slider

পাখাপল্লী

পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে বরিশালে তাল পাতার পাখা তৈরির কারিগররা ব্যস্ত সময় পার করছেন। গ্রামটির অনেক নারী এখন পাখা তৈরিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।
সরোজমিনে দেখাগেছে, মহামারী করোনা কাটিয়ে বিগত প্রায় দুই বছর পর জেলার সর্বত্র মাসব্যাপী বসছে বৈশাখী মেলা। এ মেলাকে কেন্দ্র করে একটু বেশি টাকার আশায় তৈরি হচ্ছে রঙ বেরঙের বিভিন্ন ধরনের তাল পাখা। ভ্যপসা গরম ও প্রচণ্ড তাপদাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হচ্ছে বাঙালীর ঐতিহ্যবাহী চিরচেনা তালপাতার পাখা। তাই এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন পাখাপল্লীর তাল পাতার পাখা তৈরির কারিগররা।
জেলার গৌরনদী উপজেলার চাঁদশী গ্রামের পাখা পল্লীর একাধিক কারিগর জানায়, এ পাখা পল্লীর তাল পাতার পাখা বিক্রি হয় দেশের বিভিন্ন মেলা, হাট-বাজার, বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন পাইকারী ও খুচরা দোকানে। গরম এলেই বিদ্যুতের লোড শেডিংয়ে প্রচণ্ড তাপদাহ থেকে একটু স্বস্তি পেতে সকলের হাতেই দেখা যায় তাল পাতার পাখা। আর এসব পাখা তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন শতাধিক পরিবার। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ওইসব পরিবারের সদস্যরা তাল পাতা দিয়ে হাত পাখা তৈরি করছেন।
পাখা পল্লীর নারী কারিগর শেফালী, সুমা ও আশা জানায়, জেলার গৌরনদী উপজেলায় গ্রামটির নাম চাঁদশী হলেও পাখা তৈরির এলাকাটি ‘পাখাপল্লী’ নামেই সবার কাছে পরিচিত। সংসারের কাজের পাশাপাশি তালপাতা দিয়ে হাত পাখা তৈরিকে পেশা হিসেবে নিয়েছে গ্রামটির অনেক নারী। গরমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মচাঞ্চল্যও বাড়ে ‘হাতপাখা গ্রাম’-এর মানুষদের। এ সময় তালপাতা দিয়ে তাদের বানানো পাখার চাহিদা বেড়ে যায় বহুগুণ। তালপাতার পাখা বানিয়ে অনেকের সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা।
এসব নারী কারিগররা আরো জানায়, পাতা সংগ্রহ, ধোয়া, শুকানো এবং পরিষ্কার করার কাজটা করে পুরুষরা। বাকি কাজ নারীদের। পাখা আকৃতির মতো পাতাগুলো কেটে রঙ দেয়া, বাঁশের কাঠি যুক্ত করা, সুই ও সুতা দিয়ে বাঁধাইয়ের পর পাতাগুলো হয়ে ওঠে সুন্দর হাত পাখা। একজন নারী প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ পিস পর্যন্ত পাখা তৈরি করতে পারেন। ৮০টি হাত পাখা সুই-সুতা দিয়ে সেলাই ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজের বিনিময়ে পেয়ে থাকেন ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা।
এদিকে জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার তাল পাখা তৈরির কারিগর কাসেম খলিফা, আবুল হোসেন, শাহজাহান খলিফা,স্বপন খলিফাসহ একাধিক হস্তশিল্পী (কারিগর) জানান, সপ্তাহে একদিন পাইকার এসে বাড়ি থেকে হাত পাখা ক্রয় করে নিয়ে যায়। পাখা তৈরি করাই হচ্ছে তাদের গ্রামের প্রধান আয়ের উৎস। তাদের পল্লীর তৈরি পাখা বিক্রি হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন মেলা, হাট-বাজার, বাসষ্ট্যান্ডসহ দেশ জুড়ে।
কারিগররা আরো জানান, উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির পর অর্থাভাবে এ পেশার সাথে জড়িত আরো প্রায় পঞ্চাশটি পরিবার পেশা পরিবর্তন করেছেন। বাকি পরিবারগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে সহজ শর্তে সূদ মুক্ত ঋণ দেয়ার জন্য তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আশু হস্থেক্ষেপ কামনা করেছেন।
এবিষয়ে গৌরনদী উপজেলার চাদঁশী ইউপি চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, গ্রামের বহু নারী সংসারের পাশাপাশি তাল পাতার পাখা তৈরির সঙ্গে যুক্ত। প্রায় ৩০-৩৫ বছর ধরে এ গ্রামে পাখা তৈরি করা হচ্ছে। তেমন কোনো সরকারি সহয়তা পাননি পাখা তৈরির কারিগর ও ব্যবসায়ীরা। সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হলে এ ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের আরো প্রসার ঘটবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করর্পোরেশন (বিসিক) বরিশালের উপ মহাব্যবস্থাপক (ভাঃ) মোঃ জালিস মাহমুদ বলেন, পাখাপল্লীর পাখা দেশের বিভিন্ন জেলায় স্থানীয় পাখা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পোঁছে যায়। এখানকার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হস্থশিল্পী ও কারিগরদের সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত বিসিক কর্তৃপক্ষ। সমস্যা সমাধানে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সমস্যাগুলোর সমাধান করা হবে। ভবিষ্যতে যাতে আরো বড় পরিসরে কাজ চালিয়ে যেতে পারে, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে আলাপকালে বরিশাল জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দিন হায়দার জানান, তাল পাতার পাাখার এ শিল্পকে ধরে রাখতে হবে। প্রকৃতপক্ষে তাদের জীবন মানের উন্নয়ন দরকার। চাদঁশী পাখাপল্লীর বাসিন্দাদের নিয়ে সমিতি গঠন করে তাদের মাঝে টাকা প্রদানের জন্য আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পকে বলা হয়েছে। এছাড়া তাদের মাঝে নগদ অর্থ প্রদানসহ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সূত্র : বাসস

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button