
মো. নজরুল ইসলাম, মানিকগঞ্জ : দেশের সকল স্তরের অধিকাংশ মানুষ বিনোদনের জন্য টিভি মোবাইলসহ প্রযুক্তি নিয়ে ব্যস্ত আছে। বিশেষত স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছেলে মেয়েরা নাটক সিনেমা দেখে, গল্প উপন্যাস পড়ে প্রেম ভালোবাসার মোহে পড়ে অনেকসময়ই পরিবারের অমতে সাবালক সাবালিকা হওয়ার পূর্বেই বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করে বসে। অনেক সময় মেয়ের অভিভাবকরা ভালো পাত্র, সুপাত্র পেয়ে গেলে মেয়ের বয়স অল্প হওয়া সত্তে¦ও বিয়ে দিয়ে দেয়। এই ধরনের বিয়ে গুলোকে আমরা সাধারণত শিশু বিবাহ বা বাল্যবিবাহ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকি। আর এই বাল্যবিবাহ নিয়ে আমাদের মাঝে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সংশয়। বাল্যবিবাহ আমরা হয়ত সবাই বুঝি যে সাবালক বা সাবালিকা হওয়ার আগে কোন বিবাহ সম্পন্ন হলে সেটাকেই বাল্যবিবাহ বলা হবে। কিন্তু, ঠিক কখন কে সাবালক, কে সাবালিকা বা কখন একজন মানুষ সাবালক বা সাবালিকা হবে এই সময়সীমা নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের তর্ক বিতর্ক ও বাহাস। এই লিখায় আমাদের দেশের ছেলে মেয়েদের বিয়ের বয়স বাহাস নিয়ে সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ করতে চাই। আজ আমরা এই দ্বিধাদ্ব›দ্ব দূর করার চেষ্টা করবো।
ধর্মীয় অনুভূতির দিক থেকে বাংলাদেশ যেহেতু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং বিয়ে মানুষের জৈবিক চাহিদা অনুযায়ী ব্যক্তিগত তথা ধর্মীয় আইন অনুসারে হয়ে থাকে, সেহেতু এই বিয়ের বয়স নিয়ে ধর্মীয়,সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দ্ব›দ্ব রয়েছে। এদিকে, ধর্মীয় আইন অনুসারে বিয়ের বয়সকে সংখ্যা দিয়ে নির্ধারণ করে না দিলেও রাষ্ট্রীয় আইনে বিয়ের বয়সকে সংখ্যায় বেঁধে দিতেই হয়, নাহলে সময়ে সময়ে তৈরি হবে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা যা একে একে সামাজিক অবক্ষয়ের জন্ম দিবে।
ইসলাম ধর্ম অনুসারে মুসলিমদের কোরআন-হাদিসের আলোকেই চলতে হয়। যেমন কোরআনে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন: “তোমাদের মধ্যে যাদের স্বামী বা স্ত্রী নেই তাদের বিয়ের ব্যবস্থা কর, তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ ও যোগ্য তাদেরও। তারা যদি দরিদ্র হয় তাহলে আল্লাহ্ই নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ্ মহা দানশীল, মহাজ্ঞানী।”[সূরা নূর, আয়াত: ৩২]। অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরা তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে তাদের বিয়ে করো, যথাযথভাবে তাদের মোহর প্রদান করো, যেন তারা বিয়ের দুর্গে সুরক্ষিত হয়ে থাকতে পারে এবং অবাধ যৌন চর্চা ও গোপন বন্ধুত্বে লিপ্ত না হয়ে পড়ে।”(সূরা নিসা-২৫)। আমরা এখানে কোথাও বিয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোন বয়সকে মাপকাঠি হিসেবে ইঙ্গিত পাইনি। তাছাড়া, আমাদের প্রিয় নবী (সা:) স্বয়ং নিজে যখন মা আয়েশা রাদিয়াাল্লাহু তায়ালা আনহাকে বিয়ে করেন তখন মা আয়েশার বয়স ছিল মাত্র ৬ বছর; যদিও বিয়ের আরও ৩ বছর পর অর্থাৎ মা আয়েশা ৯ বছর বয়সে নবী করিম (সা:) এর ঘর সংসার করেছেন। (বুখারী হাদিস নং ৪৮৪০, মুসলিম/ ১৪২২)
