sliderস্থানিয়

বোয়ালমারীতে’পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মাঠ সহকারীর বিরুদ্ধে ৪৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, বরখাস্ত

বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি : ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের (একটি বাড়ি, একটি খামার) কামনা রানী বিশ্বাস (৩৯) নামে এক মাঠ সহকারীর বিরুদ্ধে ৪৮ লাখ ৭৩ হাজার ৪ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সাথে তাকে ফরিদপুর জেলা থেকে রাঙামাটি জেলার আঞ্চলিক কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে তিনি রাঙ্গামাটি জেলায় যোগদান করলেও গত ২৭ জুলাই থেকে তার বর্তমান কর্মস্থল রাঙ্গামাটি অফিসে তিনি অনুপস্থিত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

তবে তার এলাকা থেকে কয়েকজন ব্যবসায়ী ও গ্রাহকরা জানিয়েছেন, জমিজমা বিক্রি করে কামনা রানী বিশ্বাস এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেছেন! চলতি বছরের ২ জুন সাময়িক বরখাস্তের আদেশে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় উল্লেখ করেন, আপনি কামনা বিশ্বাস (শ-১৬২),মাঠ সহকারী, বোয়ালমারী শাখা, ফরিদপুর; উক্ত শাখায় মাঠ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে অর্থ আত্মসাত মূলক অপরাধ সংঘটনের দায়ে আপনাকে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ২০২২ এর ৫৭(১) বিধি মোতাবেক সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো।

আদেশে আরো বলা হয়, প্রশাসনিক কারণে আপনাকে জেলা (আঞ্চলিক) কার্যালয়, রাঙ্গামাটি-এ সংযুক্ত করা এবং সংযুক্ত কর্মস্থলে আগামী ০৩.০৬.২০২৫ তারিখের মধ্যে যোগদানের জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো। গত ২ জুন আদেশটি স্বাক্ষর করেছেন পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক এ. বি. এম জাহিদ হোসেন। এরপর তিনি রাঙ্গামাটি জেলায় যোগদান করেন। এর আগে গত ২০ এপ্রিল প্রধান কার্যালয়ের ০৮.০৪.২০২৫ তারিখের পসব্য/প্রকা/নিরীক্ষা-০৫/২০২৪-২০২৫/২৩১৫ নম্বর স্মারকে কামনা বিশ্বাসকে সর্তক করে কারণ দর্শানোর নোটিশে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৫ এপ্রিল হতে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত ফরিদপুরের বোয়ালমারী শাখায় নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। নিরীক্ষা (অডিট) রিপোর্টে মাঠ সহকারী কামনা রানী বিশ্বাস ইতঃপূর্বে ১ম পর্যায়ের রিপোর্টে ১,৬১,৮২৪ টাকা হস্তমজুদ রয়েছে। ওই সময়ের নিরীক্ষা চলাকালে তিনি ওই টাকা পরিশোধ করেছিলেন। সেখানে আরো বলা হয়, প্রথমবার সর্তক করার পরেও কামনা বিশ্বাস ৩য় পর্যায়ে সমিতির সদস্যদের সঞ্চয় ও ঋণের কিস্তি ৪৮ লাখ ৭৩ হাজার ০০৪ টাকা হস্তমজুদ করেছেন। তিনি ভুয়া ঋণ হিসেবে ৭০ হাজার টাকা অনিয়ম করেন। যা নিয়মিত সমিতির পরিদর্শন ও উঠান বৈঠকে তার চরম দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়। কেন কামনা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবেনা; এই মর্মে তাকে ৭ দিনের মধ্যে শাখা ব্যবস্থাপকের মাধ্যমে জবাব দিতে বলা হয়। তিনি সময়মত জবাব না দেওয়ায় তাকে সাময়িক বরাখাস্ত করে রাঙ্গামাটি জেলায় সংযুক্ত করা হয়।

পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ফরিদপুরের বোয়ালমারী শাখা সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালে তৎকালীন সরকার ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্প হিসেবে চালু করে পরবর্তীতে ‘আমার বাড়ি, আমার খামার’ প্রকল্প রূপান্তর করে এবং ২০১৬ সালের জুন মাস থেকে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক হিসেবে চলতে থাকে। এরপরে ২০২১ সালে প্রকল্পটি শেষ হয়ে একটি রাষ্ট্রয়ীত বিষেশায়িত ব্যাংক হিসেবে ‘পল্লী সঞ্চয়’ ব্যাংক হিসেবে চলমান থাকে। কামনা রানী বিশ্বাস ২০১৪ সালের ২৭ জানুয়ারি মাঠ সহকারী পদে চাকরিতে যোগদান করেন। তিনি উপজেলার রূপাপাত ইউনিয়নের ১৪টি সমিতির দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ওই সমিতি গুলোর সদস্যদের লোন উত্তোলন ও লোনের কিস্তি তোলার দায়িত্ব ছিল তার। ১৪টি সমিতির মোট সদস্য সংখ্যা ১৭৪ জন। ২০১৬ সালে কামনা রানী বিশ্বাসের চাকরি স্থায়ী হয়। প্রথম পর্যায়ে তিনি লোন উত্তোলন ও লোনের কিস্তির ঠিকমত লেনদেন করলেও ২০১৬ সাল থেকে তিনি লোনের কিস্তি নিয়মিত উঠালেও ঠিকমত অফিসে জমা না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দেন। এক পর্যায়ে গত ৯ বছর অর্থ আত্মসাতের ৪৮ লাখ ৭৩ হাজার ৪ টাকার মধ্যে সমিতির সদস্যদের লোনের টাকা রয়েছে ১০ লাখ আর কিস্তির টাকা রয়েছে ৩৮ লাখ ৭৩ হাজার ৪টাকা।

সম্প্রতি ব্যাংকের নিরীক্ষা কমিটির অডিটে কামনা রানী বিশ্বাসের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমানিত হয়। এরমধ্যে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের বোয়ালমারী শাখা তাকে চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি শোকজ করেন। এরপর কামনা রানী বিশ্বাস গত এপ্রিল মাসে ৫ লাখ টাকা অফিসে জমা দেন।

শুক্রবার (২২ আগস্ট) সকালে সরেজমিন বিষয়টি অনুসন্ধানে গেলে রূপাপাত ইউনিয়নের কালিনগর গ্রামের বাসিন্দা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের গ্রাহক প্রিয়া বেগমের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, অফিসে একদিন নিয়ে কাগজপত্র স্বাক্ষর করে আমাকে বাড়ি নিয়ে আসে। আমার নামে ৮০ হাজার টাকা লোন করে সে (কামনা বিশ্বাস) গায়েব করেছে। আমি কয়েক বার টাকার কথা বললে; দিতেছি, দিবানি বলে পাশ কাটিয়ে যান কামনা দিদি। একই দিনে কথা হয় রূপাপাত বাজারের ব্যবসায়ী লক্ষণ দত্ত (৬৫) সাথে। তিনি বলেন, আমার নামে ৪০ হাজার টাকা লোন করেছে কামনা বিশ্বাস। সেটা আমি জানতাম না। যে সময় ব্যাংকের লোকজন অডিটে গ্রাম আসলে আমি জানতে পারি, আমার নামে ৪০ হাজার টাকা লোন রয়েছে। এ রকম কালিনগর গ্রামের প্রায় ১০-১৫ জন পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের গ্রাহকের কথা হলে তারা জানান, তাদের ব্যাংকে লোন রয়েছে, কিন্ত তারা তা জানতেন না। টাকা গুলো মাঠ সহকারী কামনা বিশ্বাস তুলে নিয়েছেন।

বোয়ালমারী পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মাঠ সহকারী রাজেকা সুলতানা বলেন, কামনা রানী বিশ্বাস যে এতো টাকা আত্মসাত করেছে আমরা বুজতেই পারিনি। বিভিন্ন সময় কিস্তির টাকা জমা দেওয়ার জন্য তাকে চাপ দেওয়া হয়েছে। কিন্ত এতো টাকা আত্মসাতের বিষয়টি অডিটে ধরা পড়ে।

