প্রথম বিশ্বকাপে সেরা তারকারা

বিশ্বকাপ আসেই বিশ্বকাঁপাতে। ফুটবলের বিশ্বকাপ মানেই একটা বিশেষ আয়োজন। সবাই চায় সেরাটা প্রদর্শন করতে। তারপরও কয়েকজন অন্য সবার চেয়ে আলাদাভাবে বের হয়ে আসেন। ১৯৩০ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপেও এ ধরনের অনেককে চমকপ্রদ নৈপূণ্য প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। তবে এদের মধ্যে মাত্র তিনজনের কৃতিত্ব তুলে ধরা হলো :
লারেন্ট লুসিয়েন (১৯০৮-২০০৫); ফ্রান্স, (প্রথম গোলদাতা)
বিশ্বকাপ ফুটবল যতদিন প্রচলিত থাকবে, ততদিন মানুষ লারেন্ট লুসিয়েনের নাম মনে রাখবে। খুব উঁচু মাপের খেলোয়াড় ছিলেন না, তবুও তিনি অমর হয়ে আছেন। অনেকেই তাকে ছাপিয়ে গেছে, কিন্তু তবুও তিনি অম্লান। আর এর কারণ হলো প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম গোলটি তারই পা থেকে এসেছিল। ১৯৩০ সালে যখন তার বয়স মাত্র ২২, তখন কাজ করতেন পেওগেওট ফ্যাক্টরিতে। এ সময় অ্যামেচার ফুটবল ক্লাব সোচাকেসের পক্ষে এক সাধারণ ইনসাইড ফরওয়ার্ড হিসেবে খেলতেন। প্রথম বিশ্বকাপে ইউরোপের যে চারটি দল অংশগ্রহণ করে তার মধ্যে ফ্রান্স অন্যতম। দুই মাসের সফরের কথা শুনে অনেক নিয়মিত খেলোয়াড়ই পিছ পা হন। এর মাঝে দুই বার ১৫ দিন করে একমাত্র জাহাজ যাত্রা। যে জাহাজে তারা মন্টিভিডিও যান তার নাম ছিল ‘কন্টেভারদে’ মালিকানা ইটালির। এই জাহাজের ডেকেই ফ্রান্স, যুগোশ্লাভিয়া, বেলজিয়াম এবং রুমানিয়ার খেলোয়াড়রা অনুশীলনের কাজ সেরেছেন।
প্রথম খেলার নয় দিন আগে জাহাজটি প্লেট নদীর মোহনায় ভিড়ে। উদ্বোধনী দিনের খেলা ফ্রান্স বনাম মেক্সিকো। অপয়া (১৩) সংখ্যক দল অশুভ তারিখেই (১৩ জুলাই) খেলা শুরু করে। স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে ডেলফোরের পাস থেকে বল পেয়ে ভলি শটে বিশ্বকাপের প্রথম গোল করেন লারেন্ট লুসিয়েন। সৃষ্টি হয় ইতিহাস। এরপর লুসিয়েনের কদর বেড়ে যায়। বেসানকন এফসি ক্লাব তাকে ডিরেক্টরের পদ দেন। এ সময় তিনি ১১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের সাথে কাজ করায় তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তিন বছর জেলে থাকতে হয়। নাৎসিদের বিচারে তাকে এই দণ্ড পেতে হয়। ২০০৫ সালে তিনি পরলোকগমন করেন।
গিলার্মে স্ট্যাবিল (১৯০৬-১৯৬৬); সেন্টার ফরওয়ার্ড, আর্জেন্টিনা
১৯৩০ সালের উরুগুয়ে বিশ্বকাপের শ্রেষ্ঠ গোলদাতা গিলামো স্ট্যাবিল। তার দেয়া আট গোলের বিশ্বকাপ রেকর্ড ২৪ বছর পর্যন্ত অটুট থাকে। অথচ মজার কথা এই দেশের পক্ষে খেলার সুযোগ তার ভাগ্যে আসে অনেকটা অলৌকিকভাবে। সম্ভাব্য খেলোয়াড় ম্যানুয়েল ফেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা থাকায় খেলতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে তরুণ স্ট্যাবিলের মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি হারাকান নামক দলটির বালক বিভাগে যোগদান করেন। ১৯ বছর বয়সে প্রথম দলে সুযোগ পেয়ে গোল করেন সর্বোচ্চ ৩৫টি। স্ট্যাবিল অসম্ভব দ্রুত দৌড়াতে পারতেন। তিনি ছিলেন আক্ষরিক অর্থে একজন সার্থক অ্যাথলেট। ১৯২৮ সালে স্ট্যাবিলের নৈপুণ্যে হারাকান লিগ জয়ের খেতাব পায়। গোল করার অসাধারণ দক্ষতা দেখে ইটালির জেনোয়া ক্লাব তাকে মোটা টাকায় কিনে নেয়। শীর্ষদল বলোগনার বিরুদ্ধে হ্যাটট্টিক করে নিজ দলকে বিজয়ী করেও তিনি দলটির শেষ রক্ষা করতে পারেননি। একই বছর তার দুই বার পা ভাঙ্গে। ১৯৩৩-৩৪ সালে তিনি দল বদলে চলে যান স্পেলসে। অল্পদিন পর আবার ফিরে আসেন জেনোয়া ক্লাবে। