শিরোনামসুস্থ থাকুন

বিষমুক্ত ফল চাষ করেন যশোরের আফজাল

ফলের উৎপাদন বাড়াতে সার-কীটনাশক এবং বিক্রির জন্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় রাসায়নিক। যা মানবদেহে সৃষ্টি করছে নানা জটিল রোগ। আর এসব ফলই কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে মানুষের জন্য। তাই এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে বিষমুক্ত ফল খাওয়ার জন্য প্রচার শুরু করেন আফজাল হোসেন (৩৯)।
এ কারণে নিজেই গড়ে তুলেছেন বিষমুক্ত ফলবাগান। সেই বাগান থেকে ফল এনে মানুষকে খাওয়ান। তার এমন কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিষমুক্ত ফলের বাগান করেছেন কয়েকজন তরুণ। আফজালের বাড়ি যশোরের মনিরামপুর উপজেলার লাউড়ী গ্রামে। প্রথম আলো’র বিশেষ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে আসে।
আফজাল বাগানে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন না। সার হিসেবে ব্যবহার করেন নিজের তৈরি ট্রাইকো কম্পোস্ট ও কেঁচো কম্পোস্ট। পোকা দমনে কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করেন প্রাকৃতিক বালাইনাশক। ব্যবহার করেন আলোর ফাঁদ। অপচয় রোধে গাছে পাইপ দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি দেন। উৎপাদিত ফল ভালো মানের থলেতে ভরে বিক্রি করেন।
মোট ২৩ বিঘা জমিতে আফজাল হোসেনের ফলের বাগান। ২০১৩ সালে বাগান শুরু করেন তিনি। বাগানে এখন ২১ প্রজাতির ২ হাজার ফলের গাছ রয়েছে। এসব ফলের মধ্যে রয়েছে মাল্টা, চায়না কমলা, থাই পেয়ারা, দেশি ও কাশ্মীরি আপেলকুল, কাঠিমন, বারি-৮,আম্রপালি, মল্লিকা ও চোষা আম, দেশি ও থাই জাতের আমড়া, ড্রাগন, মালয়েশিয়ান শরবতি লেবু, থাইল্যান্ডের কাগজি লেবু, আঙুর, লটকন, ভিয়েতনামের হাইব্রিড নারকেল, কতবেল, বিলাতি গাব ও শরিফা (আতাজাতীয় ফল)। এছাড়া তিনি বাগানে পরীক্ষামূলক কাশ্মীরি আপেল ও নাশপাতির চারা লাগিয়েছেন। সারা বছর তার বাগানে কোনো না কোনো ফল থাকে।
দেখা যায়, আফজালের বাগানে গাছের ডালে ঝুলে আছে অসংখ্য মাল্টা। একটু দূরে ঝুলছে পেয়ারা, আমড়া, ড্রাগন, লটকন। এক বাগানে ২১ প্রজাতির ফল। সেখানে কাজ করেন ১০ জন লোক।
নিরাপদ ফলের ধারণা আফজালের মধ্যে আসে ২০১৩ সালে ফলবাগান করার পর। তিনি দেখলেন, বাজারে যেসব ফল বিক্রি হচ্ছে, তাতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিদেশ থেকে যেসব ফল আসছে, সেগুলোও সংরক্ষণ করা হচ্ছে রাসায়নিক দিয়ে। ২০১৫ সাল থেকে তিনি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই নিরাপদ ফল উৎপাদন শুরু করেন।
আফজাল জানান, সাধারণত ফলের বাগানে রাসায়নিক সার ছাড়াও তিন মাত্রার কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এসব কীটনাশক ছত্রাক, পোকামাকড় ও উড়ন্ত পোকা দমনের জন্য ব্যবহার করা হয়। স্বল্প মাত্রার কীটনাশকের মেয়াদ থাকে ৮-১০ দিন, মাঝারি মাত্রার ২০-৩০ দিন এবং দীর্ঘ মাত্রার কীটনাশকের মেয়াদ থাকে ১ মাসের বেশি। এসব কীটনাশক প্রয়োগ করে যে ফল উৎপাদন করা হয়, তা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কীটনাশক প্রয়োগ পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর।
