স্পটলাইট

বয়স যখন বাড়তে থাকে

: অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী :
প্রতীকী ছবি
বুড়ো হওয়া মানে পক্ক কেশ, লোলচর্ম, ফোকলা দাঁত, তা কেন? সজীব বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরও দেখা মেলে। তবে বুডো হতে থাকি যখন তখন কিছু পরিবর্তন তো ঘটেই শরীরে।
১. যেমন-বুড়ো হতে থাকলে খাওয়াও কমে কিন্তু। যেমন-৩০ বছর বয়সে যে পরিমাণ ক্যালোরি চাই খাদ্যে, ৮০ বছর বয়সে ২০শতাংশ ক্যালোরি কম লাগে। বৃদ্ধ বয়সে কাজকর্ম কমে যাওয়াতে এমন হয়। তবে শরীর ক্যালোরি পোড়ায়ও ধীরে ধীরে। আর কম খেলেও খেয়াল রাখতে হবে উপযুক্ত পরিমাণে ভিটামিন ও ক্যালসিয়ামও যেন গ্রহণ করা হয়। শরীর হয়ত কিছু পুষ্টি উপকরণ ঠিকমত শোষণও করতে পারে না। কিন্তু ওষুধ যেমন-এন্টাসিড শোষন ব্যহত করতে পারে। স্বাস্থ্যকর আহার হৃদযন্ত্র, স্মৃতিশক্তি ও হাঁড়ের শক্তির সুরক্ষার জন্য বড় প্রয়োজন।
বয়স চল্লিশ পেরুলে প্রায় প্রত্যেকেরই ২ ফিটের চেয়ে সন্নিকটে জিনিষপত্র দেখতে কষ্ট হয়। যেমন মেনুকার্ড দেখতে অসুবিধা হলো। পূর্ণ বয়স্কদের এমন দেখার সমস্যা হয় যাকে বলে প্রেসবায়োপিয়া বা চালেস। মানে কাছের জিনিষ দেখতে সমস্যা। তবে কম করচেই রিড়িং গ্লাস, যাতে ম্যাগনিফায়িং গ্লাস রয়েছে, পরলে সমস্যা দূর হয়, যা সহজেই কোন ফার্মেসিতে বা চশমার দোকান থেকে পেতে পারেন। যারা ইতিমধ্যে চশমা পরছেন এদের জন্য বাইফোকাল। চোখের ডাক্তার দেখাবেন প্রয়োজন হলে।
২. চিন্তাশক্তি বয়স ২০ পেরুলেই ক্রমে ক্রমে কমতে থাকে একথাটি ঠিক নয়। ২০ বছর হতে হতে মগজ পায় সর্বোচ্চ আয়তন। এরপর ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে শুরু করে কালক্রমে রক্ত চলাচলও কমতে শুরু করে। তবে কিছু ধরণের স্মৃতি আছে যেগুলো জীবনভর উন্নতির পথে যেতে শুরু করে। যেমন- কোনও তত্ব বা তথ্য পুন:স্মরণের ক্ষমতা। প্রতিদিনের জীবন যাপন কি স্মৃতি বেপথু হয়। চাবি হারিয়ে ফেলা খুব স্বাভাবিক, তবে চাবি কি, কি কাজ করে তা ভোলা অবশ্য ভাবনার বিষয়।
৩. বয়স যত বাড়ে যত বুড়ো হই, শিশু ও নারীদের কণ্ঠস্বর শোনায় এবং একটু কষ্ট হতে পারে। নারী ও শিশুদের কণ্ঠস্বর উচ্চনাদী এবং সাধারণত: বুডোরা উচ্চ নারী কণ্ঠস্বর শুনতে প্রথম অসুবিধা বোধ করেন। কালক্রমে কানের ভেতরে যে হেয়ার সেলগুলো মগজে শব্দ তরঙ্গ পাঠায় সেগুলো দুর্বল হতে থাকে। তখন ‘পি’ ও ‘টি’র মধ্যে পার্থক্য ধরতে কষ্ট হয়। একে বলে ‘Pres bycusis’ অবশ্য বংশগতি, উচ্চ শব্দ, অসুখ বা কানে মল জমলেও এমন হতে পারে।
