শিরোনাম

বগুড়ার আলোচিত ধর্ষণ মামলায় তুফান সরকারের জামিন

বগুড়ার বহুল আলোচিত মা ও মেয়েকে ন্যাড়া করে নির্যাতন ও ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি বহিষ্কৃত শহর শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকার সাড়ে তিন বছর পর জামিন পেলেন। জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেছেন বগুড়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যাল- ১ এর বিচারক একেএম ফজলুল হক।
রবিবার (১৭ জানুয়ারি) আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাড. আব্দুল মান্নাফ আদালতে জামিনের আবেদন করলে শুনানি শেষে আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। মামলার বাদি ও ভিকটিম আদালতে সাক্ষী দিয়ে বলেছেন, মামলায় যেভাবে নির্যাতনের কথা উল্লেখ রয়েছে, সে রকম কোনো আচরণ তাদের সাথে করা হয়নি। এ মামলার প্রধান আসামি জামিন পেলে তাদের কোনো আপত্তি নেই।
বগুড়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১–এর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি নরেশ মুখার্জি বলেন, রবিবার ধর্ষণ মামলার জামিন শুনানির সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি দাবি করেন, আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা তুফান সরকারের জামিনের ঘোর বিরোধিতা করেছেন। আদালত দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে তাকে জামিন দিয়েছেন।
কৌঁসুলি নরেশ বলেন, মামলার প্রধান সাক্ষী বাদি নিজেই। এ ছাড়া ভিকটিম মেয়েটিও মামলার অন্যতম সাক্ষী। রবিবার প্রধান আসামির জামিন শুনানির আগে মামলার গুরুত্বপূর্ণ এই দুই সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এ সময় আদালতে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মা-মেয়ে দুজনই বলেন, ঘটনার স্থান, কাল-কিছুই তারা জানেন না। তুফান সরকারের বিরুদ্ধে তাদের কোনো অভিযোগও নেই। কোনো ধর্ষণের ঘটনাও ঘটেনি। বাদি আরও বলেন, মামলার এজাহারে বর্ণিত অভিযোগ সত্য নয়। জোরজবরদস্তি করে মামলার এজাহারে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এজাহারে কী লেখা আছে, সেটাও তিনি পড়ে দেখেননি। ভুল–বোঝাবুঝি থেকে এ মামলা হয়েছে।
নরেশ চন্দ্র বলেন, তুফান সরকার মামলার পর থেকেই কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মা-মেয়েকে নির্যাতনের পর চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগে আরেকটি মামলা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রয়েছে। সেই মামলায় তিনি জামিনে রয়েছেন কি না, তা জানা নেই। তুফান সরকার ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা আগে থেকেই জামিনে রয়েছেন।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই এক ছাত্রীকে কলেজে ভর্তি করে দেয়ার কথা বলে কৌশলে বাসায় নিয়ে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ করেন তুফান সরকার। পরে ২৮ জুলাই তুফানের স্ত্রীর বড় বোন পৌর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকির বাসায় নিয়ে গিয়ে মা ও মেয়েকে নির্যাতনের পর মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা বাদি হয়ে ২৯ জুলাই বগুড়া সদর থানায় দুটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ঘটনার পরপরই প্রধান আসামি তুফান সরকার, তার স্ত্রী আশা, শাশুড়ি রুমি খাতুন ও শ্যালিকা পৌর কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকিকে গ্রেফতার করে। পরে গ্রেফতার করা হয় অন্য আসামি তুফানের শ্বশুর জামিলুর রহমান রুনু, সহযোগি আতিক, মুন্না, আলী আজম দিপু, রূপম, শিমুল, জিতু ও নাপিত জীবন রবিদাসকে। নির্যাতনের শিকার মা ও মেয়েকে রাজশাহীতে সেফ হোম ও ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টারে প্রথমে রাখা হলেও এক আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর বগুড়ার শিশু আদালতের বিচারক মো. ইমদাদুল হক মা ও মেয়েকে তার বাবার জিম্মায় নেওয়ার আদেশ দেন।
২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর তুফান সরকারসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক (অপারেশন) আবুল কালাম আজাদ। ধর্ষণের মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১০ জনকে এবং মাথা ন্যাড়া মামলায় ১৩ জনকে আসামি করা হয় অভিযোগপত্রে। দুই মামলাতেই প্রধান আসামি তুফান সরকার।
আসামিরা হলেন, তুফান সরকার, তার স্ত্রী আশা খাতুন, শ্যালিকা পৌর কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকি, শাশুড়ি রুমি খাতুন, শ্বশুর জামিলুর রহমান রুনু, কাউন্সিলর রুমকির গৃহকর্মী আঞ্জুয়ারা বেগম, তুফানের সহযোগী আতিক, মুন্না, আলী আজম দিপু, রূপম, শিমুল, জিতু ও নাপিত জীবন রবিদাস।
এই ঘটনায় বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তুফান ও তার সহযোগীদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন হয়। গত বছর ২২ জানুয়ারি বগুড়ার নারী শিশু আদালত জামিন নামঞ্জুর করলে হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন তুফান, যা উচ্চ আদালত ২৭ ফেব্রুয়ারি খারিজ করে দেয়। এরপর গত বছরের জুন মাসে ভার্চ্যুয়াল আদালতে আবারও জামিনের আবেদন করলে শুনানির পর জামিন আবেদনটি নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিমের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চে ।
সে সময় আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন মোমতাজউদ্দিন আহমদ মেহেদী। তার সঙ্গে ছিলেন এএইচএম রেহানুল কবির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রয়াত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. বশির উল্লাহ। ওই মামলায় মোট ৯ জন আসামির ৮জন ২০১৮ সাল থেকে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বাইরে আছেন। “কিন্তু তাদের জামিনের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়। তাই তুফান সরকারও জামিন চেয়ে আবেদন করেছিলেন। আদালত আবেদনটি নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে দিয়েছেন।” এভাবেই জানিয়েছেন আসামি পক্ষের আইনজীবী।
এর আগে গত বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি তুফান সরকারের জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়ে বগুড়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ধর্ষণের মামলাটি ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। মা ও মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে নির্যাতন মামলায় আগেই জামিনে ছিলেন তুফান সরকার। ধর্ষণ মামলায় তিনি আজকে জামিন পেলেন। এখন জেল হাজত থেকে এখন মুক্তি পেতে আর কোন বাধা রইলো না বলে জানিয়েছেন তুফানের আইনজীবী অ্যাড. আব্দুল মান্নাফ।
সুত্র : ইত্তেফাক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button