বিশ্বজুড়ে অশান্তির আগুন: বাড়ছে বিক্ষোভ, যুদ্ধ ও সংঘাত

বিশ্বজুড়ে বইছে অশান্তির আগুন। দিন দিন বাড়ছেই বিক্ষোভ, যুদ্ধ ও সংঘাত। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোতে যুদ্ধ ও সংঘাত বেড়েছেই। ইন্সটিটিউট ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিস (আইইপি) এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ১০ বছরে পৃথিবী সবচেয়ে অশান্ত ছিল। নাগরিকরা বিভিন্ন কারণে অসন্তুষ্ট হয়ে এ বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছে। কেউ কেউ অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিবাদ করছেন। অন্যরা শুল্ক বাড়ানোর বিষয়ে প্রতিবাদ করছেন। আবার কোথাও সরকার কর্তৃক আরোপিত বিতর্কিত আইন বা কারাগারের সাজা নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হচ্ছে।
চিলি
চিলির প্রেসিডেন্ট শুক্রবার রাতে সান্টিয়াগোতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। মেট্রোর টিকিটের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশটিতে সহিংস বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান পিনেরা।
তিনি বলেছেন, আমি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছি। জরুরি অবস্থা সম্পর্কিত রাষ্ট্রের বিধান মেনে মেজর জেনারেল জাভিয়ের ইতুরিয়াগা দেল ক্যাম্পোকে জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রধান হিসাবে নিয়োগ করেছি।
শুক্রবার (১৮ অক্টোবর) বিক্ষোভকারীরা শহরের বেশ কয়েকটি স্থানে দাঙ্গা পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। বেশ কয়েকটি স্টেশনে হামলা চালিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। এ প্রেক্ষিতে সান্টিয়াগোর পাতাল রেলপথটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাত নামার সাথে সাথে সহিংস সংঘর্ষ আরও বেড়ে যায়। বিক্ষোভকারীরা শহরের কেন্দ্রস্থল ইএনএল বিদ্যুত সংস্থার বিল্ডিং এবং একটি ব্যাংকে আগুন ধরিয়ে দেয়। কয়েকটি মেট্রোস্টেশনে মোলোটভ ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটেছে।
মেট্রোর টিকিটের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। গত জানুয়ারিতে ২০ পেসো বাড়ার পরে পিক আওয়ার ভ্রমণের জন্য ৮০০ থেকে ৮৩০ পেসো বেড়েছে। এদিকে, মেট্রো স্টেশনের ওপর হামলার কারণে পুরো পাতাল রেল ব্যবস্থাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
হংকং
কয়েক মাস ধরে সহিংস বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন হংকংয়ের নেতা ক্যারি ল্যাম। রবিবার হংকংয়ের আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। পুলিশ এই সমাবেশকে অবৈধ ঘোষণা করছে। কিন্তু জনতা এগিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। হংকংয়ের অশান্তির কারণ হলো-মূল ভূখণ্ড চীনকে প্রত্যর্পণের অনুমতি দেওয়া সংক্রান্ত প্রস্তাব। অর্থ পাচারের অভিযোগে হংকংয়ের কারাগারে বন্দী রয়েছেন চ্যান টং-কাই লাম নামের এক ব্যক্তি।
তিনি বলেছেন, মুক্তি পাওয়ার পরে এই মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনি ‘নিজেকে তাইওয়ানের কাছে সমর্পণ করবেন’, যা তাড়াতাড়িই হতে পারে। এমএস লাম শনিবার ব্রডকাস্টার আরটিএইচকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, পুলিশ বিক্ষোভ সামাল দিতে ব্যাপক শক্তি ব্যবহার করেছে। বিক্ষোভকারীরাও এর জবাব দিচ্ছে। গত জুন থেকে হংকংয়ে বিক্ষোভ আরো বেড়ে যায়। এরপর থেকে ২৬০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালে ব্রিটেন হংকং শহরটি চীনের কাছে ফেরত দিয়েছিল। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তখন থেকে প্রত্যর্পন বিলের বিরোধিতা করার চেয়ে অনেক বেশি পদক্ষেপ নিয়েছে চীনা সরকার। তব, চীন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। হংকংয়ে সহিংসতা প্ররোচিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনের মতো দেশগুলিকে দোষ দিয়েছে চীন।