আমরা প্রতিয়মান করতে পারি যে, বিয়ের জন্য ধর্মানুসারে কোন বয়স নির্ধারিত নেই। কিন্তু, বৈশি^ক ভৈাগলিক স্থানিক ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ স্বাস্থগত কারনেও যুগের পরিক্রমায় বিয়ের জন্য বয়স একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। স্থান কাল ও পাত্র ভেদে মানুষের মানসিক এবং শারীরিক পরিবর্তনও ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আঠারোর আগে বিয়ে নয়, বিশের আগে সন্তান নয়। কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন, নাবালিকা মেয়ের শারীরিকভাবে দুর্বল যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সংসার জীবনে প্রবেশ করলে শিক্ষা সম্পন্ন করতে না পারার অনিশ্চয়তা এবং দায়িত্বভার গ্রহনের অপরিপক্কতা। অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী এখন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতায় নেমেছে প্রত্যেক রাষ্ট্রগুলো। সব মিলিয়ে বিয়েতে বাল্যবিবাহ রোধসহ পরিবার পরিকল্পনার বিধান মেনে সন্তান জন্মদানেও কিছুটা বিলম্ব হলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞতরা আরো বলেন একজন নারী ও পুরুষ শিক্ষা দিক্ষায় অগ্রগামী হয়ে কৈশর কাল অতিক্রম করে যৌবনে প্রবেশ করে এবং নিজের স্বাবলম্বীতা অর্জন করে বিয়ে করলে পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের পথ সুগম হবে। এজন্যই বাস্তবতার নিরিখে প্রত্যেক দেশের প্রচলিত বিধান অনুসারে নারী পুরুষের বয়স ও সময় মেনেই বিয়ের পিড়িতে বসতে হবে। অন্যথায় রাষ্ট্র তার উপর আইনগত ব্যাবস্থা গ্রহন করতে পারবে।
বিয়ের বয়স বুঝতে হলে আমাদেও বুঝতে হবে কোনটা বাল্যবিবাহ নয়। যেটা বাল্যবিবাহ নয়, সেটাই বৈধ বিবাহ(রাষ্ট্রীয় আইন অনুসারে) এখন ধর্মীয় ভাবে বিয়ে হলেও কাবিননামা রেজিস্ট্রেশন করতে মানতে হবে রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ। তাই, কাজীকে ডেকে বিয়ে পড়ানোর সময় কাজীকেও মানতে হবে বিয়ের জন্য বর কণের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া বয়স-সীমা।
২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ২ নং ধারার ৪ নং উপধারায় বাল্যবিবাহের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ২ নং ধারার ৪ নং উপধারায় বলা হয়েছে যে, “বাল্যবিবাহ”অর্থ এইরূপ বিবাহ যার কোন এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ ‘অপ্রাপ্ত বয়স্ক’। অর্থাৎ, যখন কোন বিয়ের এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ অপ্রাপ্ত বয়স্ক হবে, তখন সেই বিয়েকে আইনত বাল্যবিবাহ বলা হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ‘অপ্রাপ্ত বয়স্ক’ কারা? এর উত্তরও পাওয়া যাবে, একই আইনের ২ নং ধারার ১ নং উপধারায়। ২ নং ধারার ১ নং উপধারায় বলা হয়েছে, “অপ্রাপ্ত বয়স্ক”অর্থ বিবাহের ক্ষেত্রে ২১ (একুশ) বৎসর পূর্ণ করেন নাই এমন কোনো পুরুষ এবং ১৮ (আঠারো) বৎসর পূর্ণ করেন নাই এমন কোনো নারী। অর্থাৎ, কোন বিয়েতে বর তথা পুরুষের বয়স ২১ এর কম বা কনে তথা নারীর বিষয় ১৮ এর কম হলেই ঐ বিয়ে বাল্যবিবাহ হিসেবে চিহ্নিত হবে। এবার সোজা বাংলায় বললে দাঁড়ায়, বিয়ের জন্য বরের বয়স হতে হবে অন্তত ২১ এবং কনের বয়স হতে হবে ১৮। কিন্তু, আইন থাকা সত্তে¡ও মানা হচ্ছে না এর বিধিনিষেধ। তাই, বাল্যবিবাহের জন্য বর-কণের শাস্তিরও বিধান রাখা হয়েছে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে।