৪. বুড়ো হতে থাকলে দেহের দৈর্ঘ্য একটু কমতে পারে বৈকি। ৩০-৭০ বছর বয়সের মধ্যে পুরুষদের দেহের দৈর্ঘ্য এক ইঞ্চি কমতে পারে এবং মেয়েরা ২ ইঞ্চি। ৮০ বছর বয়সের পর নারী পুরুষ উভয়ের দৈঘ্য আরও কমতে পারে। হাড়ের গিটের ভেতরের কোমলাস্থি ক্ষয়ে যায় এবং শিরদাড়া কিছুটা বসে যায়, পেশী দুর্বল হয়, তাই ধরে রাখতে পারে না শরীরকে সোজা করে। অস্থি ফোপরা হলে বিপত্তি আরও বাড়ে। তবু খুব দ্রুত শরীরের দৈঘ্য কমে গেলে সতর্ক হতে হবে, হয়ত শিরদাড়া ও কোমরের হাড় ভেঙ্গে যাবার আশংকা রয়েছে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
৫. বুড়ো হলে শরীরের কোন বৈশিষ্ট্য বা অঙ্গ বড় হতে থাকে। আমাদের কানের ভেতরে কোমলাস্থি বাড়তেই থাকে, এতে কান কিছুটা দীর্ঘ হয়ে যায়। নাক একটু বড় লাগতে পারে, কারণ এর ভেতরে সংযোক কলা দুর্বল হয় এবং এতে নাক বসে যায়/ঝুলে যায়।
৬. বুড়ো হলে মূত্রাশয়ের নিয়ন্ত্রণ থাকে না এটাও ঠিক নয়। মূত্রাশয়ের সমস্যা বুড়ো হলে অনেক সময় বাড়ে, কিন্তু প্রত্যেকের ক্ষেত্রে নয়। এবং একে নিয়ে বসবাস করতে হবে তাও নয়। মূত্রাশয়ের সমস্যার চিকিত্সার নানা উপায় রয়েছে, খাওয়া দাওয়া পরিবর্তন বা পানীয় গ্রহণ পরিবর্তন থেকে শুরু করে ওষুধ বা সার্জারির অনেক উপায় আছে।
৭. বুড়ো হলে দেহে কেন দেখা যায় কুঞ্চন রেখা? ২০ বছর পেরুলে ত্বক বুড়ো হতে থাকে। শরীর ততটা কোলাজেন বা ইলাস্টিন প্রোটিন তৈরি করেনা, যা ত্বককে কোমল, টানটান ও দৃঢ় রাখে। ত্বক পাতলা করে রাখে এবং স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়। রোদে বেরুলে সানসক্রিন ব্যবহার করুন, ধূমপান করলে ছাড়ুন।
৮. বুড়ো হলে স্ত্রী পুরুষের উভয়ের শরীরে গজাতে পারে অবাঞ্চিত লোম। ঋতু বন্ধের পর নারীদের মাথায় কেশহানি হতে পারে কিছুটা, লোম গজাতে পারে চিবুকে বা ঠোটের উপর। ইস্ট্রোজেন কমে যায় সেজন্য, এটি বাধক্য প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ মাত্র। পুরুষরা বুড়ো হলে মাথায় কেশের অবস্থান পরিবর্তন হতে পারে, কেশহানি হতে পারে এবং কানে ও নাকে কিছু লোম গজাতে পারে।
৯. বুড়ো হলে বেশি ঘুম দরকার হয় না তা নয়। পূর্ণবয়স্ক জীবনে ঘুমের চাহিদা থাকে একই রকম। তবে বুডো লোকদের ঘুমিয়ে পড়তে সময় লাগে বেশি। বেশি সময় হালকা ঘুম, রাতে বার বার ঘুম থেকে উঠে পড়া। বদলে যায় দেহ ঘড়ি।
১০. বুড়োরা কি তরুণদের চেয়ে বেশি আশাবাদ? বয়স্করা জীবনের বৌদ্রালোকিত দিকগুলো দেখতে চান, মনে করতে চান সুখের স্মৃতি। অতীতের কথা মনে করে আনন্দ অনুভব করতে চান তারা। গবেষকরা বলেন।
লেখক : পরিচালক, ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস
বারডেম, ঢাকা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button