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি ফ্রান্সের রেড স্টার দলে খেলেন। এখান থেকেই তিনি ফুটবল জীবনের ইতি টানেন।
১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা মোট গোল করেন ১৮টি। এর মাঝে আটটিই স্ট্যাবিলের। রেডস্টার দলে থাকাকালে তিনি অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ফরাসি জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। তার দেওয়া চার গোলের সুবাদেই ফ্রান্স-৬-৪ গোলে প্রতিপক্ষকে হারায়। এরপর ১৯৩৯ সাল থেকে তিনি প্রশিক্ষকের দায়িত্ব নেন। একটানা ২০ বছর দেশের ফুটবল দলের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে সুইডেন বিশ্বকাপেও তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। কিন্তু চেকোশ্লোভাকিয়ার বিরুদ্ধে-১৬ গোলে আর্জেন্টাইনদের পরাজয়ের ফলে স্ট্যাবিল মুষড়ে পড়েন। তিনি প্রশিক্ষক থেকে বিদায় নেন। ১৯৬৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আমৃত্যু তিনি ছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবল দলের পরিচালক (ডিরেক্টর)।
নাসাজি জোসে (১৯০৫-৬৮); অধিনায়ক, উরুগুয়ে
প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী উরুগুয়ে দলের অধিনায়ক নাসাজি জোসে একজন অসাধারণ ফুলব্যাকের খেলোয়াড় ছিলেন। প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বশালী চীনের প্রাচীর সাদৃশ্য নির্ভরযোগ্য নাসাজি সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে ১৯২৪ সালে প্যারিস এবং ১৯২৮সালে আমস্টার্ডাম অলিম্পিকেদেশকে চ্যাম্পিয়ন করেন। ফলশ্রুতিতে প্রথম বিশ্বকাপের নেতৃত্বের ভারও তার উপরই পড়ে। ‘মার্শাল’ নামে খ্যাত নাসাজি অত্যন্ত সার্থকভাবে সে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ফুলব্যাকের খেলোয়াড় হলেও হাফব্যাক এবং ফরওয়ার্ডে ছিলেন সমান দক্ষ। তার টেকনিক, নির্ভীকতা এবং পরিশ্রম ক্ষমতা যে কোনো সময়ের যে কোনো খেলোয়াড়ের কাছে অনুসরণযোগ্য। তিনি ১৪ বছর নিজদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। দুটি অলিম্পিক, একটি বিশ্বকাপ ছাড়াও নাসাজির নেতৃত্বে উরুগুয়ে চারবার দক্ষিণ আমেরিকার সেরা ফুটবল দেশের খেতাব জয় করে। নাসাজির ক্লাব ‘ন্যাশনাল’ ‘দ্য মেশিন’ খেতাব পেয়েছিল মূলতঃ নাসাজিক কৃতিত্বের উপর ভর করেই।
পুরো ফরম থাকা সত্ত্বেও তিনি ৩১ বছর বয়সে খেলা থেকে অবসর নেন তবে উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অনুরোধে জাতীয় দলের কোচিং-এ দায়িত্ব এড়াতে পারেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন কোনো কোচই খেলোয়াড় তৈরি করতে পারেন না-খেলোয়াড় সৃষ্টি হয় স্বভাবজাত ধারণা থেকে অর্থাৎ জন্মসূত্রে। তবুও এই দায়িত্ব তিনি বহন করেছেন দীর্ঘদিন। নয়া দিগন্ত



