ভারতে বাল্যবিবাহের সংস্কৃতি কীভাবে বদলানো সম্ভব?
রাজস্থানি একটি মেয়েকে স্কুলে যাবার আগে যে কী পরিমাণ কাজ করতে হয়, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
কারো কারো জন্য এসব কাজই অগ্রাধিকার পায়। স্কুল যাওয়া তাদের জন্য গৌণ। কিন্তু ভারতীয় এক শিক্ষাবিদ তিরিশ লাখ মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য জোরালো উদ্যোগ নিয়েছেন। লক্ষ্য শিক্ষা তাদের জীবনকে চিরকালের মত কীভাবে বদলে দিতে পারে তা প্রমাণ করা।
ভাগওয়ান্তী লাস্যি রামের জন্য দিন শুরু হয় খুব ভোরে। ওই সকালে উঠে থাকে চাপাটি রুটি বানাতে হয়। রুটি উল্টাতে হয় সাবধানে যাতে ধোঁয়া ওঠা তাওয়া থেকে আঙুলে ফোস্কা না পড়ে।
এরপর মুরগীদের খাওয়াতে হয়, হাঁড়িপাতিল মাজতে হয়। একটা কাজ শেষ হবার আগেই বাবা তাকে পরবর্তী কাজের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
“তাকে মাঠে ছাগল নিয়ে যেতে হবে,” তিনি বলেন, “সে কাজ ফেলে রাখলে চলবে না।”
এসব কাজ শেষ করে অবশেষে চুল আঁচড়ানোর একটু সময় মেলে, এরপর ওই এলাকার স্কুলের প্রথা মেনে বুকের ওপর দু-ভাঁজ করে ওড়নাটা কোনমতে ফেলে, পিঠে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে ৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুল ছুটতে হয়।
“আমাদের গ্রামের অনেক মেয়েই স্কুলে যায় না কারণ স্কুলের দূরত্ব অনেক,” সে বলে।
“আমাদের গ্রামে যদি এমন স্কুল থাকত, যেখানে বাচ্চারা ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত পড়তে পারত, তাহলে অনেক মেয়েই স্কুল যেত।”
“মেয়েরা স্কুলে যেতে ভয় পায়, কারণ যাবার পথে মহাসড়ক পার হতে হয়। সেখান দিয়ে বহু মাতাল গাড়িচালক যাতায়াত করে।”
ভাগওয়ান্তী লাস্যি রাম

স্কুল কামাই করাই দস্তুর
এজুকেট গালর্স সংস্থার স্বেচ্ছাসেবীরা এই সংস্কৃতি বদলের উদ্যোগে মাঠে নেমেছে।
স্বেচ্ছাসেবীর দল গ্রামে গ্রামে যায়, স্কুলে যাবার বয়স হয়েছে এমন মেয়েরা ঘরে বসে থাকলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা তাদের খুঁজে বের করে। মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তারা পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে এবং স্কুলে তাদের নাম লেখানোর জন্য গ্রামের লোকজনের সঙ্গে বসে পরিকল্পনা তৈরি করে।
এই স্বেচ্ছাসেবীদের স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হতে হয় যে স্কুলগুলোতে মেয়েদের ব্যবহারের জন্য টয়লেট আছে। মেয়েদের তারা ইংরেজি, অঙ্ক ও হিন্দি শেখানোর জন্য বিশেষ ক্লাস নেয়।
এ পর্যন্ত তারা কয়েক লাখ শিশুকে সাহায্য করেছে এবং দেড় লাখ মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করিয়েছে।
এজুকেট গার্লসের মীনা ভাটি আমাদের একটি বাড়িতে নিয়ে যায়। ওই পরিবারের চারটি মেয়েরই অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়েছিল।
এখন পরিবারটি তাদের পাঁচ নম্বর কন্যা সন্তানকে ১৪ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে তাকেও স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনেছে।
“তাদের বাপমা মনে করে মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে কোন লাভ নেই,” মীনা জানান।
“বাপ-মা যখন মাঠে যাবে কৃষিকাজ করতে বা কায়িক শ্রমের কাজ করতে, মেয়ে তখন ঘরের কাজ করবে, গরুবাছুর দেখবে এবং ছোট বাচ্চাদের মানুষ করবে। মেয়েদের জন্য লেখাপড়া সময় নষ্ট।”
সাফিনা হুসেন গড়ে তুলেছেন এই এজুকেট গার্লস সংস্থা। সাফিনা মনে করেন তিনি লেখাপড়া শিখেছেন বলেই জীবনে যেটা করতে চাইছেন করতে পারছেন।
ভারতে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী আনুমানিক ৩০ লাখ মেয়ে স্কুলে যায় না।
এজুকেট গার্লসের স্বেচ্ছাসেবী মীনা

