উপমহাদেশশিরোনাম

ভারতে ঘোড়ায় চড়া, জুতা পরায় দলিতদের উপর হামলা

গত রোববার দলিত সম্প্রদায়ের এক বর ঘোড়ায় চড়ে তার বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতে চাইলে গ্রামবাসীরা তাকে হুমকি দেয়। তারা মনে করে, শুধু উচ্চবর্ণের লোকেরাই ঘোড়ায় চড়তে পারবেন। এই হুমকির কারণে পুলিশকে বিয়ের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। তখন বরযাত্রায় কয়েক ঘণ্টা বিলম্ব ঘটে।
এখানে এমন কিছু কারণ তুলে ধরা হলো যার ফলে শুধুমাত্র গত মাসেই দলিত সম্প্রদায়ের লোকজনকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
ঘোড়ায় চড়ায় হুমকি
গুজরাট রাজ্যের ঘটনা। প্রশান্ত সোলানকির বয়স কুড়ির ঘরে। গত ১৭ই জুন তিনি বিয়ে করতে যাচ্ছিলেন একটি ঘোড়ায় চড়ে। সেই ঘোড়াটিকে সাজানো হয়েছিল নানা রঙ দিয়ে।
তখন এই বরযাত্রাকে ঘিরে ধরে একদল উচ্চবর্ণের গ্রামবাসী। তারা দাবি জানায় যে শুধু উচ্চবর্ণের লোকেদেরই ঘোড়ায় আরোহণের অধিকার আছে। শুধু তাই নয়, তারা হুমকি দেয় যে ঘোড়া থেকে না নামলে মি. সোলানকি ও তার পরিবারের উপর হামলা করা হবে।
এই পরিস্থিতিতে পুলিশ তাকে পাহারা দিয়ে কনের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানে নিয়ে যায়।
এধরনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও দলিত সম্প্রদায়ের কোন সদস্য ঘোড়ায় চড়ার কারণে হুমকি দেওয়া হয়েছে। একই রকমের ঘটনা ঘটেছিল ২০১৫ সালে মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে যেখানে একজন বরকে ঘোড়ায় চড়ার কারণে গ্রামবাসীরা তার দিকে পাথর ছুঁড়ে মেরেছিল।
পায়ের উপর পা উঠিয়ে বসায় হত্যা
এই ঘটনাটি তামিলনাডুর। মন্দিরে অনুষ্ঠান চলছিল। এমন সময় দলিত সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি তার পায়ের উপর পা তুলে বসেছিল উচ্চবর্ণের একদল হিন্দুর সামনে। একারণে তার উপর আক্রমণ চালানো হয় এবং তাতে দলিত সম্প্রদায়ের দু’জন নিহত হয়।
আক্রমণকারীদের বক্তব্য হলো- তাদের সামনে এভাবে পা তুলে বসা তাদেরকে ‘অসম্মান ও অপমান করার সামিল।’ তারপরই তারা ওই ব্যক্তির বাড়িতে হামলা চালায়। পুলিশ জানায়, এতে দু’জন নিহত হওয়া ছাড়াও আরো ছ’জন গুরুতর আহত হয়। ভাঙচুর করা হয় তাদের বাড়িঘরেও।
সাঁতার কাটায় মারধর
এই ঘটনাটি গত সপ্তাহের। ঘটেছে মহারাষ্ট্রে। পুলিশ বলছে, উচ্চবর্ণের এক পরিবারের একটি কুয়ায় সাঁতার কাটার কারণে তিনটি দলিত বালককে মারধর করা হয়। পরে তাদেরকে নগ্ন করে ঘুরানো হয় গ্রামের ভেতরে।
এই ঘটনার একটি ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হয়ে পড়েছিল। তাতে দেখা যায় যে এক ব্যক্তি বালকদের দু’জনকে লাঠি ও বেল্ট দিয়ে আঘাত করছে। বালকরা তখন কিছু পাতা দিয়ে নিজেদের শরীর ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে। পেছনে তখন হাসির শব্দও শোনা যাচ্ছিল।

কুয়ায় সাঁতার কাটার কারণে নগ্ন করে পেটানো হয় তিন বালককে।

ওই বালকদের একজনের মা বিবিসির মারাঠি বিভাগকে বলেছেন, “আমরা এখনও আতঙ্কে থাকি যে আবারও হামলা হতে পারে। তিনি জানান যে ভিডিওটি দেখে তিনি প্রথম এই ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পারেন।
এই হামলার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে পুলিশ দুৎজনকে আটক করেছে।
‘দামী’ জুতা পরায় মারধর
এই ঘটনাটিও গুজরাটের। ১৩ বছর বয়সী এক দলিত বালক ‘মজরিস’ নামের দামী জুতা পরার কারণে তাকে পেটানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই জুতাটি চামড়ার। ভারতের কোন কোন অংশে সাধারণত উচ্চবর্ণের হিন্দুরা এই জুতা পরে থাকেন।
স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বালকটির কাছে একদল লোক প্রথমে জানতে চান সে কোন বর্ণের। তখন বালকটি তাদেরকে জানায় যে সে দলিত সম্প্রদায়ের। তখন তারা তাকে ‘জিন্স, মজরিস জুতা এবং সোনার চেইন পরে উচ্চবর্ণের সদস্য সাজার’ অভিযোগে মারধর করে।
ভারতে জাতিবিদ্বেষ আইনত নিষিদ্ধ কিন্তু তারপরেও এধরনের ঘটনা প্রচুর ঘটছে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে দলিতদের বিক্ষোভ।

গত সপ্তাহে এই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল। তাতে দেখা যায় মহেশ নামের বালকটিকে যখন লাঠি দিয়ে মারা হচ্ছে তখন সে মাফ চাইছিল।
তারপর থেকে সে পুলিশের প্রহরায় আছে বলে খবরে বলা হয়েছে।
ফেসবুকের নামকে ঘিরে সহিংসতা
এটিও গুজরাটের ঘটনা। ২২ বছর বয়সী দলিত এক ব্যক্তি মলিক যাদভ ফেসবুক প্রোফাইলে তার নামের সাথে একটি নাম যুক্ত করার পর দলিতদের সাথে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
তিনি তার নামের সাথে যে শব্দটি যুক্ত করেছিলেন সেটি হচ্ছে ‘সিন’। ওই রাজ্যে সাধারণত উচ্চবর্ণের হিন্দুরা তাদের নামে সাথে এই শব্দটি ব্যবহার করে থাকে।
“আমি আমার নাম ‘মলিক’ থেকে বদলে ‘মলিকসিন’ লিখেছিলাম। ভেবেছিলাম আমার পছন্দ অনুসারে আমি হয়তো যে কোন নামই রাখতে পারি। আমার সেই স্বাধীনতা আছে,” হিন্দুস্তান টাইমসকে একথা বলেন মি. যাদভ। তিনি জানান, এরপর থেকে ফেসবুকে এবং ফোনে তাকে হুমকি দেওয়া শুরু হয়। “তারা বলতে থাকে আমার নাম থেকে ‘সিন’ শব্দটি তুলে নিতে। তারা বলে যে না নিলে খারাপ পরিণতিও হতে পারে।”
এই হুমকি সহিংসতায় গিয়ে গড়ায়। উচ্চবর্ণের একদল লোক গিয়ে হামলা করে মি. যাদভের বাড়িতে। তার প্রতিশোধ নিতে দলিত বাসিন্দারা হামলা করে উচ্চবর্ণের কিছু হিন্দুদের বাড়িতেও। বিবিসি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button