শিরোনাম

প্রতি মণ আমন ধানে প্রান্তিক কৃষকের লোকসান ১১৬০ টাকা

পটুয়াখালীর বাউফলে মাঠ ভরা সোনা রংয়ের ধানের দেখা মিললেও কৃষকদের মুখে নেই সেই মধুর হাসি। সেখানে ভর করে নিয়েছে বিষাদের কালো ছায়া ও অজানা এক শঙ্কা।
বছরের পর বছর ধান চাষে লোকসান হওয়ায় কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে প্রান্তিক কৃষকরা। এই অঞ্চলের মোট কৃষকের দুই তৃতীয়াংশই বর্গাচাষী। ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন বর্গাচাষীরা। বর্গাচাষীরা চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে চরম হুমকির মুখে পড়তে পারে আমাদের কৃষি। আগামী দিনের কৃষি নিয়ে এমনই হতাশার কথা জানিয়েছেন কৃষক এবং কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
পটুয়াখালীর বাউফলে চলতি আমন মৌসুমে পোকার সংক্রমণ এবং ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে কাঙ্খিত ফলন না হলেও তেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি উৎপাদনে। দেশীয় প্রজাতির আমন ধানের গড় উৎপাদন হয়েছে একর প্রতি ২৫ মণ। বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী ভালো মানের এক মণ ধানের দাম রয়েছে সর্বোচ্চ ৬শ টাকা। বীজ ধান ক্রয়, সার, কীটনাশক, জমি চাষ, বীজ বপণ, রোপন, কর্তন, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক খরচ হিসেবে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে একজন বর্গা চাষীর খরচ হয়েছে ৪৪টাকা (এখানে উল্লেখ্য, একজন বর্গা চাষী মোট উৎপাদিত ধানের অর্ধেক পেয়ে থাকেন)। বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী (৬শ টাকা মণ হিসেবে) প্রতি কেজি ধানের দাম পাচ্ছেন মাত্র ১৫টাকা। সে হিসেবে মণ ধান উৎপাদনে একজন বর্গা চাষীকে লোকসান গুণতে হচ্ছে প্রায় প্রায় ১১৬০ টাকা।
উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা কৃষক সোহাগ মিয়া। ধান কাটতে থাকা অবস্থায় কথা হয় তার সাথে। কি অবস্থা ভাই আপনাদের জানতে চাইলে আক্ষেপের সুরে বলেন, এই বছরই জীবনের শেষ ধান কাটছি ভাই। মনে হয় জীবনে আর ধান কাটা হবে না। কেনো ধান কাটবেন না জানতে চাইলে তিনি বলেন বাপ দাদাদের কাছ থেকে কৃষিকাজ শিখছি, গেলো বছর তার আাগের বছর আর এই বছর এই তিন বছরে ধান চাষ করে যে পরিমাণ লোকসান হইছে তার ঋণ শোধ করতে হলে এই পেশায় থাকার আর কোনো সুযোগ নাই। কেজি প্রতি ধানে এবার লোকসান হইছে ২৯ টাকা। আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষরা কি এই লোকসানের ভার বইতে পারে বলেন? কৃষক হিসেবে টিকে থাকার এই অস্তিত্ত্ব সঙ্কটের কথা জানান নাজিরপুর ইউনিয়নের কৃষক ফারুক মাওলানা, খালেক মৃধা, রাজ্জাক মৃধা, আফজাল মৃধা, মামসুল হক বয়াতী, মজুল হক বয়াতী, কালাইয়া ইউনিয়নের শহিদুল গাজী, জাহাঙ্গীর মিয়া, নুরুল ইসলাম, সূর্যমণি ইউনিয়নের আবদুর রাজ্জাক, হাবিব গাজী, কাছিপাড়া ইউনিয়নে লিটু মিয়া, মামুন মিয়া, শওকত হোসেনসহ আরও অনেকে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ের সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাউফল উপজেলায় কৃষকের সংখ্যা ছিলো প্রায় ৫৪ হাজার। যার দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি ছিলো বর্গা চাষা। বর্তমানে সেই কৃষকদের সংখ্যা কমে এসে দাড়িয়েছে ৩০ হাজারে। চলতি আমন মৌসুমে ধানের দাম না পাওয়ায় আগামীতে মৌসমে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে যাওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। কৃষক সংখ্যা কমে গলে আগামী মৌসুমে ব্যাহত হবে আমন আবাদ। যার অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কৃষিতে।