কিশোর বয়সেই বধূ
মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকার অন্যতম প্রধান একটা কারণ হল বাল্য বিবাহ।
“রাজস্থানে ১৮ বছরের কম বয়সে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মেয়ের ১০ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।”
ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতে কিশোরী বধূর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
প্রায় অর্ধেক ভারতীয় নারীর বিয়ে হয়েছে বিয়ের বৈধ বয়স ১৮র আগেই।
বেশিরভাগ মেয়েকে কীধরনের চাপের মধ্যে থাকতে হয় তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে এজুকেট গার্লস দলের একজন সদস্য নীলাম বৈষ্ণবের। তার বৌদির ভাইয়ের সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া হয় যখন তার বয়স ১৪।
প্রথা অনুযায়ী স্বামীর পরিবারের সঙ্গে সে থাকতে শুরু করে বিয়ের পরপরই। তবে শর্ত ছিল যে তাকে স্কুলে যেতে দিতে হবে।
স্বামীর পরিবারের সদস্যরা যখন সেই অঙ্গীকার রাখল না, তখন নীলাম ঠিক করল এই বিয়ে এখন ভেঙে দেওয়াই ভাল।
“আমি বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত যখন নিলাম, তখন অনেক সমস্যা হয়েছে। গ্রামের সবাই আমাকে নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করত। আমাকে নানা কিছু বলত। তারা এখনও অবশ্য বলে। আমার শ্বশুর শাশুড়ী বলেছিলেন আমি চরিত্রহীন, আমার লজ্জাশরম নেই,” তিনি বলেন।

সবচেয়ে বড় সম্পদ
ইতোমধ্যে ভাগওয়ান্তি স্কুলে তার ভবিষ্যত নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে: “লেখাপড়া শেষ করে আমি শিক্ষিকা হতে চাই এবং অন্য মেয়েদের পড়াতে চাই। কারণ লেখাপড়া শিখলে সাহস বাড়ে,” সে বলে।
“আমি যদি নিজের দুপায়ে দাঁড়াতে পারি এবং একটা চাকরি পাই,আমি আমার পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে পারব।”
সাফিনা এসব কথা শুনে উৎসাহ বোধ করেন। কারণ তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে পরিবারের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ব্যাপারে মেয়েরা গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা পালন করে। মেয়েরা শিক্ষিত হলে ভারতের অনেক বড় বড় সমস্যার সম্ভব হবে।
ইউনেস্কো বলছে একজন মেয়ের প্রতি একবছর বাড়তি শিক্ষা শিশুমৃত্যুর হার ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে আনবে। এবং তার জীবনভোর আয়ের পরিমাণ ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে।
“উন্নয়নের যে কোন সূচকের কথা বলুন, মেয়েরা শিক্ষা পেলে তা বাড়তে বাধ্য। কাজেই সে অর্থে আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ মেয়েরাই,” বলছেন সাফিনা হুসেন।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের এই অনুষ্ঠানের অর্থায়ন করেছে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস্ ফাউন্ডেশন।