আমাদের সমাজে যেটি অহরহ বা কমন কেস সেটি হচ্ছে, বর প্রাপ্ত বয়স্ক আর কনে অপ্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এর ৭ ধারা অনুসারে, বর যদি প্রাপ্ত বয়স্ক হয় আর কনে অপ্রাপ্ত বয়স্ক, তাহলে উক্ত বাল্যবিবাহের অপরাধে বরকে অনধিক ২ বছর কারাদন্ড বা অনধিক ১ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে এবং কনে যেহেতু অপ্রাপ্ত বয়স্ক সেহেতু তাকে অনধিক ১ মাসের আটকাদেশ বা অনধিক ৫০,০০০ টাকা জরিমানা বা উভয় ধরনের শাস্তি প্রদান করা যাবে। অর্থাৎ, বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করেছে এমন ক্ষেত্রে বর হোক বা কনে যে প্রাপ্ত বয়স্ক তার শাস্তি অনধিক ২ বছর কারাদন্ড বা অনধিক ১ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড, অন্যদিকে যে অপ্রাপ্ত বয়স্ক তার শাস্তি অনধিক ১ মাসের আটকাদেশ বা অনধিক ৫০,০০০ টাকা জরিমানা বা উভয় ধরনের। শুধু বর-কনেকে শাস্তি দিলেই তো হবে না, যখন বিয়ে হবে পারিবারিক ভাবে তখন ঐ বিয়ের অভিভাবক বা পিতা মাতাকেও বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করানোর অপরাধে অনধিক ২ বছর ও অন্ত ৬ মাস কারাদন্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে এবং অর্থদন্ড অনাদায়ে অনধিক ৩ মাস পর্যন্ত কারাদন্ডে দন্ডিত করা হবে।
বর কনে শাস্তি পাবে, শাস্তি পাবে পিতা-মাতা অভিভাবকও, তাহলে কেন বাদ যাবে যে ঐ বিয়ে নিবন্ধনকারী কাজী? শাস্তির ক্ষেত্রে কেউ পাবে, কেউ পাবে না, তা হবে না, তা হবে না।
তাই, যে ধর্মীয় রীতিতেই বিয়ে হোক না কেন, বিয়ে যে রেজিস্ট্রি তথা নিবন্ধন করবেন, তিনি যদি বাল্যবিবাহ নিবন্ধন করেন, তাহলে তিনি অনধিক ২ বছর ও অন্তত ৬ মাস কারাদন্ডে বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন এবং অর্থদন্ড অনাদায়ে অনধিক ৩ মাস কারাদন্ডে দন্ডিত হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তার লাইসেন্স বা নিয়োগ বাতিল করা হবে। তাই সর্বোপরি আসুন, বাল্যবিবাহ না করে রাষ্ট্রীয় এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে বিয়ের বয়স হলেই যেন আমরা বিয়ে সম্পন্ন করি।
অন্যদিকে বিশেষ ক্ষেত্রে ছেলের ২১ ও মেয়ের ১৮ বছরের নিচে বিয়ের বিধান রেখে বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল-২০১৭ সর্বসম্মতভাবে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। মহান জাতীয় সংসদে তৎতকালীন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বিলটি উত্থাপন করার পর সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সংশোধনী শেষে তা পাস হয়। তবে গেলো বছরের ২৪ নভেম্বর মেয়েদের ১৮ ও ছেলেদের ২১ বছরের আগে বিয়ে না দেয়ার বিধান রেখে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৬-এর খসড়া অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। তবে এতে বিশেষ প্রেক্ষাপটে আদালতের নির্দেশনা নিয়ে মা-বাবার অনুমতি সাপেক্ষে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদেরও বিয়ে দেয়া যাবে বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ আইনের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। এই আইন পাশ হলেও দেশের সুশীল সমাজ ও উন্নয়নকর্মীরা ব্যাপক সমালোচনা করেন।
