী লালন মেলার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিদিনই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে আলোচনা সভা শুরু হবে। আলোচনা শেষে শুরু হবে লালন সঙ্গীত। মেলার সার্বিক প্রস্তুতি চলছে।

তিনি আরও জানান, মাজার প্রাঙ্গণ ও তার আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করবে।

উল্লেখ্য, ১৮৯০ সালের পহেলা কার্তিক উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ দেহধাম ত্যাগ করেন। এরপর থেকে কুমারখালি উপজেলার ছেঁউরিয়ায় তার স্মরণে লালন একাডেমি ও জেলা প্রশাসন এই তিরোধান দিবস চালিয়ে আসছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button