sliderস্থানিয়

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রোকেয়ার অস্তিত্ব নেই ‎

রতন রায়হান, রংপুর: জন্মভিটা দুই যুগ ধরে অবহেলার শিকার ‘নামে রোকেয়া, কাজে অনাহূত এক ভুলে যাওয়া নায়ক’

‎বাংলা নবজাগরণের অন্যতম আলোকবর্তিকা, নারীশিক্ষা ও নারীস্বাধীনতার সংগ্রামী পথিকৃৎ মহিয়সী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তার নামেই গড়ে উঠেছে উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)। কিন্তু নামের সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তীর্ণ সবুজ ক্যাম্পাসে নেই তার কোনো স্থায়ী স্মারক, নেই স্মৃতিস্তম্ভ, নেই ম্যুরাল, নেই গবেষণা কেন্দ্র—এমনকি নেই তার ব্যক্তিগত জীবন, দর্শন, নারীমুক্তি ভাবনার কোনো শিক্ষা–পাঠক্রমও। এর চেয়েও বেদনাদায়ক—রোকেয়ার নিজ জন্মভিটায় প্রতিষ্ঠিত রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র দুই যুগ ধরে পড়ে আছে ‘অবহেলার স্মৃতিফলক’ হয়ে। অযত্ন–অবজ্ঞায় বিলীনপ্রায় আঁতুরঘর, লুটে নেওয়া সম্পত্তি, ভেঙে পড়া দালান–কোঠা, নষ্ট দরজা–জানালা, তালাবদ্ধ কক্ষ, আগাছায় ঢেকে থাকা উঠান—সব মিলিয়ে রোকেয়ার স্মৃতি যেন হারিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে। যেখানে রোকেয়া আজীবন লড়েছেন নারীস্বাধীনতা, মানবিক মূল্যবোধ ও যৌক্তিকতার পক্ষে—সেই রোকেয়ার স্মৃতির এই পরিণতি আজ শুধু স্থানীয় নয়, দেশের সর্বত্রই তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছে। ১৯৯৭ সালে ভিত্তিপ্রস্তর, ২০০১ সালে উদ্বোধন—তারপর থেকে কেবলই লালফিতার দৌরাত্ম্য। ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন তৎকালীন সরকার রোকেয়ার জন্মভিটায় স্মৃতিকেন্দ্র স্থাপনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। ২০০১ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলেও কার্যক্রম কোনোদিনই পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। এরপর দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে। মন্ত্রণালয়ের ফাইলের পাতা ঘুরেছে, কমিটি হয়েছে, শুদ্ধি প্রস্তাব এসেছে, বরাদ্দ এসেছে আবার ফেরত গেছে, কিন্তু কার্যক্রম শূন্যের কোঠায়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের বেশিরভাগ কক্ষ তালাবদ্ধ, জানালা–দরজা ভাঙা,দেয়ালে শ্যাওলা জমে ইট খসে পড়ছে,স্থানীয়দের প্রবেশ করতে হয় আগাছায় ঢাকা পথ দিয়ে, সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ কোর্সগুলো দু–এক বছর চালু হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে, রোকেয়ার ঐতিহাসিক আঁতুরঘর জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়। দর্শনার্থী মৌমিতা ইসলাম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “রোকেয়ার আলোয় আমরা আলোকিত হয়েছি। অথচ তার স্মৃতি রক্ষা করা হয়নি। ঘরের দেয়াল খসে পড়ছে, ভিতরে প্রবেশ করতে ভয় লাগে।”

‎গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেন,“প্রতিশ্রুতি আসে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। জন্মভিটা পর্যটন কেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু মরে গেছে অবহেলায়।” যে ‘বেগম প্রথা’র বিরুদ্ধে রোকেয়া আজীবন সংগ্রাম করেছেন তার নামেই যুক্ত সেই শব্দ! এ ইস্যুটি এখন নতুন করে আলোচনায়। রোকেয়া কখনোই তার নামের আগে ‘বেগম’ ব্যবহার করেননি। জীবনের বেশিরভাগ লেখায় তিনি লিখেছেন Rokeya Sakhawat Hossain. বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাকে ‘বেগম’ যুক্ত করে প্রচার করার বিষয়টি বহু গবেষকের মতে একটি ঐতিহাসিক ভুল। রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সরকার মাজহারুল মান্নান বলেন,“যে প্রথার বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন, সেই শব্দ তার নামের অংশ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম সংশোধন করা জরুরি।” রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. তুহিন ওয়াদুদ আরও স্পষ্ট করে বলেন,“রোকেয়া বিয়ের পর স্বামীর নাম অনুসারে Sakhawat Hossain লিখতেন। কখনোই ‘বেগম’ লেখেননি। রাষ্ট্রীয়ভাবে নাম বিকৃত হওয়াটা অনুচিত।”