খসড়া আইনে বলা হয়েছিল, বাল্যবিবাহ বন্ধে আদালতের নির্দেশ অমান্য করলে ছয় মাসের কারাদন্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে। বাল্যবিবাহ-সংক্রান্ত বিষয়ে মিথ্যা অভিযোগ করলে ছয় মাসের কারাদন্ড বা ৩০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে। দু’জন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে বাল্যবিবাহ করলে তাদের ১৫ দিনের আটকাদেশ ও অনধিক পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা যাবে। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি অপ্রাপ্তবয়স্ক কাউকে বিয়ে করলে দু’ বছর কারাদন্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে। মা-বাবা আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দু’ বছর কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড করা যাবে। বিয়ে পড়ানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আইন না মানলে দু’ বছর কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড দেয়ার কথা বলা হয়েছে খসড়া আইনে।
বিভিন্ন শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, জন্মনিবন্ধন/ ভোটার আইডি সনদ,এসএসসি সনদ বা পাসপোর্ট এগুলোর যেকোনো একটি বিয়ের বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচ্য হবে। এ সংক্রান্ত মামলার বিচার অন্যান্য ফৌজদারী অপরাধের মতোই হবে। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালতেও বিচার করা যাবে। বাংলাদেশের সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের জন্য বিয়ের আইনি বয়স মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৮ আর ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ বছর। ১৮ ও ২১ বছর বয়সের নিচে কোনো মেয়ে ও ছেলেশিশুর মধ্যে বিয়ে হলে তা বাল্যবিবাহ হিসেবে পরিগণিত হবে। অনেক সময় দেখা যায় যে, দুই পক্ষের পরিবার বিয়েতে সম্মত থাকার পরও আইনে মোতাবেক বয়স না হওয়ায় বিয়ে সম্পন্ন করা যায় না। অপ্রাপ্ত বয়স্ক হলেই বিয়ে নিষিদ্ধ ব্যাপারটা আসলে এমন নয়।
২০১৭ সালে আমাদের দেশে বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন তৈরি হয়। উক্ত আইনের ১৯ ধারায় অপ্রাপ্ত বয়স্কদের বিয়ের বিশেষ নিয়ম যুক্ত করা হয়।নতুন আইনে বিয়ের যোগ্যতা হিসেবে ছেলের বয়স ২১ এবং মেয়ের ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়। আইনটি প্রণয়নের শুরুতে অনেকে বলছিলেন, বিশেষ বিধানের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বাল্যবিবাহ বৈধতা পেয়ে যাবে। এ ব্যাপারে অবশ্য সরকারের পক্ষ হতে বলা হয়,একদম বিশেষ কোন পরিস্থিতি, যেমন অপ্রাপ্ত বয়স্কের আত্মহত্যার সম্ভবনা বা অপ্রত্যাশিতভাবে গর্ভসঞ্চার হলে মিসক্যারেজ , সামাজিক নানান অবক্ষয় বা ভ্রুণ হত্যার মত পরিস্থিতি বিবেচনায় এ বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।
