
পতাকা ডেস্ক : ড. কামাল হোসেন বলেছেন, যারা স্বৈরাচার তারা আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায়। তাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। প্রয়োজনে জীবনের ঝুঁকি নিতে হবে।
সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে আতাউস সামাদ স্মৃতি পরিষদ আয়োজিত বরেণ্য সাংবাদিক আতাউস সামাদের ১০তম মৃত্যু বার্ষিকীতে স্মরণ সভায় তিনি একথা বলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ গোলাম রহমানের সভাপতিত্বে ও স্মৃতি পরিষদের আহবায়ক কবি হাসান হাফিজের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)র সভাপতি এম আবদুল্লাহ, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ দিদার বখত, প্রথম আলোর যুগ্মসম্পাদক সোহরাব হাসান, বিএফইউজের মহাসচিব নুরুল আমিন রোকন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, রয়টার্সের ফটোসাংবাদিক এবিএম রফিকুর রহমান, ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি সাংবাদিক এ কে এম মোহসীন প্রমুখ।
ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘গণতন্ত্র যখন হুমকির মুখে ছিল তখন গণতন্ত্রকে বাঁচানোর জন্য আতাউস সামাদ সাহেব জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য কথা বলেছেন। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করেছেন। তার আদর্শ এবং ব্যক্তিত্ব ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখলে সৎ সাংবাদিকতা নিয়ে দেশের গণতন্ত্রকে রক্ষা করা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘আজ দেশে গণতন্ত্র নেই। কথা বলার অধিকার নেই। গণতন্ত্র এবং কথা বলার অধিকার আদায় করতে অবশ্যই ঝুঁকি নিতে হবে। উচিত কথা বলা এবং সত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে জনগণকে সচেতন থাকতে হবে। আন্দোলন সংগ্রাম করতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ গোলাম রহমান বরেণ্য সাংবাদিক সমাজের জীবনী বর্ণনা দিয়ে বলেন, আতাউস সামাদ নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন। সমাজের সচেতন ব্যক্তি তিনি বাংলাদেশের উদাহরণ হয়ে থাকবে।’
এম আবদুল্লাহ বলেন, সাংবাদিক আতাউস সামাদ স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যেমন সোচ্চার ছিলেন তেমনি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য কখনও আপস করতেন না।
সাংবাদিকদের এ শীর্ষ নেতা আতাউস সামাদের সঙ্গে আশির দশক থেকে বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, মানুষ হিসেবে আতাউস সামাদ ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা ও বন্ধু বৎসল। একজন জুনিয়র রিপোর্টারের সঙ্গেও তিনি তাঁর সমবয়েসি বন্ধু মতো আচরণ করতেন। সরেজমিন রিপোর্টে গুরুত্ব দিতেন সবসময়। তিনি যেভাবে প্রতিবেদন তৈরি করতেন তা সত্যিই অনুকরণীয়। স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে তাঁকে জেলও খাটতে হয়েছে। আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় আতাউস সামাদের খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। তিনি সব সময় দেশ ও মানুষের কথা ভাবতেন। এজন্য তাঁর সাংবাদিকতা, প্রতিবেদন তৈরি ও কাজে দেশপ্রেম ফুটে উঠত। সব সময় সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তাছাড়া সাংবাদিকতা মানেই প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু তিনি নিজেকে কখনও প্রতিবন্ধকতার মধ্যে আটকে রাখতে চাননি। সব কিছুর পরেও সঠিক কাজটি করার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন তিনি।
এম আবদুল্লাহ বলেন, আজ কপি-পেস্ট সাংবাদিকতার যুগে অনুসন্ধানী ও সরেজমিনে সাংবাদিকতাকে গুরুত্ব দিতে পারলেই আতাউস সামাদের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানো হবে।
প্রথম আলোর যুগ্মসম্পাদক কবি সোহরাব হাসান বলেন, আতাউস সামাদ সাংবাদিকতাকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার তিনি একজন দিকপাল। আজ দুঃখ হয় দেশে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা নেই।’
তিনি বলেন, আতাউস সামাদ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আবেগ দ্বারা তাড়িত হতেন না। ঘটনার ভেতরের ঘটনা বের করে আনতে পারতেন। তাঁর কোনো প্রতিবেদন নিয়ে বিতর্ক হয়নি, তিনি জীবনভর সুনাম বজায় রেখে সাংবাদিকতা করেছেন।
নুরুল আমিন রোকন বলেন, ‘আতাউস সামাদ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে গেছেন। তিনি ছিলেন সৎ। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথিকৃত ছিলেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামও করেছেন।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, আতাউস সামাদ ছিলেন সততা ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। তিনি ছিলেন সাংবাদিকতার মহীরুহ। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গনতন্ত্রের খাঁটি ‘সতর্ক প্রহরী’। তিনি অন্যের মাধ্যমে প্রভাবিত বা আবেগ দ্বারা তাড়িত হতেন না। ‘সত্যনিষ্ঠ’ সাংবাদিক বলতে যা বোঝায়, সেটিই ছিলেন তিনি। ঘটনার ভেতরের ঘটনা বের করে আনতে পারতেন। সামাদ স্যার সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতাকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতেন। কোনো বিষয়ে খটকা লাগলে তিনি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লিখতেন না। সব কিছু নিখুঁতভাবে করতে চাইতেন তিনি। কাজের ক্ষেত্রে তিনি শতভাগ সচেতন থাকতেন৷ তার অভিধানে ফাঁকিবাজি বলে কোন শব্দ ছিলনা। তাই তার সাংবাদিকতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে নি।
সৈয়দ আবদাল আহমেদ বলেন, ১৯৫৯ সালে সাংবাদিকতা শুরু করার পর আতাউস সামাদকে তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয়েছিল সামরিক ও স্বৈরশাসনের অধীনে। প্রথমে (১৯৬৯ সালের মার্চ পর্যন্ত) পাকিস্তানের তথাকথিত ‘লৌহ মানব’ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের এবং পরবর্তীকালে (১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে। শ্বাসরুদ্ধকর সেই বছরগুলোতে দুর্দান্ত সাহসী ছিল আতাউস সামাদের ভূমিকা। পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি গোয়েন্দারা বিরামহীনভাবে তাকে ভয়-ভীতি দেখিয়েছে, প্রলোভনও কম দেখানো হয়নি। কিন্তু ভয়-ভীতি বা প্রলোভন দেখিয়ে এবং প্রচণ্ড মানসিক নির্যাতন চালিয়েও তাকে সত্য প্রকাশ থেকে নিবৃত্ত করা যায়নি।
-প্রেস বিজ্ঞপ্তি