আফজাল হোসেনের দেখাদেখি এলাকার অন্তত পাঁচ ব্যক্তি নিরাপদ ফলের বাগান করেছেন। তারা হলেন মনিরামপুর উপজেলার মাছনা গ্রামের বেলাল হোসেন, লক্ষ্মণপুর গ্রামের আবদুর রহমান, মুজগুন্নী গ্রামের আবদুল করিম, লাউড়ী গ্রামের আল আমিন ও বাঙ্গালীপুর গ্রামের মো. আসাদুজ্জামান।
মনিরামপুর উপজেলার লক্ষ্মণপুর গ্রামের আবদুর রহমান বলেন, ‘আফজাল হোসেনকে দেখে দেড় বিঘা জমিতে আমি বিষমুক্ত ফলের বাগান করেছি।’
বিষমুক্ত ফল উৎপাদন ও এই ফল খাওয়ার জন্য প্রচার চালাতে মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ান আফজাল। গ্রাম থেকে গ্রামে। সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন। বাজার কিংবা বিদ্যালয়ের সামনে বেশি প্রচার চালান তিনি। মোটরসাইকেলের হাতলে ঝোলানো থলেতে থাকে নিজের বাগানের অন্তত দুই ধরনের বিষমুক্ত ফল। থাকে ছুরি। চলতি পথে মানুষ দেখে মাঝেমধ্যে থামেন তিনি। ছুরি দিয়ে ফল কেটে তাদের খাওয়ান। তাদের বোঝান। এভাবে বিষমুক্ত নিরাপদ ফলের ধারণা তিনি ছড়িয়ে দেন মানুষের মধ্যে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক উদ্যোক্তা এই বাগান দেখতে আসেন। নেন নানা পরামর্শ।
আফজাল হোসেন তার স্বপ্নের বিষয়ে বলেন, ‘মানুষের কর্মসংস্থান, মানুষকে বিষমুক্ত নিরাপদ ফল উৎপাদন এবং মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটানো—এই তিন উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এগিয়ে চলেছি। এ জন্য আমি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা পাচ্ছি।’
তিনি আরো জানান, সব খরচ বাদে ফল ও মাল্টার কলম বিক্রি থেকে মাসে এক লাখ টাকার মতো আয় হয়। এক বছর পর তা বেড়ে দুই লাখ টাকার মতো হবে। আগামী ৩ বছরে তিনি তার বাগানের পরিধি বাড়িয়ে ১০০ বিঘা করতে চান। এতে অন্তত ৫০ থেকে ১০০ জনের কর্মসংস্থান হবে।
এ বিষয়ে যশোরের সিভিল সার্জন দিলীপ কুমার রায় জানান, স্বল্প মাত্রার কীটনাশক প্রয়োগ করা ফল খেলে শরীরের তেমন ক্ষতি হয় না। পানিতে একটু ডিটারজেন্ট মিশিয়ে তাতে ১৫-২০ মিনিট ফল ভিজিয়ে রেখে পরিষ্কার করে খেলে শরীরের জন্য তা ক্ষতি করে না। তবে দীর্ঘদিন বাজারে থাকা প্রক্রিয়াজাত ফল খেলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বিষমুক্ত ফল থেকে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে-এর জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, মাঝারি ও দীর্ঘ মাত্রার কীটনাশক প্রয়োগ করা ফল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এতে পাকস্থলীর সমস্যা, ক্ষুধামান্দ্য, গ্যাস্ট্রিক, বমি, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরানো এবং যকৃৎ ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। বিষযুক্ত ফল খেলে প্রসূতিদের গর্ভপাত পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button