আমরা একটা উদাহারন দিতে পারি- ধরি, নবম শ্রেণীর দুইজন ছেলেমেয়ে প্রেমে পড়লে এবং তারা শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে মেয়েটি গর্ভবতী হলো। এই যে অনাগত সন্তান, তার কোন বৈধতা নেই! এমন পরিস্থিতিতে যদি বিয়ে দেয়া না হয় বা বিয়ে অস্বীকার করা হয়, তাহলে মেয়েটির ভবিষ্যৎ কি হবে? সামাজিক ও বাস্তবিক এসব সমস্যা বিবেচনা নিয়ে চিন্তা করলে অবশ্য ভাল হয় কারন ভিকটিম শিশু ছেলে বা মেয়েকে আমাদের সমাজের ও নিজের পরিবারের সদস্য ভাবতে হবে। সবদিক বিবেচনার বিষয়ে ‘মন্দের ভাল’ মত একটি সমাধান। সমাজ ব্যবস্থার নিরিখেই আইন প্রণেতাগণের বোধ ও প্রজ্ঞা থেকে ‘বিশেষ বিধান’ সংযোজন করা হয়েছে। বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এই আইনের ১৯ ধারার বিশেষ বিধান টি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বিশেষ বিধানের আওতার বিষয়ে অনুমতি দিতে অনেকগুলো শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
শর্তগুলো নি¤œরুপ- ১. আদালতের বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের লিখিত নির্দেশনা থাকতে হবে। ২. বাবা মা অথবা অভিভাবকের সম্মতি পত্র থাকতে হবে। ৩. নাবালক বা কম বয়স্কোর সর্বোত্তম স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। এছাড়াও বাল্যবিবাহ নিরোধ বিধিমালার ১৭ বিধি অনুযায়ী বিশেষ বিধান প্রয়োগে দুইপক্ষকে যৌথভাবে আদালতে বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে। এমন আবেদন পাওয়ার পরে বিজ্ঞ আদালত আবেদনের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য যাচাই কমিটির কাছে প্রেরণ করবেন। ৭ সদস্যের যাচাই কমিটি উক্ত কাজের জন্য ১৫ দিনের মধ্যে কোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। তবে আবেদন যাচাইয়ে কমিটিকে ২ টি মানদন্ড বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যদিকে কমিটি নিন্ম বর্ণিত ক্ষেত্রে বিয়ে না হওয়ার জন্যও সুপারিশ করতে পারবেন- (ক) বিবাহটি যদি জোরপূর্বক হয়। (খ)অপহরণ, ধর্ষণ বা জোরপূর্বক মিলনের কারনে হলে, ৩. এ সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন থাকলে। আদালত যদি কমিটির সুপারিশ পেয়ে সন্তুষ্ট হয় তাহলে বিয়ের অনুমতি দিবেন, বা নামঞ্জুর করবেন অথবা পুনরায় তদন্ত করাবেন, এমনকি কমিটিকে আদালতে উপস্থিত করিয়ে তাদের বক্তব্য শুনবেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে , এই বিশেষ বিধানের আওতায় বিয়ের অনুমতি পাওয়া অত সহজ নয় বরং খুবই জটিল প্রক্রিয়া। আদালত অপ্রাপ্ত বয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করবে। দুইপক্ষের যৌথ আবেদন হতে হবে, আদালত সাথে সাথে অনুমতি দিবে না, একটা কমিটি সত্যতা যাচাই করে সুপারিশ করবে, তারপর আদালত আইন ও বিধির শর্ত পূরণ হলেই এই বিশেষ বিধান প্রয়োগ করে অপ্রাপ্ত বয়স্কের বিষয়ে অনুমতি দিবেন।
একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, ২০১৭ সালের আইন এবং পরের ২০১৮ সালের বিধিতে কোথাও কোন আদালত এমন অনুমতি দিবে তা বলা হয়নি। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ও বিধি একত্রে পড়লে বিষয়ট পরিষ্কার হয় যে, এ বিষয়ে যথাপোযুক্ত ফোরাম হলো জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি। কেননা বিধিতে কয়েকটি ফোরাম সংযুক্ত আছে যেখানে ‘বিচারিক আদালত’ ও মোবাইল কোর্ট পৃথক ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ২৯ ধারা ও ২য় তফসীলের ৮ম কলাম মতে ২ বছর পর্যন্ত শাস্তিযোগ্য হওয়ার এ আইনের অধীন অপরাধের বিচার ও তদন্ত জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট করবেন। এ আইনের অপরাধগুলো আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপোষযোগ্য। আইনের ৪, ৫ ধারা ও ১৫ বিধি মতে আদালতে অভিযোগ দায়ের করা যাবে। অভিযোগ দায়েরের সময়সীমা ঘটনা হতে ২ বছর পর্যন্ত করা যাবে। জানার বিষয় হলো, আদালত (জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রসি) বাল্যবিবাহ ঠেকাতে প্রয়োজনে বিষয় উপর নিষেধাজ্ঞাও দিতে পারবেন। মামলার নিষ্পত্তি হবে ২ ভাবে- ১. বিচারে খালাস বা শাস্তি ২. মুচলেকা সম্পাদন। মুচলেকার ক্ষেত্রে শর্ত হলো, বিয়েটি সম্পাদন হয়নি এবং বলতে হবে, ভবিষ্যতে বাল্যবিবাহ নিরোধে তৎপর থাকবে। অত্র আইনের কোন অপরাধ সংগঠিত হলে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসির পাশাপাশি মোবাইল কোর্টও তাৎক্ষণিকভাবে ও স্বীকারোক্তি ভিত্তিতে মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ এর ৬ ও ৭ ধারার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে শাস্তি দিতে পারবে, তবে অপ্রাপ্ত বয়স্ক নারী বা পুরুষের ক্ষেত্রে পারবে না, সেক্ষেত্রে বিচার ও শাস্তি হবে শিশু আদালতে। আগে বিয়ের ক্ষেত্রে এভিডেভিড করে বয়স বেশি দেখিয়ে কিছু ক্ষেত্রে অপ্রাপ্ত বয়স্ককে বিয়ে দেওয়া হতো। এখন বয়স প্রমাণে এমন এভিডেভিড এর সুযোগ নেই। বর্তমান সরকার প্রশাসনের সকল স্তরে অনিয়ম দুণিীতি রোধে ডিজিটাল পদ্বথি অনুসরন করছেন। তারই প্রেক্ষিতে প্রত্যেক নাগরিকের অনলাইন জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক করায় ও জন্মসনদই বয়স নির্ধারনের অন্যতম মাধ্যম হওয়ায় বয়স গোপন করার কোন সুযোগ নেই। তবুও বয়স নিরুপণে পিতামাতার হলফনামা নিয়ে নামের বানান পরিবর্তনসহ নানা অসাধু পক্রিয়া এখনো বিদ্যমান আছে।
আসলে সমাজে সর্বক্ষেত্রে আইন কানুন দিয়ে মানুষকে সোজা পথে পরিচালনা করা খুবই কঠিন কাজ। অন্যদিকে আইনের শাসন রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সমাজে সেচ্ছাসেবী অগ্রগামী সুনাগরিক, সুশীল সমাজ ও উন্নয়নকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে লড়াই সংগ্রাম করে আসছে। পশ্চাদপদ শ্রেণীকে সচেতনতার মূলধারায় আনতে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সচেতন মহলের নাগরিকদেরকেও নিরলসভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের দেশকে একটি নারীবান্ধব বহুত্ববাদী সমাজ বিনির্মান করতে হলে আমরা বিশ^াস করি সচেতনতার আলো দিয়েই সেটি করা সম্ভব। সমাজে বাল্য বিবাহ নারী নির্যাতন হত্যা ধর্ষন মাদক ও প্রযুক্তি আসক্তিসহ সকল প্রকার সামাজিক ও প্রাকৃতিক সহিংসত্ াপ্রতিরোধে সচেতনতার এই আলো শিখা নিয়ে যুব সমাজ একটি নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে আমরা এই প্রত্যাশা করি।
[লেখক: উন্নয়ণ ও গণমাধ্যম কর্মী]