অভিযুক্ত বোয়ালমারী পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মাঠ সহকারী কামনা রানী বিশ্বাসের (০১৯০১৩১৯১৪৩) মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তিনি ফোনটি রিসিভি না করায় তার বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে কথা হয় তার স্বামী রনজিৎ বিশ্বাসের সাথে তিনি বলেন, আমরা ফেঁসে গেছি। গ্রাহকদের টাকা আমরা ফেরত দিয়ে দিবো। টাকা জোগাড় করার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছি।

পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. এখতিয়ার রহমান বলেন, মাঠ সহকারী কামনা রানী বিশ্বাস ২০১৬ সাল থেকে ১৪ টি সমিতির কিস্তির টাকা সদস্যদের কাছ থেকে উঠালেও অফিসে ঠিকমত জমা দেন না। তাকে চাপাচাপি করলেও সে কোন কথা শোনে না। আর এতো টাকা যে সে আত্মসাত করেছে আমরা বিষয়টি বুজতেও পারিনি। তার আত্মসাতের মোট ৪৮ লাখ ৭৩ হাজার ৪ টাকার মধ্যে ১০ লাখ টাকা লোন উত্তোলনের এবং ৩৮ লাখ ৭৩ হাজার ৪ টাকা রয়েছে লোন দেওয়ার গ্রাহকদের কিস্তির টাকা। তাকে এক বার শোকজও করা হয়েছে। সম্প্রতি অডিড করলে টাকা আত্মসাতের বিষয়টি ধরা পড়ে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, ওই মাঠ সহকারীর কাছ থেকে টাকা উঠানোর জন্য।

ফরিদপুর জেলা কর্মকর্তা সুব্রত হালদার বলেন, গ্রাহকদের টাকা আত্মাসাতের অভিযোগে মাঠ সহকারী কামনা রানী বিশ্বাসকে সাময়িক বরখাস্ত করে রাঙ্গামাটি জেলায় সংযুক্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। বরখাস্তের পরে তিনি একবার ফরিদপুর জেলা অফিসে এসেছিলেন পরামর্শের জন্য কিভাবে তিনি টাকাটা ফেরত দিবেন। ওই সময় তিনি (মাঠ সহকারী) বলেছিলেন হইতো জমিজমা বিক্রি করে টাকা ফেরত দিবেন। তবে আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত তার কাছ থেকে টাকা আদায় করে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য। গ্রাহকদের এতো টাকা মাঠ সহকারী জমা না দিয়ে নিজের কাছে কিভাবে রাখলেন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লেনদেনে এলোমেলো হচ্ছে বিষয়টি সরেজমিন পরিদর্শন করলে মাঠ সহকারীর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি জানতে পেরে ব্যাংকের বিধিনুযায়ী প্রধান কার্যালয়কে জানানো হয়। প্রধান কার্যালয় তাকে গত ২ জুন সাময়িক বরখাস্ত করে রাঙ্গামাটি জেলায় সংযুক্ত করেন।

পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের রাঙ্গামাটি জেলা কর্মকর্তা মো.সিরাজুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, প্রধান কার্যালয় থেকে ফরিদপুরের বোয়ালমারী শাখার মাঠ সহকারী কামনা বিশ্বাসকে বরখাস্ত করে এখানে সংযুক্ত করা হয়েছে। তিনি গত ৩ জুন এখানে যোগদান করে জুলাই মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত এই অফিসে কর্মরত ছিলেন। তারপর থেকে তিনি বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকায় চলতি মাসের ১১ আগস্ট তিনদিনের মধ্যে জবাব চেয়ে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) পর্যন্ত ওই নোটিশের কোন জবাব দেননি। আগামী সপ্তাহে আবারো ওই মাঠ সহকারী কামনা রানী বিশ্বাসকে অফিসে অনুপস্থিত থাকার জবাব চেয়ে পুনরায় তিনদিনের নোটিশ দেওয়া হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button