লেবানন
শুক্রবার বৈরুতে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সরকার অর্থনীতিকে লুণ্ঠন করছে। গতকাল জনতার বিক্ষোভে সরকারিবাহিনী টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছে। বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করেছে পুলিশ।
রয়টার্সকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, যানবাহনে এবং পায়ে হেঁটে পুলিশ হামলা করেছে। তারা রাবার বুলেট এবং টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছে। বৈরুতে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে পুলিশ। বেশ কয়েকজেন আহত হয়েছেন। আটক করা হয়েছে আরো কয়েকজনকে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরি অর্থনৈতিক সঙ্কট রোধ করতে পারে এমন সংস্কারকে বাধা দেওয়ার জন্য সরকারের অংশীদারদের দোষ দিয়েছেন। ৭২ ঘন্টা সময়সীমা বেধে দিয়েছেন তিনি। অন্যথায় তিনি পদত্যাগ করবেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। সাদ আল হারিরি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে বলেছেন, লেবানন একটি ‘অভূতপূর্ব, কঠিন সময়’ পার করছে।
শুক্রবার লেবাননের সকল সম্প্রদায় এবং বিভিন্ন স্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তারা হরিরির সরকারকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্লোগান দেয়। এই বিক্ষোভ বিনিয়োগকারীদের জন্য সতর্কবার্তা। বর্তমানে লেবাননের অর্থনীতি এবং আর্থিক ব্যবস্থা ১৯৮০-এর দশকের পর যে সময়ের চেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে।
বার্সেলোনা
বার্সেলোনায় গত কয়েকদিন ধরে সহিংস বিক্ষোভ চলছে। গতকাল শুক্রবার গভীর রাতে বার্সেলোনায় সহিংস সংঘর্ষ আরও বেড়ে যায়। কারণ, উগ্রপন্থী কাতালান বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও আতশবাজি নিক্ষেপ করে। পুলিশের টিয়ারগাস এবং রাবার বুলেট নিক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় শহরের কেন্দ্রস্থল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
স্বাধীনতার দাবির কারণে দু’বছর আগে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে নয়জন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে কারাগারে বন্দী করা হয়। আদালতের রায়ের প্রতিবাদে কাতালান রাজধানীতে পঞ্চম দিনের মতো বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে জনতা। শুক্রবার বার্সেলোনায় প্রায় ৫ লাখ মানুষ বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নিয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, সোমবার আদালতের রায় হওয়ার পর থেকে বৃহত্তম সমাবেশে বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও প্রধান পর্যটনকেন্দ্রে সাধারণ ধর্মঘট ডেকেছে। এএফপির সংবাদদাতা বলেছেন, বেশিরভাগ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করেছে। তরুণ বিক্ষোভকারীদের একটি দল পুলিশ সদর দপ্তরের নিকটে বিক্ষোভ করেছে। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য টিয়ারগ্যাস ছুড়েছে।
পর্যটনকেন্দ্র লাস র্যামব্লাসের শীর্ষে প্লাজা ডি কাতালুনিয়ার নিকটে অন্যান্য অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। যেখানে কয়েকশ’ বিক্ষোভকারী পুলিশ নিষেধ অমান্য করে সমাবেশ করেছে। পুলিশ জলকামান দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেছে। বিক্ষোভকারীরা স্লোগান তুলেছে, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী কাতালোনিয়া!’রাস্তাগুলি সর্বদা আমাদের থাকবে!’
এ সময় বেশ কয়েকটি পুলিশ ভ্যান রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। তাদের গাড়ি সাইরেন বাজিয়েছে। তবে, পুলিশের মুখপাত্রের দাবি, পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরও শান্ত হয়েছে।
সূত্র : দ্য ন্যাশনাল।