‎শত শত শিক্ষার্থী মনে করেন—বিশ্ববিদ্যালয় রোকেয়ার নাম ধারণ করলেও তার চিন্তা–দর্শন ধারণ করতে ব্যর্থ। বাংলা বিভাগের লাবনী সরকার বলেন, “রোকেয়ার চিন্তা–দর্শন পাঠক্রমে থাকা উচিত। তার দার্শনিক ভাবনা তুলে ধরা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় তার নামকে শুধু ব্যবহার করছে।” সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া জিম বলেন, “ক্যাম্পাসে স্থায়ী কোনো প্রতিকৃতি নেই। শুধু দিবসে অস্থায়ী প্রতিকৃতি বানালে সম্মান দেখানো হয় না।”

শিক্ষার্থী তানজিম তাফায়েমুম বলেন— “আমরা রোকেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কিন্তু তার জীবন–সংগ্রাম সম্পর্কে জানতে আলাদা বই খুঁজতে হয়। এটা লজ্জার।”

‎বেরোবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন,“রোকেয়ার নামে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় তার স্মৃতিচিহ্ন থাকা জরুরি। একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হচ্ছে। শিগগিরই সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

”তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা মনে করেন,“দীর্ঘ ১৭ বছরেও কোনো স্থায়ী উদ্যোগ না থাকা” এটি প্রশাসনিক উদাসীনতারই পরিচয়। প্রতি বছর রোকেয়া দিবসে নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সাংস্কৃতিক সংগঠকরা প্রতিশ্রুতি দেন “রোকেয়ার মরদেহ কলকাতা থেকে আনা হবে।” কিন্তু এখনো কোনো চিঠি–চালাচালি পর্যন্ত হয়নি।

স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন,“দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনার দাবি বহুদিনের। এটি জাতির সম্মানের বিষয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছু হচ্ছে না।”গবেষকরা বলছেন, জন্মভিটায় জাদুঘর, আর্কাইভ, লাইব্রেরি, স্মৃতি উদ্যান, আন্তর্জাতিক সেমিনার হলে শত শত গবেষকের আগমন ঘটতে পারত। রোকেয়ার ভাবনাকে কেন্দ্র করে নারী শিক্ষার বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা যেত। পায়রাবন্দ হতে পারত উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক পর্যটনের প্রধান গন্তব্য। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় সেই সম্ভাবনা এখনও অন্ধকারে।

‎রোকেয়া শুধু একজন সাহিত্যিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন, সমাজসংস্কারক, আধুনিক নারীশিক্ষার নকশা–প্রণেতা, যৌক্তিকতার প্রবক্তা, মাতৃভাষার সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার একজন দুর্ধর্ষ কলমসৈনিক।তার সংগ্রামের সারমর্ম ছিল, “নারীর শিক্ষা ও স্বাধীনতা ছাড়া সমাজের উন্নয়ন অসম্ভব।”কিন্তু আজ রোকেয়ার জন্মভিটা আর নামধারী বিশ্ববিদ্যালয়—দুটোরই বাস্তবতা তার দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর জন্ম, ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর মৃত্যু। দুই দিনই একই তারিখ,দুই চিহ্নিত দিন, এক মহীয়সী জীবন দেশজুড়ে নানা আয়োজনে রোকেয়া দিবস পালিত হলেও তার জন্মভিটায় নেই কোনো প্রাণচাঞ্চল্য।
‎কেবল তালাবদ্ধ দরজা, ফাটা দেয়াল আর ক্ষুব্ধ মানুষের দীর্ঘশ্বাস।

‎স্থানীয় মানুষের কথায়,“রোকেয়ার স্মৃতি রক্ষা মানে শুধু নির্মাণকাজ নয়; তার আদর্শকে এগিয়ে নেওয়া। জন্মভিটা সংস্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী স্মৃতি–স্থাপনা, নামের ভুল সংশোধন—সবই এখন সময়ের দাবি।” গবেষকরা বলছেন“রোকেয়া নারীজাগরণের জননী। তার কর্মধারাকে অবহেলা করা মানে ইতিহাসকে খাটো করা।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button