প্রচারবিমুখ এক অধ্যাপক যেভাবে হলেন তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট
কাইস সাইয়েদ ইউনিভার্সিটি অব তিউনিসে আইনের একজন অধ্যাপক ছিলেন। কিন্ত প্রচারবিমুখ সাবেক এই অধ্যাপক সম্প্রতি অনুষ্ঠিত তিউনিসিয়ার নির্বাচনে ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করেন। ৬১ বছর বয়সি কাইস সাইয়েদ দেশটির তরুণ ভোটারদের মন জয় করেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেন।
১৪ অক্টোবর তিউনিসিয়ার নির্বাচন কমিশন কাইস সাইয়েদের বিজয়ী হওয়ার খবর আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। প্রকাশ্যে আবেগ অনুভূতি প্রকাশ না করার কারণে রোবট নামে পরিচিত সাবেক এই অধ্যাপক মূলত ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সি তরুণ সম্প্রদায়ের ব্যাপক সমর্থন নিয়েই উত্তর আফ্রিকার দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং এর শিক্ষার্থী ইউসুফ বেজাওয়ি বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা এই শাসন ব্যবস্থায় ক্লান্ত, আমরা নতুন কিছু চাই।’
রাজনীতির ব্যাপারে অনভিজ্ঞ কারো ক্ষমতাসীন হওয়ার ঘটনা একদম নতুন কিছু নয়। এক্ষেত্রে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদেমির জেলেনস্কির কথা বলা যেতে পারে। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি কৌতুকাভিনেতা হিসেবে দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন।
এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনিও রাজনীতিতে একদম আনকোরা ছিলেন। কিন্তু টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতির কারণে আগে থেকেই তার জনপ্রিয়তা ছিল। ফলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই বিষয়টিই কাজে লেগেছিল।
অথচ তিউনিসিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের গণমাধ্যমে উপস্থিতি একদম ছিলই না বলতে গেলে। নির্বাচনী প্রচারণায়ও খুব বেশি সরব ছিলেন না তিনি। কেবলমাত্র সততা এবং দুর্নীতিবিরোধী বার্তা দিয়েই তিনি তরুণদের মন জয় করে নেন।
অধ্যাপক হিসেবে যেমন তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সমস্যা নিয়ে সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করতেন, তেমনি রাজনীতিক হিসেবেও ভোটারদের বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়ের সমস্যার কথা সরাসরি শুনতে আগ্রহী ছিলেন। ফলে তিনি ভোটাদের সরাসরি তার কাছে এসে তাদের চাহিদার ব্যাপারে কথা বলার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন।
২৩ বছর বয়সি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসমা সেলমি এবারের নির্বাচনে কাইস সাইয়েদকে ভোট দিয়েছিলেন। তিনি চলতি মাসের শুরুতে রাজধানী তিউনিসে অবস্থিত সাইয়েদের নির্বাচনী কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। তরুণ এই শিক্ষার্থী নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বিবিসিকে জানান, কাইস সাইয়েদের কার্যালয়ে গিয়ে তিনি আরো অনেক শিক্ষার্থীর দেখা পান। তারা সবাই তার কাছে জানতে চাইছিল, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বিদ্যমান বেকারত্ব সমস্যা তিনি কীভাবে সামাল দেবেন?
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় তিউনিসিয়ায় বেকারত্বের সমস্যা যেমন ব্যাপক ছিল বর্তমানেও তার কোন পরিবর্তন ঘটেনি। এই তিউনিসিয়ায় প্রথম আরব বসন্তের ছোঁয়া লেগেছিল। সেসময় বেকারত্বের কারণে একজন তরুণ গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করার পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই গণ বিক্ষোভের ফলে শাসন ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন দীর্ঘ দিন দেশ শাসন করা জাইন আলী আবিদিন। তিনি দেশ ছেড়ে সৌদি আরব পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।
সেলমি জানান, তিনি কাইস সাইয়েদের সততা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি সাইয়েদের কাছে তিউনিসিয়ার কৃষি বিষয়ে জানতে চান। তিনি যে উত্তর দিয়েছিলেন তাতে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন তরুণ এই ভোটার। সেলমি বলেন, ‘তার বুদ্ধিমত্তা আমার পছন্দ হয়েছিল এবং তিনি সবকিছুই সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেছিলেন।’
তরুণ এই ভোটার বলেন, ‘তিনি হয়তো সবকিছুই ঠিক করতে পারবেন না। কিন্তু আমার ধারণা, তিনি সংসদে এমন কিছুই করবেন যা আমাদের প্রশাসনকে ঠিক করার কাজে ব্যবহার করা যাবে। বর্তমানে এটি দুর্নীতিতে ভরা।’
সেলমির বড় বোন সেমেহ সেলমি যিনি ইউনিভার্সিটি অব তিউনিসে কাইস সাইয়েদের ছাত্রী ছিলেন, তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকের তুলনায় তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি তাদের সব প্রশ্ন আগ্রহের সঙ্গে শুনতেন এবং সমাধানের চেষ্টা করতেন। এজন্য তার ক্লাসে সবসময় ছাত্র-ছাত্রী দ্বারা পরিপূর্ণ থাকতো।
ফলে অধ্যাপক কায়েস সাইয়েদ যে তরুণদের ব্যাপক সমর্থন পাবেন সেটি অনেক আগেই তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
তবে কেবল তরুণরাই নয় অনেক বয়স্ক ভোটাররাও কাইস সাইয়েদকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। তারা অনভিজ্ঞ এই রাজনীতিবিদকে একবার সুযোগ দিয়ে দেখতে চেয়েছেন যার ফলশ্রুতিতে ব্যাপক ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী নাবিল কারুয়িকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।




