sliderআন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

বাসচালক থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট—কে এই নিকোলাস মাদুরো?

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। প্রায় ১২ বছর ধরে দেশটির ক্ষমতায় থাকার পর আজ (৩ জানুয়ারি) হঠাৎ করেই তার শাসনের ইতি ঘটে। রাজধানী কারাকাসে মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের এক অভিযানের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মাদুরোকে গ্রেফতার করেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার পরিচালনা ও নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে আসছিল এবং গত কয়েক মাস ধরেই তাকে ক্ষমতা ছাড়তে চাপ দিচ্ছিল।

কে এই নিকোলাস মাদুরো?

নিকোলাস মাদুরোর জন্ম ১৯৬২ সালের ২৩ নভেম্বর, একটি শ্রমজীবী পরিবারে। তিনি ছিলেন এক ট্রেড ইউনিয়ন নেতার সন্তান। ১৯৯২ সালে সেনা কর্মকর্তা হুগো চাভেজের ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সময় মাদুরো বাসচালক হিসেবে কাজ করতেন।

চাভেজ কারাগারে যাওয়ার পর তার মুক্তির পক্ষে প্রচারণা চালান মাদুরো এবং ধীরে ধীরে তার বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মসূচির একনিষ্ঠ সমর্থকে পরিণত হন। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চাভেজের কারাবাসের সময় থেকেই দুজনের মধ্যে দীর্ঘ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

১৯৯৮ সালে চাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মাদুরো আইনসভায় আসন লাভ করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি জাতীয় পরিষদের সভাপতি হন এবং পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এই সময় তিনি তেলভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মিত্রতা গড়তে বিশ্বজুড়ে সফর করেন।

নির্বাচনি প্রচারণায় সবুজ জুস পান করে এর স্বাস্থ্যগুণের কথা বলার জন্য পরিচিত মাদুরো ছিলেন তার প্রয়াত রাজনৈতিক গুরু চাভেজের উত্তরাধিকারী। ২০১২ সালে চাভেজ তাকে নিজের পছন্দের উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করেন। চাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে অল্প ব্যবধানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মাদুরো।

তার শাসনামলে ভেনেজুয়েলা ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সংকট দেশটিকে বিপর্যস্ত করে তোলে। তার শাসন সবচেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে কথিত কারচুপিপূর্ণ নির্বাচন, খাদ্যসংকট এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য। ২০১৪ ও ২০১৭ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযানের অভিযোগও ওঠে।

এই সময় লাখ লাখ ভেনেজুয়েলাবাসী দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে বহু বছরের অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের পর মাদুরো অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন, যার পর সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় জরুরি অবস্থাও জারি করা হয়।

গত বছর রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদুরোর আচরণে নাটকীয়তার ছাপ স্পষ্ট। তিনি প্রায়ই বিরোধী রাজনীতিকদের ‘ফ্যাসিস্ট দানব’ বা ‘পদবি পরিবার’ বলে আক্রমণ করেন—যার মাধ্যমে তাদের কথিত ধনী পটভূমিকে বিদ্রুপ করা হয়।

দেশে ও বিদেশে তার সমালোচকদের মতে, মাদুরো একজন স্বৈরশাসক, যিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কারাবন্দি বা নিপীড়নের শিকার করেছেন এবং বারবার অন্যায়ভাবে বিরোধী প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দিয়েছেন।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও আরও কয়েকটি দেশের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে মাদুরোর সরকার। সে সময় ওয়াশিংটন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে মাদুরোকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল, যা ২০২৫ সালের আগস্টে বাড়িয়ে ৫ কোটি ডলার করা হয়। মাদুরো এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি তৃতীয় মেয়াদে শপথ নেন। ২০২৪ সালের ওই নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিরোধীরা ব্যাপকভাবে কারচুপিপূর্ণ বলে নিন্দা করে। সরকার বিজয় ঘোষণা করার পর বিক্ষোভে নামা হাজার হাজার মানুষকে কারাবন্দি করা হয়।

গত মাসে জাতিসংঘের একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন জানায়, ভেনেজুয়েলার বলিভারিয়ান ন্যাশনাল গার্ড (জিএনবি) এক দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের লক্ষ্য করে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, অনেক ক্ষেত্রেই দায়মুক্তি ভোগ করেছে।

মাদুরো সরকারের দমনমূলক নীতির বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে, যখন ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোকে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button