আমনের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় এর বিরুপ প্রভাব সম্পর্কে ইঞ্জিনিয়ার ফারুক আহমেদ তালুকদার মহিলা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মো. আবদুল জলিল তালুকদার বলেন, কৃষকদের যে বর্তমান অবস্থা সেখানে কৃষকরা কেনো কৃষিকাজ করবেন বলেন। বছরের পর বছর ধরে লোকসান দিয়ে কিভাবে একজন মানুষ একটি পেশায় টিকে থাকবে। সরকারকে এর কারন খুঁজে বের করে খুব দ্রুত বাস্তবমুখী করণীয় ঠিক করতে হবে। নইলে আমাদের কৃষির জন্য অত্যান্ত ভয়াভহ পরিস্থিতী অপেক্ষা করছে যা হয়তো আমাদের ধারণার অতীত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বাউফল উপজেলার ৩ হাজার কৃষকদের মধ্যে মাত্র সাড়ে ৪ হাজার কৃষকের নাম তালিকাভূক্ত করে লটারীর মাধ্যমে ২৬শ কৃষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ২ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করবে সরকার। কিন্তু উপজেলার অধিকাংশ কৃষকই তাদের উৎপাদিত ধান বিক্রি করে ফেলেছে। অথচ আনুষ্ঠানিক উদ্ভোধন হলেও এখন পর্যন্ত শুরু হয়নি সরকারের ধান ক্রয় কার্যক্রম। মো. রুহুল আমিন হাওলাদার বাবু নামে অপর এক সমাজকর্মী সরকারের ধান ক্রয় পদ্ধতির সমালোচনা করে বলেন, ইতিমধ্যেই বাউফল উপজেলার অধিকাংশ কৃষক তাদের উৎপাদিত ধান বিক্রি করে ফেলেছে। অভাবগ্রস্থ হওয়ায় ধান উৎপাদন হয়ে গেলে সেই ধান নিয়ে অপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না কৃষকদের। অথচ সরকার যে আদ্রতার ধান ক্রয় করার কথা বলছে, সেই আাদ্রতাযুক্ত ধান ততোদিনে কৃষকের গোলা থেকে ফড়িয়াদের কাছে চলে যায়। পরে নানান যোগসাজস ঘটায় কৃষকদের কাছ থেকে সরকার যে ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার সুফল প্রান্তিক কৃষকদের না পাওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এবং এই সিস্টেমের কারণে এখানে এক ধরনের ফড়িয়াদের উদ্ভব হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর তাছাড়া মোট কৃষক অনুপাতে ধান সংগ্রহের পরিমাণ খুবই সামান্য হওয়ায় ধানের বাজারে এর কোনো প্রভাব নেই।
এসব বিষয়ে বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মণিরুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থানীয় জাতের ধানের গড় উৎপাদন এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি তবে উফসী জাতের ফলন ভালো ছিলো। গড় উৎপাদন হয়েছে হেক্টর প্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার কেজি। তবে তিনি কৃষক কমে যাওয়া এবং কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বিব্রত হচ্ছেন এ কথা স্বীকার করে বলেন, কৃষি বিপণন, খাদ্য এবং কৃষি বিভাগকে সমন্বিত করে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রনয়ণ করা এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়ছে অন্যথায় আগামী দিনে কৃষির জন্য একটা বড় হুমকি দেখা দিতে পারে।
পূর্বপশ্চিম

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button