
রতন রায়হান, রংপুর: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ ব্রাকসু এবং তিনটি হল সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রংপুর ক্যাম্পাসে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর এ নির্বাচনের আয়োজন হতে যাচ্ছে বলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও রাজনৈতিক উত্তাপ। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রভাবশালী ছাত্রগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত শিবির সমর্থিত প্যানেল “বেরোবি শিক্ষার্থী পরিষদ” নামে শিবির তাদের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে। মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্যানেলটি ঘোষণা করেন সংগঠনটির উপদেষ্টা ও বেরোবি শাখা শিবিরের সভাপতি মো. সুমন সরকার। এতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তিনটি হল সংসদ পর্যন্ত মোট ৩০ জনের মতো প্রার্থী অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, ঘোষিত প্যানেলের বিভিন্ন পদপ্রার্থী ও সমর্থক শিক্ষার্থীরা। ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্যানেলটি নিয়ে আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। বেরোবিতে স্বাধীন শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল। এর ফলে, প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, নানান দাবি-দাওয়ার জট, আবাসিক সমস্যা, পরিবহন সংকট, শিক্ষা–গবেষণার অসংগতি, এসব ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ব্রাকসু নির্বাচন শুধু একটি ইভেন্ট নয়, বরং এটি নতুন নেতৃত্ব তৈরি, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের পথ সুগম এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে জবাবদিহিতা বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঘোষিত কেন্দ্রীয় সংসদের প্যানেলটি হলো, কেন্দ্রীয় সংসদ (ব্রাকসু) ভিপি (সহ-সভাপতি) আহমাদুল হক আলবীর। জিএস মো. মেহেদী হাসান। এজিএস বায়েজিদ শিকদার।মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র সম্পাদক জাহিদ হাসান জয়। বিজ্ঞান–প্রযুক্তি–স্বাস্থ্য–পরিবেশ সম্পাদক ইমরান খান। ক্যারিয়ার ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক উম্মে হানি তানিয়া। সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক আব্দুল কাদের। ক্রীড়া ও সমাজসেবা সম্পাদক শোভন। পরিবহন সম্পাদক শিবলী সাদিক। প্রকাশনা ও গবেষণা সম্পাদক মুয়াজ। কার্যনির্বাহী সদস্য (৩ জন) বায়েজিদ বোস্তামী, আল হুমায়রা ঐশী, মরিয়ম জামিলা। নারী নেতৃত্বের উপস্থিতি ও উচ্চ শিক্ষাগত পটভূমির প্রার্থীরা শিক্ষার্থীদের মাঝে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করছেন। হল সংসদের তিন প্যানেল, মেয়েদের হলে নতুন মুখ। বিজয়–২৪ হল,ভিপি আব্দুল মজিদ। জিএস নেজাজ। এজিএস আব্দুল আহাদ। শহীদ মুখতার ইলাহী হল, ভিপি শাকিব আল হাসান। জিএস মুশফিক রহমান শুভ। এজিএস কাইয়ুম উদ্দিন।শহীদ ফেলানী হল (মেয়ে) ভিপি সানজিদা ইসলাম।জিএস সুমাইয়া তাহরীমা শিথিল। এজিএস জেসমিন আক্তার। মেয়েদের হলে প্রার্থীদের উপস্থিতি ও তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নির্বাচনকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করবে বলে শিক্ষার্থীদের ধারণা।
ভিপি প্রার্থী আহমাদুল হক আলবীর বলেন,“বেরোবির একাডেমিক পরিবেশ ধীরে ধীরে সংকটে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের আবাসিক সংকট, পরিবহন সংকট, পর্যাপ্ত ক্লাসরুম না থাকা—এসব সমস্যায় তারা প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়ে। আমরা নির্বাচিত হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ সব সমস্যার সমাধান করব।” তিনি আরও বলেন,“জুলাইয়ে আবু সাঈদ হত্যার বিচার আজও হয়নি। শিক্ষার্থীরা এখনো রক্তাক্ত স্মৃতিতে বেদনার্ত। নির্বাচিত হলে এই ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতেও আমরা পদক্ষেপ নেব। আমাদের ইশতেহার হবে শিক্ষার্থীবান্ধব, বাস্তবসম্মত। ব্রাকসু নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস। ক্যাম্পাসের ক্যান্টিন–গ্যালারিতে আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইন এসব মিলিয়ে পরিবেশ এখন পুরোপুরি নির্বাচনমুখী।
ছাত্ররা বলছেন “বছরের পর বছর ধরে ক্যাম্পাসে কার্যকর নেতৃত্ব ছিল না। এই নির্বাচন আমাদের ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করবে।” বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘর্ষ প্রতিরোধে মাঠে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভোটার তালিকা তৈরিতে কঠোর যাচাই বাছাই। পোস্টার–ব্যানার–মাইক ব্যবহারের নির্দিষ্ট নীতিমালা। শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি কেন্দ্র পরিচালনা। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিতে সময়সূচি প্রকাশ। প্রশাসন আরও বলেছে “আমরা চাই শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর, স্বচ্ছ নির্বাচন। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।”
শিক্ষার্থী তানজিলা বলেন, “দীর্ঘদিন পর নির্বাচন হচ্ছে। আমরা চাই স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব। ”শিক্ষার্থী রাফি বলেন, “আবাসিক সংকট আমাদের প্রধান সমস্যা। যে প্যানেলই নির্বাচিত হোক, এই সমস্যা সমাধান করতেই হবে।”
মেয়েদের হলের শিক্ষার্থীদের বড় অংশ বলছেন। “নিরাপত্তা ও ডাইনিংয়ের মান উন্নয়ন জরুরি।” শিবির সমর্থিত প্যানেল ঘোষণা করার পর নির্বাচনী প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছাত্রদল ও অন্যান্য সংগঠনের প্যানেল ঘোষণার পর মূল ভোটযুদ্ধ নির্ধারিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে প্রশ্ন একটাই আগামী দিনের ব্রাকসু কার হাতে?




